চট্টগ্রাম শহরের যানজট এবং গণপরিবহনের সংকট ও সমাধান

ছাইফুল হুদা ছিদ্দিকী

মঙ্গলবার , ২ অক্টোবর, ২০১৮ at ১০:৫১ পূর্বাহ্ণ
306

প্রাকৃতিক বন্দর ও নানান শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান,দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় জ্বালানি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি, কাস্টম এবং সবচেয়ে বড় রপ্তানিকরণ অঞ্চল (ইপিজেড ) সমুদ্র সৈকত সমৃদ্ধ বন্দর নগরী প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অনুপম লীলাভূমি এই চট্টগ্রাম। দেশের নানান অঞ্চল থেকে আসা মানুষ চাকরি, ব্যবসা ও শিক্ষা গ্রহণের পর এই শহরে জীবন যাপন করছে।বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত পাহাড়, সমুদ্রে এবং উপত্যকায় ঘেরা চট্টগ্রাম শহর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যে প্রাচ্যের রাণী হিসেবে বিখ্যাত ।
ছাত্র জীবনের নানান ঝামেলা শেষ করে মুকিত সাহেব(ছদ্মনাম) চট্টগ্রাম ইপিজেড এর একটা বিদেশী কোম্পানিতে সদ্য যোগদান করেছেন, উনার অনেকদিনের স্বপ্ন ছিল পোশাক কিংবা তাঁবু প্রস্তুতকারী ও রপ্তানি করে এমন বিদেশী প্রতিষ্ঠান এ যোগদান করবেন, বলা যায় বি কম পাস করে এর চাইতে ভালো চাকরি উনি আশা করেনি, উনার পরিবারের সবাই খুশি এই চাকরি নিয়ে। কিন্তু উনার এই চাকরি নিয়ে ইদানীং ভীষণ সমস্যায় পড়েছেন যার প্রধান কারণ লালখান বাজার বাসা থেকে ইপিজেড যাতায়াত সমস্যা। ইদানীং অফিসে আসা যাওয়াটা অনেক সময়ের এবং কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে যার মূল কারণ যানজট এবং গণপরিবহন সংকট । আমি নিজেও চট্টগ্রাম ইপিজেড বিভিন্ন বিদেশী কোম্পানিতে গত ২৬ বৎসর ধরে চাকরি করছি, বিশেষ করে গত তিন চার বৎসর ধরে এই যানজট এর সম্মুখীন হচ্ছি। আমাদের চকবাজার জয়নগর আবাসিক এলাকা থেকে ইপিজেড অফিস আসা যাওয়াতে আমাদের ইদানীং তিন চার ঘণ্টা করে নষ্ট হচ্ছে। আমার জন্য কোম্পনি কর্তৃক একটি নির্দিষ্ট গাড়ি থাকা সত্ত্বেও যানজট কবলে পরে জীবনের অনেক মূল্যবান সময় নষ্ট করছি। আমার মতোন অনেকে এই সমস্যায় জর্জরিত । শুধু বিমান বন্দর থেকে লালখান বাজার নয় চট্টগ্রাম শহরের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি সড়ক, মোড়, ট্রাফিক পয়েন্ট ও রেলক্রসিংয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকা মানুষজন সীমাহীন ভোগান্তির শিকার হচ্ছে।চট্টগ্রাম থেকে বিমানে কোথাও যেতে হলে নির্দিষ্ট সময়ের তিন/চার ঘণ্টা আগে বাসা থেকে বেরোতে হয়, নতুবা নিশ্চিত বিমান মিস করতে হবে, যে কোন কাজে যেতে হলে নির্দিষ্ট সময়ের অনেক আগে বেরোতে হয় , এতে করে মানুষের সময় ও অর্থ দুটোই অপচয় হচ্ছে ।
যানজটের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে জনগণের যেমন ক্ষতি হচ্ছে তেমনি দেশের মূল্যবান সম্পদ গ্যাস ও তৈল এর অপচয় হচ্ছে । সরকারকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে এই সমস্যার সমাধান করতে হবে যাতে জনগণ এই দুর্ভোগ থেকে রেহাই পায়। এই সমস্যার সমাধান কল্পে নিম্নের প্রস্তাবগুলো সরকার বিবেচনায় রাখলে ও বাস্তবায়ন করলে এই ধরনের সমস্যা থেকে চট্টগ্রামবাসী মুক্তি পেতে পারেন।
এই সড়কের দীর্ঘদিন যাবৎ নিয়মিত যাত্রী হিসেবে আমার বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে এবং বিশেষ করে আমার সাথে থাকা আমার সহকর্মী গাড়ি চালক জনাব ওসমান সাহেবের মতামত অনুযায়ী, এই সমস্যা নিয়ে আমার কিছু অনুধাবন এবং এই সমস্যা সমাধানের কিছু উপায় আমি এখানে শেয়ার করছি । এই সড়কের যানজট কমাতে কিছুদিন আগে চট্টগ্রাম ইপিজেড মোড় অস্থায়ী বেড়া দিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে এতো তেমন ভালো কোন ফলাফল আসেনি, চট্টগ্রামের ইপিজেড মোড় সহ এই সড়কটি যানজটমুক্ত করতে আরো ফুট ওভার ব্রিজ, আন্ডারপাস (পাতালপথ) নির্মাণসহ স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে হবে ।
দ্রুত বিকল্প সড়ক , সিএনজি ট্যাক্সি, প্রাইভেট যানবাহন কমিয়ে বড় বড় বাস কিংবা শহরের চারিদিকে রেল লাইন এর ব্যবস্থা করেও এই সমস্যার সমাধান করা যায়।।
শহরের প্রতিটি সড়কের উপর যানবাহন পার্কিং, সড়কে ভ্যান গাড়িতে বাজার, ফুটপাথে দোকান,রাস্তায় গাড়ি সাজানো , রাস্তায় গাড়ি মেরামত ইত্যাদি কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে,
জেব্ররা ক্রসিং, ফুটওভার ব্রিজ অথবা আন্ডারপাস (পাতালপথ)নির্মাণ :
কাটগড়,কর্ণফুলী ইপিজেড, বন্দরটিলা, চট্টগ্রাম ইপিজেড মোড় এবং চল্লিশ ফুট দু পাশে,সল্টগোলা রেল ক্রসিং, বারিকবিল্ডিং মোড়, আগ্রাবাদ মোড়, চৌমুহনী মোড়, লালখান বাজার, জিইসি মোড়,দুই নং গেইট, মুরাদপুর এবং বহদ্দারহাট মোড় সব জায়গায় পথচারী পারাপার জন্য জেব্ররা ক্রসিং, ফুটওভার ব্রিজ অথবা আন্ডারপাস (পাতালপথ) মাটির নিচ দিয়ে সুড়ঙ্গ করে পথচারী পারাপারের ব্যবস্থা করলে যানজট এবং সড়ক নিরাপদ হবে এতে করে মূল সড়কে যানবাহন চলাচল বাধাবিহীন হবে এবং দুর্ঘটনা অনেক কমে আসবে ।
প্রতিটা মোড় চারিদিকে আরো বড় এবং প্রশস্ত করতে হবে :
প্রতিটি মোড় আরো প্রশস্ত করতে হবে, বিমান বন্দর থেকে লালখান বাজার সড়কে বিশেষ করে ইপিজেড দুটোর মোড় আরো অনেক বড় করা খুব জরুরি , দেওয়ানহাট মোড় এবং টাইগারপাস্‌ মোড় আরও অনেক বড় ও বেশি খোলামেলা হতে হবে ।
যানবাহন পার্কিং এর জায়গা :
মূল সড়কে যাতে কোন যানবাহন দাঁড়াতে না হয় মূলসড়ক থেকে আলাদা লেন করে বাস এবং অন্য যানবাহন এর পার্কিং জায়গা করতে হবে ।
নির্দিষ্ট সময় রাস্তায় ট্রাক ও ট্রাক লরি চলাচল সীমিত করতে হবে :
যানবাহন এর ক্ষেত্রে ট্রাক এবং বড় বড় লরি ট্রাক গুলোর জন্য একটা নির্দিষ্ট সময় পরে রাস্তায় চলাচল সীমিত করতে হবে, বিশেষ করে সকাল আটটা থেকে এগারোটা এবং বিকাল পাঁচটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত এই ধরনের যান চলাচল বন্ধ রাখতে হবে ।
এ ছাড়া দেওয়ান হাট ব্রিজ এর উপর রিকশা চলাচল বন্ধ করা জরুরি, এটার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করা যায়,
প্রতিটা সড়কের মোড়ে বাম পাশ খালি রেখে যাতে সোজা পথে যাওয়া যানবাহন গুলো দাঁড়ায় এতে করে বাম দিকে টার্ন নেবে এ ধরনের গাড়িগুলো সহজে বিনা বাধায় চলে যেতে পারবে ।
ট্রাফিক সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু রোড সাইন ও রোড মার্কিং করতে হবে, এ গুলো বাংলায় লিখা সহ সড়কের নির্দিষ্ট স্থানে স্থাপন করতে হবে । ট্রাফিক আইন ও নিয়মকানুন সংক্রান্ত বিষয়ে গাড়ি চালকদের অবগতি এবং গাড়ি চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ এর মাধ্যমে আইন মেনে চলার ব্যবস্থা করতে হবে ।
চট্টগ্রাম শহরের প্রতিটি সড়কে ইদানীং মারাত্মক যানজট এবং মানসম্মত গণপরিবহনের সংকট এখন প্রকট আকার ধারণ করেছে।বিশেষ করে মানসম্মত যানবাহনের অভাবে এই শহরে স্বল্প দূরত্ব যাতায়াতকারী যাত্রীদের নিয়মিত ও সময়মতন যাতায়াতের ক্ষেত্রে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।এতে যাত্রী সাধারণের যাতায়াত ব্যয় ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়েছে। উন্নত তথা মানানসই সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা তথা গণপরিবহন মানুষের শ্রম, সময় ও অর্থকে অপচয়ের হাত থেকে রক্ষা করে যা অবশ্যই দেশের আর্থসামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে গতিশীল রাখে। বাংলাদেশের চলমান উন্নয়নের গতি ত্বরাম্বিত এবং টেকসই করতে উন্নত সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোর গুরুত্ব অপরিসীম।দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো যত বেশি জনবান্ধব,মানানসই আধুনিক ও উন্নত হবে আমাদের জনগণের মাঝে তত সামাজিক সুস্থিরতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠালাভ করবে। এতে একে অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হবে।মনের উদারতা বৃদ্ধি পাবে। সমাজ থেকে অন্যায়, অত্যাচার ও নির্মমতা দূর করে সবাই একসাথে সমতার ভিত্তিতে নিজেদের আর্থসামাজিক অবস্থানের পরিবর্তন করে দেশের সার্বিক উন্নয়ন সাধন করতে ভূমিকা রাখবে। উন্নত সামাজিক বন্ধন টেকসই করতে প্রয়োজন সমাজে বসবাসকারীদের নৈতিক পরিবর্তন আর সাথে সাথে অর্থনৈতিক উন্নয়ন।অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধনে ভাল ও উন্নত পরিবহন ব্যবস্থার গুরুত্ব অপরিসীম।উন্নত সামাজিক বন্ধন রক্ষায় আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব সবার সাথে যোগাযোগ রাখার জন্য, এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় আসা-যাওয়া, বিদেশ গমন ও ভ্রমণসহ, দেশের শিক্ষার মান বৃদ্ধি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া বিস্তার, সহ আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থা, গ্রামে উৎপাদিত পণ্য বিপণন, বিশেষ করে গ্রামীণ শিল্প কারখানা, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসার, ক্রেতা ও বিক্রেতার সহজ যোগাযোগ, রোগী পরিবহন, সময়মতন চিকিৎসা সেবা পাওয়া সবই সড়কে যানজট বিহীন উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা ও নিরাপদ সড়কের উপর নির্ভরশীল ।
অর্থলগ্নকারী সংস্থা সমূহ ও পরিবহন ব্যবসায়ীগণ যৌথ উদ্যোগে অতিসত্বর সড়কে স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতকারীদের জন্য টেকসই উন্নত মানসম্মত যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা গ্রহণ করে এই সমস্যার আশু সমাধান করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে দেশী বা বিদেশী অর্থলগ্নীকারী প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় দ্রুত পরিবহন খাতের অভিজ্ঞ ও পরীক্ষিত পুরাতন ব্যবসায়ী, তিনচাকার যানবাহনের বর্তমান মালিকগণ কিংবা আরও নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি করে এই খাতে সহজ পদ্ধতিতে বিনাসুদে ঋণ প্রদান করে মহাসড়কে মানসম্মত যানবাহন এর ব্যবস্থা করতে পারে। দেশের গণপরিবহন খাতের আধুনিকায়নের মাধ্যমে উন্নত সামাজিক বন্ধন ও টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধন করে সমগ্র দেশের জনজীবনে সুখ শান্তি বৃদ্ধিসহ সাধারণ জনগণের যাতায়াত দুর্ভোগ লাঘব সহ ক্ষুধা, দারিদ্র্যমুক্ত দেশগঠনে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত এবং ভিশন ২০২১ বাস্তবায়নের পথে নিঃসন্দেহে আমাদের সবার প্রিয় দেশ আরো দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাবে।
লেখক : সংগঠক

x