চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ

৩ বছরে যাত্রী বেড়েছে ৭ লাখ

হাসান আকবর

শুক্রবার , ১৫ নভেম্বর, ২০১৯ at ৩:২১ পূর্বাহ্ণ
116

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিমানবন্দর চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ২০১৬ সালে যাত্রী হ্যান্ডলিং করেছিল ১২ লাখের কাছাকাছি। চলতি বছর আন্তর্জাতিক রুটের ১০ লাখ যাত্রীসহ এই বিমানবন্দর অন্তত ১৯ লাখের কাছাকাছি যাত্রী হ্যান্ডলিং করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। তিন বছরের ব্যবধানে যাত্রী হ্যান্ডলিং সাত লাখ বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার। ২০১৮ সালে যাত্রী সংখ্যা ছিল ১৭ লাখের মতো। এক বছরের ব্যবধানে চলতি বছর যাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে দুই লাখের মতো। ক্রমাগত যাত্রী সংখ্যা বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে এই বিমানবন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নূতন বোর্ডিং ব্রিজ, ট্যাক্সিওয়ে থেকে শুরু করে অবকাঠামোগত উন্নয়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চল্লিশের দশকের শুরুতে এয়ারফিল্ড হিসেবে চট্টগ্রামে এই বিমানবন্দর নির্মাণ করা হয়। মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রবাহিনীর যুদ্ধবিমানের জ্বালানি সরবরাহের জন্য এ এয়ারফিল্ড তৈরি করা হয়। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে তা যুদ্ধবিমানের ঘাঁটি থেকে একটি বাণিজ্যিক বিমানবন্দরে রূপ নেয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে এটি অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর হিসেবে ব্যবহার শুরু হয়। বাংলাদেশ বিমান এবং ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্স এখানে ফ্লাইট অপারেট করতো। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ বিমান মধ্যপ্রাচ্যের দুবাই ও সৌদি আরবে যাত্রী পরিবহন শুরু করলে বিমানবন্দরটি ১৯৯০ সালে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রূপ নেয়। তবে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের স্বীকৃতি লাভ করে প্রায় ২৩ বছর পর ২০১৩ সালে।
এর আগে জাপানি সংস্থা জাইকার আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় ১৯৯৮ সালে বিমানবন্দরটির আধুনিকায়নের কাজ শুরু হয়। ৫৭০ কোটি টাকা (৫১.৫৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) ব্যয়ে প্রায় দুই বছর সময়ে আধুনিকায়নের কাজ সম্পন্ন হয়। ২০০১ সালে চট্টগ্রাম এম এ হান্নান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নামে নতুন অবয়বে যাত্রা শুরু করে। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত বিমানবন্দরটির নাম এম এ হান্নানের নামে থাকলেও বিএনপি সরকার দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার পর চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নামকরণ করে। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকে বাংলাদেশ বিমান সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ফ্লাইট অপারেট করে। পরবর্তীতে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান সিল্ক এয়ার, ফুকেট এয়ার এবং থাই এয়ার চট্টগ্রামে আসলেও ক্রমে তারা ব্যবসা গুটিয়ে চলে যায়। কেবলমাত্র রাষ্ট্রয়াত্ত্ব ফ্লাইট অপারেটর বাংলাদেশ বিমানই এখানে ফ্লাইট অপারেট করে। অবশ্য বর্তমানে এয়ার এরাবিয়া, সালাম এয়ারসহ মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক অপারেটর এখানে ফ্লাইট অপারেট করছে। দেশীয় বেসরকারি ফ্লাইট অপারেটর রিজেন্ট এয়ার, ইউএস বাংলাও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ফ্লাইট পরিচালনা করে।
চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বর্তমানে দৈনিক প্রায় ত্রিশটি ফ্লাইট এবং প্রায় পাঁচ হাজার যাত্রী হ্যান্ডলিং করে। প্রতিদিনই আন্তর্জাতিক ফ্লাইট অপারেট করা হয়।
চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে যাত্রী যাতায়াত প্রতিদিনই বাড়ছে। ২০১৮ সালে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটে এই বিমানবন্দর ব্যবহার করে ১৭ লাখ যাত্রী আসা-যাওয়া করে। আগের বছর (২০১৭ সাল) এই সংখ্যা ছিল প্রায় ১৫ লাখ। চলতি বছরের প্রথম দশ মাসে ১৫ লাখেরও বেশি যাত্রী হ্যান্ডলিং করা হয়েছে। বছর শেষে আন্তর্জাতিক রুটের ১০ লাখসহ সর্বমোট ১৯ লাখের মতো যাত্রী হ্যান্ডলিং হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। যাত্রী সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষিতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বহু বেশি যাত্রী হ্যান্ডলিং করা হচ্ছে। একই সাথে বিমানবন্দরের রাজস্ব আয়ও লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। গতবছর এই বিমানবন্দরের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫৫ কোটি টাকা। কিন্তু বছর শেষে ৬০ কোটি টাকারও বেশি রাজস্ব আয় হয়েছে। চলতি বছর এই আয় আরো বাড়বে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়। সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ দুই ধরনের খাত থেকে রাজস্ব আয় করে থাকে। এর একটি এ্যারোনটিক্যাল খাত অপরটি নন এ্যারোনটিক্যাল খাত। এয়ারক্রাফট হ্যান্ডলিং (এ্যারোনটিক্যাল) খাত হচ্ছে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের রাজস্ব আয়ের প্রধান উৎস। এছাড়া লাউঞ্জ ভাড়া, বিজ্ঞাপন প্রদর্শনসহ নন এ্যারোনটিক্যাল খাত থেকেও রাজস্ব পায় সিভিল এভিয়েশন।
চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপক উইং কমান্ডার এ বি এম সারোয়ার ই জামান দৈনিক আজাদীর সাথে আলাপকালে বলেন, আমাদের বিমানবন্দরে যাত্রী হ্যান্ডলিংয়ে কোন সমস্যা নেই। অবকাঠামোগত সুযোগ সুবিধাও পর্যাপ্ত। বিদ্যমান সক্ষমতা দিয়ে আমরা গত বছর ১৭ লাখ যাত্রীকে সেবা দিয়েছি। এবার আমরা ১৯ লাখের কাছাকাছি যাত্রী সেবা দেবো। আমাদের কোন অসুবিধা হচ্ছে না। তবুও আমরা যাত্রী সেবার মান আরো বাড়াতে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করেছি। আমরা বোর্ডিং ব্রিজ দুইটির স্থলে চারটি করার প্রস্তাব করেছি। ট্যাঙিওয়ে বাড়াচ্ছি। বিমান রাখার জায়গা (টারমার্ক) বৃদ্ধি করেছি। আগে একই সাথে আটটি বিমান রাখা যেতো। এখন আমরা একই সাথে ১২টি বিমান রাখতে পারি। এ ছাড়া টার্মিনাল ভবন সম্প্রসারণের একটি প্রস্তাবও আমরা দিয়েছি।
উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটে মোট যাত্রী আসা-যাওয়া করেছে ১০ লাখ ৬৫ হাজার জন। ২০১৫ সালে এই সংখ্যা ছিল ১১ লাখ ৭০ হাজার জন। আর ২০১৬ সালে বিমানবন্দর দিয়ে মোট ১২ লাখ ৫০ হাজার যাত্রী আসা-যাওয়া করেছে। দুই বছরের ব্যবধানে যাত্রী সংখ্যা পাঁচ লাখ বেড়ে যাওয়াকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার বলে উল্লেখ করে চট্টগ্রাম চেম্বার প্রেসিডেন্ট মাহবুবুল আলম বলেন, বিমানবন্দরের সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জিনিস। তবে চট্টগ্রামের জন্য সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে পূর্বদিকের কোন একটি ফ্লাইট অপারেটরকে নিয়ে আসা। যত দ্রুত আমরা পূর্বমুখী দুয়ার সম্প্রসারণ করতে পারবো ততই আমাদের উপকার হবে। তিনি বলেন, শুধু থাইল্যান্ড বা মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্যও এখন আমাদেরকে ঢাকার দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে। বিষয়টিকে দুঃখজনক বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জরুরিভিত্তিতে উদ্যোগ নিয়ে থাই এয়ারকে চট্টগ্রামে আনা গেলে যাত্রী হ্যান্ডলিং আরো অনেক বাড়বে। তিনি বাংলাদেশ বিমানকে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে থাইল্যান্ড কিংবা মালয়েশিয়া এবং ফিরতি পথে চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকায় যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সাথে এই নিয়মে ফ্লাইট অপারেট করে বাংলাদেশ বিমান শুধু চট্টগ্রামের মানুষেরই উপকার নয়, নিজেদের রাজস্ব আয়ও বাড়িয়েছে। তিনি বাংলাদেশ বিমানকে জরুরিভিত্তিতে পূর্বমুখী ফ্লাইট অপারেট করার আহ্বান জানিয়েছেন।

x