চট্টগ্রামে লিবারেশন স্কয়ার প্রতিষ্ঠার দাবি

প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা চান মুক্তিযোদ্ধারা

ঋত্বিক নয়ন

বুধবার , ২১ মার্চ, ২০১৮ at ৫:০০ পূর্বাহ্ণ
114

আন্দোলনসংগ্রামের তীর্থস্থান চট্টগ্রাম। আন্দোলনের সূতিকাগারও বলা চলে। এ ঐতিহাসিক সত্যের কারণে বলা হয়, চট্টগ্রাম সবার আগে। সেই ব্রিটিশ আমল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত যুগে যুগে চট্টগ্রাম প্রমাণ করে চলেছে নিজেকে। স্বাধীনতা যুদ্ধের পেছনে চট্টগ্রামের ব্যক্তি বিশেষ থেকে শুরু করে সর্বস্তরের অবদান ছিল অসামান্য। ১৯৭১ সালে ডিসেম্বরে দেশ স্বাধীনের আগেও চট্টগ্রাম থেকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন পরিচালিত হয়ে আসছিল। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার ৪৭ বছর পার হলেও চট্টগ্রামে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মরণে জাতীয় স্মৃতিসৌধ নেই। স্বাধীনতা দিবস কিংবা বিজয় দিবসে শ্রদ্ধা জানানো হয় ভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে নির্মিত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে।

বাণিজ্যিক রাজধানীখ্যাত চট্টগ্রামে অবহেলার এ দৃষ্টান্ত জাতির জনকের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সদয় দৃষ্টিতে মুছে যাবেণ্ডএ প্রত্যাশা চট্টগ্রামবাসীর। তাই আজ প্রধানমন্ত্রীর চট্টগ্রাম আগমন উপলক্ষে চট্টগ্রামে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধকে স্মরণ করে বীর শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে একটি লিবারেশন স্কয়ার প্রতিষ্ঠার দাবি তুলেছেন চট্টগ্রামের মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যবৃন্দ। যেখানে স্মৃতিসৌধ ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন সংর ণের জন্য জাদুঘর, পাঠাঘার, গবেষণা কেন্দ্রসহ বিভিন্ন স্থাপনা থাকবে। চট্টগ্রাম বিভাগের সকল শ্রেণীপেশার মানুষের জন্য এ দাবি জানান চট্টগ্রামের মুক্তিযোদ্ধাগণ ও শহীদ পরিবারের সদস্যবৃন্দ।

চট্টগ্রামে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি সম্বলিত স্মারক বা জাতীয় স্মৃতিসৌধ নির্মাণের দাবি দীর্ঘদিনের। কিন্তু নানা কারণে এর বাস্তবায়ন বারবার উপেক্ষিত হচ্ছে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল একাধিকবার। পরে তা আর আলোর মুখ দেখেনি। জাতীয় স্মৃতিসৌধ নির্মাণের দাবি শুধু নয়, মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলী নিয়ে স্বতন্ত্র জাদুঘর নির্মাণ, লালদীঘি মাঠে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা ঘোষণার স্থানটিতে স্মৃতি ভাস্কর্য নির্মাণ, কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের সামনে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণ, সোয়াত জাহাজ থেকে গুলিবর্ষণ করে মানুষ হত্যার স্থানটি নির্ধারণ করে স্মৃতি সংরক্ষণ করা, শহীদ স্বপন চৌধুরীর ভাস্কর্য স্থাপন, শহীদ রফিক সড়কে ভাস্কর্য স্থাপন, ফয়’স লেক বধ্যভূমি সিটি কর্পোরেশনের আওতায় সংরক্ষণ করা, ঈদগাহ কাঁচা রাস্তার মাথায় তৎকালীন বিডিআর শহীদদের স্মৃতিসৌধ সংরক্ষণ, দক্ষিণ কাট্টলী নাথপাড়ায় বধ্যভূমি সংরক্ষণ, ১৯৬০এর দশকের নেতৃবৃন্দসহ শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধাদের নামে রাস্তা ও গলির নামকরণ এবং সিআরবি সংলগ্ন কাঠের বাংলো সংরক্ষণ ইত্যাদি। মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের স্থির বিশ্বাস, প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারটি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করলে অচিরেই সবকটি প্রস্তাবনা একে একে আলোর মুখ দেখবে।

জানা গেছে, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সদ্য বিদায়ী জেলা প্রশাসক জিল্লুর রহমান চৌধুরী এ প্রসঙ্গে আজাদীকে বলেছিলেন, প্রাথমিকভাবে ৪ থেকে ৫ একর জায়গা নির্বাচনের জন্য মুক্তিযোদ্ধা নেতাদের বলা হয়েছে। জায়গা নির্বাচন হলে অচিরেই জাতীয় স্মৃতিসৌধ নির্মাণের কাজ শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আশা করছি, বেশি সময় লাগবে না। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও গণপূর্তের অধীনে এর নির্মাণ কাজটি করা হবে।

জাতীয় স্মৃতিসৌধ নির্মাণ পরিকল্পনার ব্যাপারে তিনি জানিয়েছিলেন, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি বিজড়িত বিভিন্ন স্মারকের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল, জাতীয় চার নেতার ছবি, জাতীয় ফুল শাপলাসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় যা থাকার কথা তা দিয়ে এই স্মৃতিসৌধ গড়ে উঠবে। এছাড়া এই স্মৃতিসৌধে এসে সাধারণের কথা বলার মতো একটি জায়গা ও ইতিহাস চর্চার জন্য একটি পরিবেশও তৈরি করার চিন্তাভাবনা চলছে।

মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ডা. মাহফুজুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে যথেষ্ট আন্তরিক। কিন্তু হচ্ছে না অজানা কারণে। এর আগে ডিসি ফরিদ মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারদের নিয়ে বৈঠক করে স্মৃতিসৌধ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তিনি চলে যাওয়ার পর সেটা ওইটুকুতেই পড়ে আছে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সম্বলিত বিভিন্ন স্থাপনা সংরক্ষণ ও সৌধ নির্মাণের কাজ বাস্তবায়ন হয়নি। ফয়’স লেকে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণের কাজ মাঝখানে শুরশু হলেও বর্তমানে তা অনেকদিন হচ্ছে বন্ধ হয়ে আছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায়। এভাবে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে উত্থাপিত এসব দাবিদাওয়ার অনেক কিছুই এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।

মুক্তিযোদ্ধা সংসদের জেলা কমান্ডার মোহাম্মদ সাহাব উদ্দিন আজাদীকে বলেন, আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে চট্টগ্রামের সকল মুক্তিযোদ্ধা দাবি জানাচ্ছি একটি লিবারেশন স্কয়ার গড়ে তোলার জন্য। যেখানে স্মৃতিসৌধের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্বলিত জাদুঘর, থিয়েটার হলসহ বিভিন্ন বিষয় থাকবে। তিনি বলেন, এক অনুষ্ঠানে সদ্য বিদায়ী জেলা প্রশাসকের সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের এ ব্যাপারে কথা হয়েছে। এ সময় তিনি জাতীয় স্মৃতিসৌধ নির্মাণের জন্য আমাদের জায়গা দেখতে বলেছেন। একই সময় তিনি এডিসি রেভিনিউকেও জায়গা নির্বাচনের জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন।

তিনি বলেন, ২০১০ সাল থেকে আমরা জাতীয় স্মৃতিসৌধ নির্মাণের দাবি উত্থাপন করে আসছি। এই সময় বিভিন্ন জটিলতার কারণে দাবিটি বাস্তবায়ন হয়নি। বিশেষ করে সেই সময় জায়গা নির্বাচন নিয়ে সমস্যা ছিল। কিছু রাজনৈতিক নেতা এই বিষয়ে বিরোধিতা করেছিলেন। সেটা ছাড়া অন্য কোনো সমস্যা আমাদের ছিল না।

প্রজন্ম৭১ চট্টগ্রাম বিভাগের সভাপতি ও মুক্তিযোদ্ধা প্রফেসর ড. গাজী সালেহ উদ্দিন বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা দেশের জন্য আত্মত্যাগ করেছেন, তারা এ দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান। তাদের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান জানানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। স্বাধীনতা দিবসে কিংবা বিজয় দিবসে চট্টগ্রামের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে এখনো নগরবাসীকে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে হচ্ছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় যাদের জন্ম হয়নি, এমন প্রজন্মের কাছে স্বাধীনতার সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার জন্যই চট্টগ্রামসহ দেশের প্রতিটি বিভাগ, প্রতিটি জেলা, এমনকি প্রতিটি থানা, ইউনিয়ন ও গ্রাম এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মরণে স্মৃতিসৌধ গড়ে তোলা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে দেশের আনাচেকানাচে যেখানেই বধ্যভূমি রয়েছে, সেগুলোরও সংরক্ষণ করা জরুরি।

উল্লেখ্য, মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাগুলো নিয়ে স্মৃতি স্থাপনা নির্মাণের লক্ষ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের আরো একটি সংগঠন সম্প্রতি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের কাছে ১১টি প্রস্তাবনা পেশ করে। সেখানেও একই দাবিগুলো তুলে ধরা হয়। দাবি পূরণের ব্যাপারে মেয়রের পক্ষ থেকে আশ্বাসও দেওয়া হয়।

x