চট্টগ্রামের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে : ছালাম

মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন প্রকল্পের পরামর্শকদের সাথে মতবিনিময় ।। উন্নয়নের মহাযাত্রায় সিডিএ অসাধ্য সাধন করেছে

আজাদী প্রতিবেদন

মঙ্গলবার , ১২ মার্চ, ২০১৯ at ৬:৪২ পূর্বাহ্ণ

নগরীতে উন্নয়নের মহাযাত্রায় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) অসাধ্য সাধন করেছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম। এ মহাযাত্রায় তিনি সবাইকে আস্থায় নিয়ে বিশাল এ কর্মযজ্ঞ সম্পাদন করার কথাও জানালেন। গতকাল সোমবার সকালে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকার মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন প্রকল্পের পরামর্শকদের সাথে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন। সিডিএ’র কনফারেন্স হলে সকালে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সিডিএ’র প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ শাহীনুল ইসলাম খান ও আবু ঈসা আনছারীর পরিচালনায় সভায় সিডিএ’র চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম বলেন, দশটি বছর পার করার পর শেষ সময়ে এসে মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে বিজ্ঞজনদের সাথে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছি। ১৯৯৫ সালে মাস্টারপ্ল্যান হয় যেটা ১৯৯৯ সালে এসে গেজেট হয়। আগামী ডিসেম্বরে মাস্টারপ্ল্যানের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। অতীতকে বাদ দিয়ে সামনের এগিয়ে যেতে হবে।
এ এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের সহযাত্রী হবে উন্নয়ন ও অগ্রগতি।
মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে নিজেদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে ছালাম বলেন, দুই বছর আগে ৩২টি ওয়ার্ডে আগে কাজ শুরু করি। স্থানীয় রাজনীতিক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গদের নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়। আমার চিন্তায় ছিল যাদের জন্য মাস্টারপ্ল্যান তাদের না জানিয়ে এটা হতে পারে না। আমি তাদের সাথে কথা বলেছি। ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে সভা করেছি। ৪১টি ওয়ার্ডকে আলাদা করে মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করার চিন্তা করেছি। সবাই বলেছে ওয়ার্ড ভিত্তিক করলে ভালো হবে। এ নিয়ে একটি সক্রিয় গাইডলাইন দিতে না পারলে এ উদ্যোগ ব্যর্থ হবে।
সিডিএ চেয়ারম্যান বলেন, ১৯৯৫ সালে মাস্টারপ্ল্যানের চিন্তাধারা আজকের চিন্তাধারার মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে। অনেক উন্নয়ন হয়েছে, অনেক কাজ হয়েছে। অন্যান্য জেলার ভবিষ্যত এবং চট্টগ্রামের ভবিষ্যতের মধ্যে তফাৎ আছে। সাগর, নদী ও পাহাড় বেষ্টিত চট্টগ্রামের অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। কাজ করতে গেলে সুনামও হবে দুর্নামও হবে। তাই বলে ঘরে বসে থাকলে কাজ হবে না। চট্টগ্রামের উন্নয়নের স্বার্থে সিডিএ ঝুঁকি নিয়েছে। কতুটুক কাজ করতে পেরেছি সেটা মানুষ বিচার করবে। চট্টগ্রামের মানুষ জলাদ্ধতামুক্ত, যানজটমুক্ত শহর চায়। বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম চায়। সেটাকে নিয়ে আমরা যাত্রা করি। এ যাত্রা মসৃণ ছিল না। অনেক কাঠখড় পুঁড়িয়ে আজকে সিডিএ স্বমহিমায় উদ্ভাসিত। তিনি বলেন, সময় ও সুযোগ হচ্ছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ দুটাকে কাজে লাগিয়ে উন্নতির শিখরে উঠেছে মালয়েশিয়া, ব্যাংকক ও সিঙ্গাপুরের মতো শহর।
তিনি আরো বলেন, ২০০৯ সালে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মধ্যে একটি বিপ্লব ঘটে। প্রথম কোনো রাজনৈতিক কর্মী চেয়ারম্যানের পদে আসে। এরপর যা হয়েছে সেটা ইতিহাস। ২০ ফিটের রাস্তা সম্প্রসারণ করে ৬০ ফিট করেছি। ১০ হাজার বাড়িঘরের জায়গা রাস্তার জন্য নিয়েছি, কোনো আওয়াজ হয়নি। মসজিদ, মন্দির, মাদরাসা, কবরস্থান থেকে জায়গা নিয়ে রাস্তা করা হয়েছে। কেউ কোনো আওয়াজ করেনি। সবাই মানুষের স্বার্থে রাস্তার জন্য জায়গা ছেড়ে দিয়েছে। কোন আমলে এধরনের কর্মযজ্ঞ সম্পাদনের রেকর্ড নেই। এটা সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়ন দৃঢ়তার কারণে। তিনি আরো বলেন মিরসরাইয়ে বাংলাদেশে সর্ববৃহৎ ইকোনমিক জোনের কাজ চলমান রয়েছে। পাল্টে যাবে চট্টগ্রামের উত্তরাঞ্চলের চেহারা। টানেল, এলিভেটেড এঙপ্রেসওয়ে ও বিদ্যুৎ নির্মাণের মাধ্যমে পাল্টে যাবে দক্ষিণের চেহারাও।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকার মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন (২০২০-২০৪১) প্রকল্পের পরামর্শকের কার্যপরিধির উপর মতবিনিময় সভায় সিডিএ চেয়ারম্যান আরো বলেন, এ মাস্টারপ্ল্যানের কারণেই আজকে চট্টগ্রাম তথা দেশের অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্বরা এখানে এসেছে। সবাই মিলে আমরা একটি গণমুখী ও সমৃদ্ধ মাস্টারপ্ল্যান উপহার দিতে চাই।
সভায় ইঞ্জিনিয়ার এম আলী আশরাফ বলেন, নদী, সাগর, পাহাড় বেস্টিত চট্টগ্রাম নগরীকে ভালভাবে প্রমোট করতে হলে পরিকল্পনার প্রয়োজন। এ পরিকল্পনার ছাপ মাস্টারপ্ল্যানে থাকা দরকার। তিনি আরো বলেন, আঞ্চলিক পরিকল্পনাও থাকা দরকার। আলাদা স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ জোনের বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে মাস্টারপ্ল্যানে। ডিজাস্টারের কথা মাথায় রাখতে হবে। চট্টগ্রাম বন্দর ও কর্ণফুলী আমাদের প্রাণ। দুইটাকে বাঁচাতে প্ল্যানিং থাকা প্রয়োজন। এসব কাজ বাস্তবায়নটা করবে কে সেটাও বলে দিতে হবে মাস্টারপ্ল্যানে।
প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম মানিক বলেন, কোন সংস্থা কোন কাজটি করবে এবং তার টাইমফ্রেম কি হবে সেটাও বলে দিতে হবে মাস্টারপ্ল্যানে। একইসাথে সিটি বাস রোড, সিটি বাস টার্মিনাল ও হকার ম্যানেজমেন্ট কিভাবে হবে তার নির্দেশনাও থাকা চাই। নগরীতে রিঙা কত থাকবে, টানেল কেন্দ্রিক ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট কিভাবে হবে তাও স্পষ্ট হতে হবে এ প্ল্যানের মাধ্যমে। অধ্যাপক ড. মো. শাকিল আখতার জানান, মাস্টারপ্ল্যানের ভিশন কি জানতে হবে কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠানকে। তা না হলে তারা পথ হারাতে পারে।
মুহাম্মদ রাশিদুল হাসান জানান, মাস্টারপ্ল্যানের প্রক্রিয়ার সাথে জিওলজিস্ট রাখা দরকার। কারণ চট্টগ্রাম ও সিলেট ভূমিকম্প প্রবণ এলাকা। অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ বলেন, এ ধরনের একটি মাস্টারপ্ল্যান উপহার দেয়ার জন্য ৩০ কোটি টাকা মোটেও পর্যাপ্ত নয়। স্থপতি পরিকল্পনাবিদ রেজাউল করিম বলেন, নগরীর প্রায় অর্ধেক জায়গার মালিক রেলওয়ে। কিন্তু তাদের কেউ এখানে আসেননি। ট্যুরিজম দিয়েই শুধু বিশ্বজয় করেছে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশ। মাস্টারপ্ল্যানের সময় ট্যুরিজমের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।
তিনি বলেন, সিটিকে মূল হিসেবে ধরে আশপাশের এলাকায় স্যাটেলাইট টাউন গড়ে তুলতে হবে। জামালখানের মতো ছোট্ট এলাকায় ১৪টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিভাবে হয়? এ বিষয়গুলোও মাথায় রাখা চাই।
মোহাম্মদ নাজিম উদ্দীন বলেন, ফরেস্ট ম্যানেজমেন্টের ব্যবস্থা রাখা দরকার মাস্টারপ্ল্যানে। স্থপতি জেরিনা হোসেন বলেন, সিডিএকে প্ল্যানিং কর্তৃপক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে তার চরিত্রগত পরিবর্তন দরকার। স্থাপনা করার জন্য প্ল্যান দিব কি দিবনা এসবের মধ্যে আটকে থাকলে হবে না। পরিকল্পিত নগরী করতে হলে কে কাজ করবে তাও স্পষ্ট হতে হবে। একেকজন একেকভাবে কাজ করলে হবে না। তিনি আরো জানান, মাস্টারপ্ল্যানে ট্রাফিক ইম্পেক্ট ম্যানেজমেন্ট থাকা চাই। শুধু ভিআইপিদের জন্য বিনিয়োগ করলে হবে না। বিনিয়োগ হতে হবে সকলের কথা মাথায় রেখে। যেসব এলাকায় মাস্টারপ্ল্যানে অন্তর্ভুক্ত হবে তাদের আঞ্চলিক প্ল্যান রাখা দরকার।
মতবিনিময় সভায় আরো বক্তব্য রাখেন, বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আরিফ মাহমুদ, স্থপতি নাজমুল লতিফ, শাহীন আক্তার, প্রকৌশলী মাহবুবুল আলম, অধ্যাপক এ.টি.এম শাহজাহান, সহকারী অধ্যাপক দেবাশীষ রায় রাজা, সিডিএ প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শাম্‌স, সচিব তাহেরা ফেরদৌস, সিডিএ বোর্ড সদস্য আশিক ইমরান, জসিম উদ্দিন শাহ, কেবিএম শাহজাহান, প্রকৌশলী এ.এ.এম হাবিবুর রহমান, নগর পরিকল্পনাবিদ সরোয়ার উদ্দিন আহমেদ, মো. জহির আহমেদ, সাইয়েদ ফুয়াদুল খলিল আল ফাহমী, প্রকৌশলী কামাল হোসেন, প্রকৌশলী মো. আশরাফুজ্জামান, প্রকৌশলী মোস্তফা জামাল, আর্কিটেক্ট মো. গোলাম রাব্বানী চৌধুরী, মো. জয়নুল আবেদীন, জান্নাতুল ফেরদৌস, নাজমা বেগম, মো. নুরুল করিম প্রমুখ।

x