চট্টগ্রামের বৈচিত্রপূর্ণ নাম

জ্বালনধারা থেকে চিটাগং

মীর আসলাম, রাউজান

সোমবার , ২৫ নভেম্বর, ২০১৯ at ১০:৩৩ পূর্বাহ্ণ

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের লীলা ভূমি আমাদের চট্টগ্রাম। প্রাচ্যের রাণী খ্যাত এই চট্টগ্রাম যুগে যুগে পরিচিত হয়ে আসছে বহু অর্থবোধক নামে। চট্টগ্রামের পরিবেশ,ভৌগোলিক অবস্থান, ও সৌন্দর্য্যের বিবেচনায় যুগে যুগে নামকরণ করে গেছেন আদি শাষক, বিদেশি পর্যটক, গবেষকগণ।
জ্বালনধারা ঃ ইতিহাসবিদদের মতে তিব্বতী আদি গ্রন্থাদিতে চট্টগ্রামের আদি নাম বলে উল্লেখ আছে। এই নামের অর্থ হচ্ছে তপ্তজলধারার অঞ্চল। গবেষকদের ধারণা সীতাকুণ্ড ও বাড়বকুণ্ডের তপ্তজলধারা থেকে এই নামের উৎপত্তি। এই নামের প্রচলন ছিল খ্রীস্টীয় দশ শতকের মধ্যবর্তী সময় পর্যন্ত।
সামন্দর ঃ এক আরব পণ্ডিত খুরদাদ বেহ্‌র এর গ্রন্থ কিতাবুল মসালিক আল সমালিক ও হুদুদুল আলম গ্রন্থে চট্টগ্রামকে উল্লেখ করা হয়েছে সামন্দর নামে। এই নামে অর্থ বিশ্লেষণ করা হলে দেখা যায় সাম অর্থ অগ্নি ও অন্দর ভিতর। গবেষকদের ধারণা এই নামকরণ সম্ভবত জ্বালনধারার আরবী-ফারসীররূপ।
শ্যাৎ-গাং ঃ পণ্ডিত বার্নোলীর মতে প্রাচীণ আরব নাবিকরা মনে করতো চট্টগ্রাম গঙ্গানদীর মোহনাস্থিত ব-দ্বীপ এই দৃষ্টিকোণ থেকে সম্ভবত এই নামকরণ। শ্যাৎগাং আরবী শব্দ। ভাগ করলে অর্থ দাঁড়ায় শ্যাৎ অর্থ বদ্বীপ, গাং অর্থ গঙ্গানদী।
চিৎ-তৌৎ-গৌং ঃ খ্রীস্টীয় দশম দশম শতকের মধ্যবর্তী সময় পর্যন্ত টেকনাফের নাফ থেকে ফেনী নদীর সীমান্ত পর্যন্ত এলাকাটি আরাকান রাজ্যভুক্ত ছিল। তৎকালীন আরাকান রাজা রাজ সুলত ঈং চন্দর নিজ অধিকৃত রাজ্যাংশে নাম করেন চিৎ-তৌৎ-গৌং।
চাটিগ্রাম ঃ আরাকানের প্রাচীন রাজন্য কাহিনী রাজোয়ান এর মতে চিৎতৌৎগং এর কালক্রমে বিবর্তিত হয়ে চাটিগ্রাম হয়েছে। তৎকালীন রাজা মহেন্দ্র দেবের আমলে তৈরী মুদ্রায় চাটিগ্রাম দেখা যায়।
চৈত্যগ্রাম ঃ চট্টগ্রামের বৌদ্ধ সমপ্রদায়ের ধারণা প্রাচীনকালে এ অঞ্চলে অসংখ্য বৌদ্ধ চৈত্যের অস্থিত্ব ছিল। সেকারণে এই স্থানের নাম চৈত্যগ্রাম হয়। চৈত্যের অর্থ হচ্ছে বৌদ্ধ কেয়াং। এই চৈত্যগ্রামের বর্তমান রূপ হচ্ছে আজকের চট্টগ্রাম। চট্টল ঃ পার্বত্য ত্রিপুরার রাজন্য কাহিনী রাজমালার গ্রন্থকারের মতে প্রাচীনকালে এ অঞ্চলে চট্টভট্ট নামে কুলীন ব্রা‏হ্মণ জাতির নিবাস ছিল বলে নাম করা হয়েছে চট্টল। এছাড়া আদি বহু গ্রন্থে এই চট্টগ্রামকে চট্টল হিসাবে দেখা হয়েছে।
চাটিগাঁ ঃ এ অঞ্চলের মুসলমান গবেষকদের মতে প্রাচীনকালে চট্টগ্রাম অঞ্চলটি ছিল জ্বীন-পরীর নিরাপদ আবাসস্থল। এ অঞ্চলে পীর বদর আউলিয়ার আগমন ঘটলে তিনি আধ্যাত্মিক ক্ষমতা বলে মৃৎ প্রদীপ জ্বালিয়ে জ্বীন-পরী বিতাড়িত করেন। সেই থেকে নামকরণ হয় চাটিগাঁ। গৌড়ের সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ ও জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ শাহ এর আমলের মুদ্রার গায়ে এই নাম পাওয়া যায়।
চর্তুগ্রাম ঃ বৃটিশ যুগে ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ায় রচিত ওমলি সাহেবের মতে সংস্কৃতির চর্তুগ্রাম শব্দ থেকে চট্টগ্রাম নামকরণ।
কর্ণবুল ঃ এগার শতকের আরব ভৌগোলিক আল ইদ্রিসীয়ার গ্রন্থে কর্ণফুলী নদীর নাম অনুসরণ করে চট্টগ্রামের নাম কর্ণবুলি হিসাবে লিখেছেন।
সোদকাওয়ান ঃ মরক্কোর ভূপর্যটক ইবনে বতুতা ১৩৪৬-৪৭ খ্রীস্টাব্দে সমুদ্র পথে চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে এদেশে ভ্রমণ করেছিলেন। তিনি তার ভ্রমণ কাহিনীতে চট্টগ্রামকে উল্লেখ করেছিলেন সোদকাওয়ান হিসাবে।
ফতেয়াবাদ ঃ মোগল আমলের কবি দৌলত উজির বাহরাম খাঁ বিরচিত লাইলী মজনু কাব্যে ও হমিদ উল্লাহ খাঁ এর আহাদিসুল খাওনীন সূত্রে প্রকাশ গৌড়ের সুলতান নসরত শাহ যুবরাজ থাকাকালে চট্টগ্রাম জয় করেন। এরপর এই অঞ্চলের নাম নতুন নামকরণ করেন ফতেয়াবাদ।
পোট্রো গ্রান্ডো ঃ তৎকালীন সময়ে এদেশে আসা যাওয়ায় থাকা পর্তুগীজ বণিকরা চট্টগ্রামকে পোট্রো গ্রান্ডো নামে অভিহত করতো।
ইসলামাবাদ ঃ সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে ফেনী নদীর দক্ষিণ তীর থেকে শঙ্খ নদীর উত্তর তীর পর্যন্ত ভূভাগকে ইসলামাবাদ নামে নামকরণ করেছিলেন।
চিটাগাং ঃ ১৭৬০ খ্রীস্টাব্দে বাংলার নবাব মীর কাসিম এর সনদ মূলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ইসলামাবাদের দেওয়ানী শাসনের কর্তৃত্ব লাভ করলে ইংরেজরা চট্টগ্রামের নাম চিটাগাং করেন। সর্বশেষ সিদ্ধান্তে পুনঃস্থাপিত হয়েছেন চট্টগ্রাম।
(লেখার সূত্র ঃ ইতিহাসবিদ আবদুল হক চৌধুরীর গ্রন্থ চট্টগ্রামের সমাজ ও সংস্কৃতির রূপরেখা)

x