চট্টগ্রামের চারুশিল্পের সেকাল – একাল

বৃহস্পতিবার , ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৩:৫৪ পূর্বাহ্ণ
30

আধুনিক মননশীলতা, শিল্প সৃষ্টির চিৎপ্রকর্ষতা এবং সৃজনশীলতায় নব নব দিগন্ত আবিষ্কারের প্রয়াস চট্টগ্রামের শিল্পীদের প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ করে চলেছে। চট্টগ্রামের চারুকলা আজ তাই বাংলাদেশের শিল্পাঙ্গনে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর পূর্ববঙ্গ তথা পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকায় প্রাতিষ্ঠানিক চারুকলা চর্চা শুরু হওয়ার প্রায় বাইশ বছর বা দুদশক পর চট্টগ্রামে আধুনিক চারুকলা চর্চার প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকান্ডের সূত্রপাত ঘটে।
চট্টগ্রাম কখনই শিল্পকলা ও সংস্কৃতিবর্জিত অঞ্চল ছিলো না। এখানে আবিষ্কৃত প্রাচীনকালের পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনাবলি, প্রাচীন স্থাপত্য, শিলালিপি, তাম্রশাসন ইত্যাদি প্রমাণ করে এখানে প্রায় দেড় হাজার বছরের কাছাকাছি সময় ধরে শিল্প-সাহিত্য চর্চা হয়ে আসছে। শিল্পকলার সঙ্গে প্রাচীন চট্টগ্রামের সম্পর্কের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে ১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দে পটিয়ার ছনহরা থেকে প্রাপ্ত দশভুজা ধাতুমূর্তি। ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দে মিরসরাইয়ের জোরারগঞ্জ থেকে পাওয়া পিতলে তৈরি তিনটি ছোট ভাস্কর্য এবং ১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দে আনোয়ারার ঝিয়রি গ্রাম থেকে প্রাপ্ত ৬১ টি বুদ্ধমূর্তি, মন্দিরের দুটি ক্ষুদ্র অনুকৃতি ইত্যাদি। ঝিয়রির আবিষ্কারকে চট্টগ্রামে আঞ্চলিক শিল্পকলা ও ভাস্কর্যের চমকপ্রদ নিদর্শন এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় শিল্পকলার প্রসারে অনন্য সাক্ষ্য হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
চট্টগ্রামের প্রাচীন ও পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোর দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যাবে বিপুল বৈভব। স্থাপত্যকলায় অনবদ্য বৃহত্তর চট্টগ্রামের মন্দিরসমূহ। সেগুলোর ফলকলিপি, স্থাপত্য নকশা চট্টগ্রামের শিল্পকলার চাক্ষুষ দৃষ্টান্ত। এইসব ইতিহাসের প্রত্নফলকের সংক্ষিপ্ত আভাস প্রমাণ করে চট্টগ্রামে শিল্পকলার ক্ষেত্র প্রস্তুতির কাজটি চলছিলো অনেক প্রাচীনকাল থেকেই। তবে যুদ্ধবিগ্রহ, ঘন ঘন রাজনৈতিক-সামাজিক অস্থিরতা অনেক মহৎ উদ্যোগকে ব্যাহতও করেছে। এটা খুবই কঠিন সত্য যে, প্রায় চার দশক আগে পাহাড়প্রমাণ আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামে চারুকলা চর্চার সূচনা ঘটে।
১৯৬৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার তিন বছরের মধ্যে বাংলা বিভাগে শিল্পকলার ইতিহাস ও নন্দনতত্ত্বের তত্ত্বীয় জ্ঞান সাবসিডিয়ারি বিষয় হিসেবে অনুশীলনের সূত্র ধরে সম্মিলিত চারুকলা নামে এই অভিযাত্রা হয়তো ছিলো সময়েরই দাবি। এই অভিষেকের প্রাণপুরুষ ছিলেন শিল্পী রশিদ চৌধুরী। ১৯৭০ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলা বিভাগ চালু, তাতে নাট্যকলার সংযুক্তি, তাতে দেশের প্রখ্যাত শিল্পীদের শিক্ষক হিসেবে যোগদান, চারুকলা বিষয়ে সম্মান কোর্স এবং এমএ কোর্স চালু ইত্যাদির মধ্য দিয়ে আলোকিত হয়ে উঠতে থাকে চট্টগ্রামে প্রাতিষ্ঠানিক চারুকলা চর্চা। ১৯৭০ সালে চারুকলা বিভাগে দেশের বরেণ্য শিল্পীদের মধ্যে মুর্তজা বশীর, দেবদাস চক্রবর্তী, মিজানুর রহিম, ১৯৭৪ সালে আবুল মনসুর, বিভাগের প্রথম দিককার ছাত্রদের মধ্যে ১৯৭৫-৭৬ সালে সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ, মনসুর উল করিম, আনসার আলী, নাসিম বানু, শফিকুল ইসলাম প্রমুখ শিল্পী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের উত্তাল সময়ে ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রামের রশিদ চৌধুরী, দেবদাস চক্রবর্তী, সবিহ উল আলম, মিজানুর রহিম, সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ এবং আনসার আলীর অঙ্কিত ‘বাংলায় বিদ্রোহ’ শীর্ষক ছটি চিত্র সংগ্রামী জনমানসে নতুন অভিব্যক্তির সঞ্চার করেছিলো। স্বাধীনতা-উত্তরকালে চট্টগ্রামে শিল্পী সবিহ উল আলমের নেতৃত্বে, শফিকুল ইসলাম, এনায়েত হোসেন, আবুল মনসুর, শওকত হায়দার, চন্দ্র শেখর দে ও তাজুল ইসলামের যৌথ চিত্র-প্রদর্শনী নতুন সত্তার আধুনিকতা-অভিমুখী অভিযাত্রার স্পষ্ট সংকেত ছিলো। এই প্রদর্শনীর শিরোনাম ছিলো ‘আবহমান বাঙলা, বাঙালী’।
শিল্পী রশিদ চৌধুরী তাঁর গভীর দূরদৃষ্টির মাধ্যমে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন চট্টগ্রামের মাটি বহুকাল আগে থেকেই চারুকলা চর্চার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। তাঁরই আহ্বানে তৎকালীন সময়ে দেশের প্রথম এবং বিশ্ববিদ্যালয় মানের একমাত্র চারুকলা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে এসে নতুন যুগের সূচনায় শিক্ষার্থী হিসেবে যুক্ত হন যেসব শিল্পী তাঁদের মধ্যে ছিলেন শাকুর শাহ, কাজী গিয়াস, সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ, আনসার আলী, মনসুর উল করিম, চন্দ্রশেখর দে, হাসি চক্রবর্তী, অলক রায়, কে এম এ কাইয়ুমসহ আরো অনেকে। এই শিল্পীরাই স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের চারুকলা চর্চায় স্ব-স্ব ক্ষেত্রে রাখেন সাফল্যের স্বাক্ষর।
এখানে একটি বিষয় উল্লেখ্য যে ১৯৬৮ সালে চট্টগ্রামে ঢাকার শিল্পী গ্রুপ ‘কারিকা’র একটি প্রদর্শনী হয়। প্রদর্শনীর পর চট্টগ্রাম ক্লাবসংলগ্ন একটি বাড়িতে ‘চিটাগাং আর্ট সোসাইটি’ নামে একটি গ্যালারি প্রতিষ্ঠিত হয়। গ্যালারির উদ্বোধন করেছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন। এখানে শিল্পশিক্ষার সান্ধ্যকালীন কোর্সও চালু হয়েছিলো, এই প্রদর্শনীর আয়োজন ও গ্যালারির প্রতিষ্ঠায় শিল্পী রশিদ চৌধুরীর পরোক্ষ অবদান ছিলো। এই সমস্ত কর্মকান্ডই পরবর্তীকালে চট্টগ্রামে চারুকলা চর্চার প্রতিষ্ঠান গড়তে সহায়ক হয়।
১৯৭৩ সাল। চট্টগ্রাম সফররত বিশ্ববিখ্যাত ফরাসি দার্শনিক, লেখক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আঁদ্রে মালরো শিল্পী রশিদ চৌধুরীর আমন্ত্রণে শহরের মোহাম্মদ আলী সড়কের কলাভবনে উদ্বোধন করেন একটি আর্ট গ্যালারি। এই অনুষ্ঠানে শিল্পী রশিদ চৌধুরী উপস্থিত শিল্পী ও সুধীজনদের কাছে চট্টগ্রামে আর্ট কলেজ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। এগিয়ে আসেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক অধ্যাপক আবুল ফজল। যুক্ত হন বিশিষ্টজনদের আরো অনেকে। চট্টগ্রাম চারুকলা কলেজ বেসরকারি উদ্যোগে ১৯৭৩ সালের ৩ আগস্ট তিনজন শিক্ষক এবং একুশজন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করে। বিশিষ্ট শিল্পী সবিহ উল আলম কলেজের প্রথম অধ্যক্ষের দায়িত্ব পান। সহ-অধ্যক্ষের পদে যোগ দেন আবুল মোমেন। আশির দশকে শিল্পী রশিদ চৌধুরী চট্টগ্রাম ছেড়ে যান। ২০১০ সালের ২ আগস্ট চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগ এবং চারুকলা কলেজ একীভূত হয়ে ইনস্টিটিউটে পরিণত হয়।
ইতিপূর্বে চারুশিল্পের হাওয়া চট্টগ্রামের ওপর বয়ে গিয়েছিলো ১৯৫১ সালে কলিম শরাফির নেতৃত্বে প্রগতি সংস্কৃতি সম্মেলন উপলক্ষে। এতে প্রদর্শনীর জন্য আমন্ত্রিত হয় ঢাকা আর্ট গ্রুপ। খোলা মাঠে ত্রিপল টাঙিয়ে ছাত্র-শিক্ষক মিলিয়ে ৩২ জনের ১৩৩টি চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হয়েছিলো। (সূত্র : আমিনুল ইসলাম, বাংলাদেশের শিল্প আন্দোলনের পঞ্চাশ বছর, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, পৃ ৪৩)।
চট্টগ্রামের চারুকলা কোনো আঞ্চলিক সংজ্ঞায় নয়, বরং তা বাংলাদেশের জাতীয় চারুকলাকেও প্রতিনিধিত্ব করে। বিপুলসংখ্যক শিল্পী এখান থেকেই ছড়িয়ে পড়েছেন দেশ-বিদেশের নানা প্রান্তে।

x