চক্ষু চিকিৎসায় একটি মাইলফলক

রেটিনোব্লাস্টোমা চিকিৎসায় উপমহাদেশের প্রথম মেশিন পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতালে

হাসান আকবর

শুক্রবার , ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ at ৬:২০ পূর্বাহ্ণ
152

ভারতীয় উপমহাদেশে রেটিনোব্লাস্টোমা (চোখের ক্যান্সার) রোগের চিকিৎসায় প্রথম মেশিনটি চট্টগ্রামের পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতালে স্থাপন হয়েছে। আমেরিকা থেকে আনা মেশিনটি চট্টগ্রামের পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতালে চালু করা নতুন একটি বিভাগে স্থাপন করা হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম সেবা সংস্থা রোটারি ক্লাব অব মেরিবুশ (জার্মানি) এবং রোটারি ক্লাব অব চিটাগাং খুলশীর সহায়তায় চক্ষু হাসপাতালে মেশিনটি স্থাপন করা হয়। একই সাথে অপর একটি মেশিনও আনা হয়েছে। যেটি দেশে কেবলমাত্র একটিই আছে। ঢাকায় জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পাশাপাশি এখন থেকে পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতালেও মেশিনটির কার্যক্রম চলবে। নতুন দুইটি মেশিন স্থাপনে প্রায় এক কোটি বিশ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। সূত্র জানিয়েছে, বিশ্বব্যাপী রেটিনোব্লাস্টোমা নামে চোখের এই রোগের বিস্তৃতি ক্রমে বাড়ছে। কিন্তু এই রোগের চিকিৎসা বেশ কঠিন এবং ব্যয়বহুল। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোও এই রোগের চিকিৎসায় হিমশিম খাচ্ছে। তৃতীয় বিশ্বে চিকিৎসা নেই বললেই চলে।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, রেটিনোব্লাস্টোমা নামের এই রোগের বেশির ভাগ শিকার হচ্ছে শিশু। এই রোগ হলে চোখ ফেলে দিতে হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত না হলে চোখ রক্ষার সুযোগই থাকে না। অবশ্য শুরুতে ধরা পড়লে লেজার চিকিৎসার মাধ্যমে চোখ রক্ষা করার চিকিৎসা আবিষ্কৃত হয়েছে। তবে লেজার মেশিনসহ আনুষাঙ্গিক যন্ত্রপাতি এত দুর্লভ যে এসব উন্নত চিকিৎসার কথা বাংলাদেশে যেন এতদিন কল্পনাও করা যায়নি। সম্প্রতি পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতালে নতুন বিভাগ চালু করা হয়েছে। স্থাপন করা হয়েছে আমেরিকা থেকে আনা মেশিনটি। এটিই উপমহাদেশে এই রোগের চিকিৎসায় প্রথম মেশিন।
বাংলাদেশে এই মেশিন আসার পেছনে কাজ করেছেন জার্মানির ধনাঢ্য ব্যক্তি মি. গ্রেগর। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সেবা সংগঠন রোটারি ক্লাবের কার্যক্রমের সাথে জড়িত জার্মানির এই ধনাঢ্য ব্যক্তির প্রিয় কন্যার চোখে এই ক্যান্সার ধরা পড়ে। নিজের মেয়ের চোখ রক্ষা করতে তিনি নানাভাবে চেষ্টা করতে থাকেন। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও তিনি প্রিয় কন্যার চোখ রক্ষা করতে পারেননি। একটি চোখ ফেলে দিতে হয়। অপর চোখটি কোনরকমে থেরাপি দিয়ে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে। কন্যার চোখ হারানোর সাথে সাথে রোটারিয়ান মি. গ্রেগরের চোখ খুলে যায়। তিনি অনুধাবন করেন জার্মানির মতো উন্নত বিশ্বের একটি দেশে কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ করেও যদি নিজের প্রিয় সন্তানের চোখ বাঁচাতে না পারি তাহলে তৃতীয় বিশ্বের কোটি কোটি গরীব মানুষের অবস্থা কি হচ্ছে?
রোটারি ক্লাব অব মেরিবুশ (র্জামানি) প্রেসিডেন্ট মি. গ্রেগর তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর ব্যাপারে খোঁজ খবর নিতে শুরু করেন। তিনি বাংলাদেশে এই রোগের চিকিৎসায় বড় ধরনের ভূমিকা রাখার পথ খুঁজতে থাকেন। রোটারি ক্লাব অব চিটাগাং খুলশীর সাথেও মি. গ্রেগরের যোগাযোগ হয়। পরে রোটারি ক্লাব অব চিটাগাং খুলশী পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতালের স্বপ্নভ্রষ্টা ডাঃ রবিউল হোসেনের সাথে যোগাযোগ করেন। দীর্ঘ আলাপ আলোচনা এবং চিঠি চালাচালির পর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি রোটারি ইন্টারন্যাশনালের গ্লোবাল গ্রান্টের আর্থিক সহায়তায় রোটারি ক্লাব অব মেরিবুশ এবং রোটারি ক্লাব অব চিটাগাং খুলশী যৌথভাবে চট্টগ্রাম চক্ষু হাসপাতালে রেটিনোব্লাস্টোমা বিভাগ প্রতিষ্ঠা এবং মেশিন দুইটি স্থাপন করা হয়।
মেশিন দুইটির মধ্যে একটি আইকন-২ ফান্ডাস ক্যামেরা বা ফিনিঙ ফান্ডাস ক্যামেরা। এই ক্যামেরা চোখের রেটিনার চিত্র ধারণ করার কাজে বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি। এই ক্যামেরার সহায়তায় পেরিফেরাল রেটিনার ক্ষত শনাক্ত এবং চিকিৎসা পরবর্তী পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা যায়। উপমহাদেশে প্রচলিত সাধারণ পরীক্ষায় ধরা পড়ে না এমন অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিবর্তনও এই ক্যামেরা শনাক্ত করতে পারে। এই ক্যামেরা শিশুদের চোখের ক্যান্সার চিকিৎসায় বিশেষ সহায়ক বলে উল্লেখ করে প্রখ্যাত চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. সোমা রানী রায় জানান, এই ক্যামেরা বিশ্বজুড়ে নবজাতকের এই ধরনের রোগের চিকিৎসায় বড় ধরনের ভূমিকা রাখে। উপমহাদেশে প্রথমবারের মতো আনা এই মেশিনটি পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতালে গতকাল স্থাপন প্রক্রিয়া শেষ করা হয়েছে। আমেরিকার বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার মিস এলিজাবেথ অ্যাফেল গত ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে মেশিনটি স্থাপন করছিলেন। ইতোমধ্যে তিনি পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের এই মেশিন পরিচালনার ব্যাপারে প্রশিক্ষণও প্রদান করেছেন।
পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতালে সদ্য চালু করা রেটিনোব্লাস্টোমা বিভাগে স্থাপনকৃত আমেরিকা থেকে আনা দ্বিতীয় মেশিনটি হচ্ছে ট্রান্সপিউপিলারি থার্মোথেরাপি (ঞঞঞ)। ট্রান্সপিউপিলারি থার্মোথেরাপি নামের এই মেশিনটি এতদিন ঢাকাস্থ জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে (এনআইও) একটি ছিল। এটিকে একটি থারমাল লেজার আখ্যায়িত করে ডা. সোমা বলেন, বিভিন্ন রেটিনা রোগের চিকিৎসার জন্য এটি ব্যবহৃত হয়। তবে আজকাল এটি রেটিনার চোখের ক্যান্সারের (রেটিনোব্লাস্টোমা) চিকিৎসার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মেশিন। এই মেশিন চোখের ক্যান্সার চিকিৎসায় খুবই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ ধরা পড়লে এই মেশিনের সাহায্যে তা পুরোপুরি নিরাময় করার সুযোগ থাকে। ডা. সোমা বলেন, এই মেশিনের সাহায্যে প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যান্সার কোষগুলোকে ধ্বংস করা হয় এবং কেমোথেরাপির অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার এড়ানো যায়। এতে রোগী অনেক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে নিস্তার পান বলেও তিনি উল্লেখ করেন। পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতালে স্থাপন করা এই দুটি মেশিন রেটিনোব্লাস্টোমার পাশাপাশি প্রিমেচুরির রেটিনোপ্যাথির চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতালের নতুন বিভাগটি কার্যক্রম শুরু করেছে বলে উল্লেখ করে রোটারি ক্লাব অব চিটাগাং খুলশীর চার্টার প্রেসিডেন্ট রোটারিয়ান মোহাম্মদ রেজওয়ান শাহিদী জানান, এটি অনেক বড় একটি কাজ হলো। চট্টগ্রামেরই শুধু নয়, দেশের চক্ষু চিকিৎসায় একটি মাইলস্টোন স্থাপিত হলো। এই দুইটি মেশিন চোখের ক্যান্সার চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।