ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় প্রস্তুত চট্টগ্রাম

উপকূলীয় এলাকায় মাইকিং প্রস্তত ৪৭৯আশ্রয়কেন্দ্র খোরা হয়েছে কন্ট্রোল রুম

মোরশেদ তালুকদার

শনিবার , ৯ নভেম্বর, ২০১৯ at ৪:০৭ পূর্বাহ্ণ
176

ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ এর প্রভাবে সৃষ্ট সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবেলায় সবধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও সিটি কর্পোরেশনসহ বিভিন্ন সেবাসংস্থা। গতকাল দিনভর নগরী ও উপকূলীয় উপজেলাগুলোতে সতর্কতামূলক মাইকিং করা হয়েছে, খোলা হয়েছে কন্ট্রোল রুম। প্রস্তুত রাখা হয়েছে ৪৭৯টি আশ্রয়কেন্দ্র। এছাড়া আরো প্রায় চার হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। মজুদ করা হয়েছে শুকনো খাবার। গঠন করা হয়েছে মেডিকেল টিম। সবমিলিয়ে প্রাকৃতিক ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ মোকাবিলায় প্রস্তুত চট্টগ্রাম। এদিকে গতকাল সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজ মিলনায়তনে জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ মোকাবিলায় প্রশাসনের প্রস্তুতি তুলে ধরেন জেলা প্রশাসক ইলিয়াস হোসেন। এছাড়া অন্যান্য সংস্থাগুলোর মধ্যে বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত নৌ-বাহিনী ও কোস্টগার্ডের সকল জাহাজ নিরাপদে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। চট্টগ্রামের কুমিরা ঘাট থেকে সন্দ্বীপ ও হাতিয়ায় নৌ-যান চলাচল বন্ধ করা হয়েছে। ‘অ্যালার্ট-৩ জারি করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের স্টাফ অফিসার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তানভীর ফরহাদ শামীম দৈনিক আজাদীকে বলেন, বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত প্রবল ঘূর্ণিঝড় বুলবুল এর সম্ভ্যাব্য আঘাত ও ক্ষয়-ক্ষতি মোকাবিলায় আজ (গতকাল) সন্ধ্যা ৬টায় সার্কিট হাউজে জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় বিভিন্ন সেবাসংস্থাগুলোর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তারা নিজেদের প্রস্তুতিগুলো তুলে ধরেন। সভায় জেলা প্রশাসক বিভিন্ন নির্দেশনা দেন। গতকাল নগরীতে আগ্রাবাদ ও পতেঙ্গা এলাকায় এবং উপকূলীয় উপজেলাগুলোতে মাইকিং করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ উজ্জ্বল কান্তি পাল গত রাত পৌনে ১০ টায় দৈনিক আজাদীকে বলেন, ঘুর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ এর প্রভাবে চট্টগ্রামকে একেবারে আশংকামুক্ত বলা যাচ্ছে না। কারণ, ভারতীয় আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, এটি গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে। আমরাও সে ধারণা করছি। সেক্ষেত্রে চট্টগ্রামও ঝুঁকিমুক্ত নয়। বর্তমানে ৬ নম্বর সতর্কতা সংকেত আছে। গতিপথ পরিবর্তন
করলে সতর্কতা সংকেত আরো বেড়ে যাবে। ঘূর্ণিঝড়টির প্রভাবে চট্টগ্রামে ভারী বর্ষণ হতে পারে।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তুত হওয়া আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে প্রায় ৮ লক্ষ মানুষ আশ্রয় নিতে পারবেন। এর মধ্যে ৪৭৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিতে পারবেন ৫ লক্ষ মানুষ। এছাড়া দুই হাজার ২৬৯টি প্রাথমিক এবং এক হাজার ২৫০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আরো ৩ লক্ষ লোক আশ্রয় নিতে পারবেন। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে প্রতিটি আশ্রয়কেন্দ্রে ন্যূনতম ১০ থেকে ১৫টি লাইট রাখার জন্য উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের নির্দেশ দিয়েছেন জেলা প্রশাসক ইরিয়াস হোসেন। এছাড়া ত্রাণসামগ্রীর মধ্যে দুই হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার, ৩৪৯ মেট্রিক টন চাল, ৬৮১ বান্ডিল ঢেউটিন এবং ৫০০টি তাঁবু মজুদ রাখা হয়েছে। যে কোনো জরুরি প্রয়োজনে জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ কক্ষে (ফোন নম্বর: ০৩১-৬১১৫৪৫, ০১৭০০-৭১৬৬৯১) যোগাযোগ করা যাবে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াস হোসেন বলেন, সেনাবাহিনী, পুলিশ, নৌপুলিশ, কোস্টগার্ডসহ অন্য সব আইন শৃক্সখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ আছে। জরুরি প্রয়োজনে তারা মাঠে নামতে প্রস্তুত।
অন্যান্য সংস্থার প্রস্তুতি : চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাসান শাহরিয়ার কবির সিভিল সার্জনসহ স্বাস্থ্য বিভাগের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারিদের কর্মস্থল ত্যাগ না করার নির্দেশনা দেন। এছাড়া কন্ট্রোল রুমও চালু করার নির্দেশনা দেন। এদিকে চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন ২৮৪টি মেডিকেল টিম গঠন করেছে। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে ১৯৪টি অ্যাম্বুলেন্স এবং পর্যাপ্ত স্যালাইন ও ওষুধ প্রস্তুত রাখা হযেছে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স নিজস্ব জনবল ছাড়াও প্রস্তুত রেখেছে স্বেচ্ছাসেবকদের। ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (সিপিপি) এর ছয় হাজার ৬৬০ জন স্বেচ্ছাসেবক ও রেড ক্রিসেন্টের ১০ হাজার স্বেচ্ছাসেবকও প্রস্তুত আছেন উপকূলীয় এলাকায়। কন্ট্রোল রুম খুলেছে সিএমপিও। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল মজুদ রেখেছে ৫০ হাজার পিস পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট এবং এক হাজার ৪০০ পিস হাইজিন কিডস। সংগ্রহ করা হচ্ছে আরো এক লক্ষ পিস পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট। সচল রাখা হয়েছে টিউবওয়েলগুলো।
সিটি কর্পোরেশন : চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) উপকূলীয় এবং পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থানরত জনসাধারনের মাঝে সচেতনতার জন্য মাইকিং করেছে। সম্ভাব্য দুর্যোগপরবর্তী সময়ের জন্য শুকনো খাবার, পর্যাপ্ত সুপেয় পানির ব্যবস্থা এবং চিকিৎসা সেবাদানের জন্য মেডিকেল টিম ও পর্যাপ্ত ওষুধপত্র প্রস্তুত রেখেছে চসিক।
চসিকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) সুদীপ বসাক দৈনিক আজাদীকে বলেন, চীনে অবস্থান করলেও ঘূর্ণিঝড়ের কথা শুনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দিয়েছেন মেয়র। তার নির্দেশে নগরবাসীকে যে কোন জরুরি সেবা দেয়ার জন্য কন্ট্রোল রুম খুলেছি। কন্ট্রোল রুমের ফোন নম্ব্বরগুলো হলো- ০৩১-৬৩০৭৩৯, ০৩১-৬৩৩৬৪৯। দুপুরে বেড়িবাঁধ এলাকায় মাইকিং করেছি। শুকনো খাবার প্রস্তুত করা হয়েছে।
সংস্থাটির জনসংযোগ কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম জানান, দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে উপকূলবাসীকে নিরাপদে সরিয়ে আনতে সকল প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। উপকুলীয় জনসাধারণকে সরিয়ে আনা এবং দুর্যোগকালীন ও দুর্যোগ পরবর্তী রাস্তাঘাট পরিস্কার রাখার কাজে রেড ক্রিসেন্টের স্বেচ্ছাসেবীগণ, চসিক এর শ্রমিক ও পর্যাপ্ত গাড়ি প্রস্তুত রয়েছে।
এদিকে গতকাল কর্মকর্তাদের সাথে জরুরি সভা করেছেন ভারপ্রাপ্ত মেয়র হাসান মাহমুদ হাসনী। সভায় তিনি দুর্যোগকালীন ও দুর্যোগ পরবর্তী সময়ে অবস্থানের জন্য উপকূলীয় এলাকায় চসিক পরিচালিত সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সর্বদা খোলা রাখার নির্দেশ দেন। ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের সার্বিক পরিস্থিতি ও কন্ট্রোলরুমে তদারকি করছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়র চৌধুরী হাসান মাহমুদ হাসনী।
চট্টগ্রাম বন্দর : চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব মো. ওমর ফারুক জানান, গতকাল (আজ) বিকেলে বন্দর ভবনের সম্মেলন কক্ষে প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভার সিদ্ধান্তের আলোকে তিনটি ঘূর্ণিঝড় নিয়ন্ত্রণ খোলা হয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে- নৌ বিভাগের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের নম্বর : ০৩১-৭২৬৯১৬। পরিবহন বিভাগের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের নম্বর : ০৩১-২৫১০৮৭৮ এবং বন্দর সচিবের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের নম্বর : ০৩১-২৫১০৮৬৯। তিনি আরো জানান, সাইক্লোন ডিজেস্টার প্রিপার্ডনেস অ্যান্ড পোর্ট সাইক্লোন রিহ্যাবিলেটেশন প্ল্যান ১৯৯২ অনুযায়ী অ্যালার্ট-৩ জারি করেন বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল জুলফিকার আজিজ। সতর্ক সংকেত ৭ অতিক্রম করলে ‘অ্যালার্ট-৪’ জারি হয়ে যাবে।
সিএমপি : দামপাড়া সিএমপির সদর দপ্তরে জরুরি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খুলেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। পুলিশ কমিশনার মো. মাহবুবর রহমানের নির্দেশে এ নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়। এছাড়া দুর্যোগকালীন জরুরি সেবা প্রদানের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে সিএমপির সকল থানার অফিসার ইনচার্জসহ সকল স্তরের পুলিশ সদস্যদের সিএমপি কমিশনারের পক্ষ থেকে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে নগরবাসীকে নিয়ন্ত্রণ কক্ষের নম্বরে (০১৬৭৬-১২৩৪৫৬, ০১৬৭৯-১২৩৪৫৬, ০৩১-৬৩৯০২২ এবং ০৩১-৬৩০৩৫২) যোগাযোগ করতে সিএমপির পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়েছে।

x