গ্লাডিওলাস চাষে কৃষকের সাফল্য

ফরিদুল আলম দেওয়ান : মহেশখালী

সোমবার , ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ at ৫:৩৯ পূর্বাহ্ণ
96

জোটে যদি মোটে একটি পয়সা
খাদ্য কিনিয়ো ক্ষুধার লাগি,
দু’টি যদি জোটে অর্ধেকে তার
ফুল কিনে নিয়ো,হে অনুরাগী।
খাদ্য দেহের খোরাক হলেও, ফুলকে মন ও মননের খোরাক হিসেবে আখ্যায়িত কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর “ফুলের ফসল” নামক কবিতায় এ চয়নটি লিখেছিলেন । প্রবাদে আছে, “যে গান ও ফুলকে ভালোবাসে, সে কখনও মানুষ খুন করতে পারে না। তাই সৃষ্টির শুরু থেকেই ফুল মানবকুলে ভালোবাসার পাত্র হয়ে স্থান করে নিয়েছে তার আপন সৌরভে। তাইতো প্রেমিক প্রেমিকা, প্রিয়জন, বন্ধু বান্ধব কিংবা সম্মানীত ব্যক্তি যাই হোক, তার কাছে প্রিয়জনের কোটি টাকার উপহার সামগ্রির চেয়েও মূল্যবান মনে করে একগুচ্ছ ফুলকে। ফুলের কাছে দুর্বল নয় পৃথিবীতে এমন বন্ধু কিংবা শত্রু খুব কমই পাওয়া যাবে। এ ফুল ক্রেতার কাছে মাত্র হাতে গোনা ক’টি টাকার পণ্য হলেও এ ফুলকে উপজীব্য করে আয় রোজগার করছে হাজারও পরিবার। কেউ চাষ করে,আবার কেউ ফুল বিকিকিনি করে। তেমনি ফুল চাষ করে জীবনে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন কৃষি শিক্ষায় শিক্ষিত একজন ডিপ্লোমা কৃষিবিদ। ফুল চাষ করে জীবনের মোড় ঘুরানোয় সচেষ্ট সেই স্বপ্নচারি ফুল চাষির কথাই শোনা যাক।
জয় গোপাল ঘোষ। কক্সবাজার জেলার সাগর বিধৌত দ্বীপ উপজেলা মহেশখালীর হোয়ানক ইউনিয়নের বড়ছড়া গ্রামের সম্ভ্রান্ত সনাতন পরিবারের কৃষক বাবার সন্তান। নিজ গ্রামের স্কুলে মাধ্যমিক স্তরে পড়ালেখা শেষ করে হাটহাজারি কৃষি প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট থেকে ২০০০ সালে কৃষি বিষয়ে ডিপ্লোমা করেন। কপালে স্বর্ণের হরিণ সরকারি চাকরি না জুটলেও কর্মসংস্থানের জন্য জুটে নিয়েছেন ভিন্ন উপজেলা চকরিয়ার উত্তর হারবাং উচ্চ বিদ্যালয়ে কৃষি শিক্ষকের চাকরি। গত ৮ বছর ধরে আছেন এ বিদ্যালয়ের কৃষি শিক্ষকের পদে। ননএমপিও ভুক্ত এ স্কুলের শিক্ষকতার চাকরির বেতনে দ্রব্যমূল্যের দুষ্ট চক্রের এদেশে সংসার চালানোর দায় দেখে নিজের শিক্ষা জীবনের অর্জিত জ্ঞানের বাস্তবতা প্রয়োগ করে তিনি স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখলেন ফুল চাষ করে। সে চিন্তা ধারাকে মাথায় রেখে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ফুল চাষ করে কি ভাবে আয় রোজগার করা যায় তা ভেবে প্রথমে বর্তমান সময়ের চাহিদা সম্পন্ন জনপ্রিয় জাতের ফুল গ্লাডিওলাস চাষের সিদ্ধান্তকেই বেছে নেন তিনি। তার পর প্রথমে পরীক্ষামূলক ভাবে নিজ কর্মস্থল চকরিয়ার হারবাং এলাকায় স্বল্প পরিমাণ জমিতে চাষ করেন গ্লাডিওলাস। সে ফুল চাষ বিমুখ করেনি আশায় বুকবাঁধা চাষি জয় গোপালকে। আশানুরূপ ফলন আর বিক্রিলব্ধ অর্থ পান তিনি। এবার আরো দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে এ বছর এ ফুল চাষ করেন নিজ উপজেলার নিজ গ্রামের বাড়িতে নিজেরই জমিতে। মহেশখালীর গোরকঘাটা-জনতা বাজার প্রধান সড়কের পাশে দর্শনীয় স্থানে নিজের মাত্র .২০ শতক জমিতে চাষ করেন গ্লাডিওলাস ফুলের চারা। বলাইবাহুল্য যে, মহেশখালীতে গ্লাডিওলাস ফুল চাষ এ দ্বীপ উপজেলায় প্রথম। সঙ্গত কারণে এ নতুন জাতের ফুলের চারা দেখে কেউ বুঝতে বা চিনতেই পারেনি এটি একটি ফুলের চাষ। রাস্তার ধারে সারি সারি তাজাতরু গাঢ় সবুজের চারা দেখে শতশত পথচারির জিজ্ঞাসা এটি কিসের চাষ। চাষি জয় গোপাল দর্শনার্থীদের কৌতূহল বাড়াতে আর দ্বীপের অধিবাসীদের সারপ্রাইজ দিতে কৌতুহল বশত বলে দেন পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পেঁয়াজের চাষ করছি বলে। ধীরে ধীরে মাত্র মাস তিনেকের মধ্যে পুরো বাগান জুড়ে হঠাৎ যখন চোখ ধাঁধানো লাল, নীল, সাদা, হলুদ, গোলাপী ও পিংক কালারের ফুলে ফুলে ভরে গেছে তখন প্রধান সড়কের পাশে এ বাগানের শোভা পথিককে থমকে দাঁড়িয়ে দেয় পথচারি পথিককে। শতশত পথচারি স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রী যাতায়াতের পথে এ বাগানে নেমে ক্ষণিকের জন্য হলেও সুদৃশ্য ফুলের বাগানে নিজের তনু মনকে সতেজ ও সুন্দর করে তুলতে ছবি তুলতে থাকে। এ প্রতিবেদক মহেশখালী দ্বীপে এ ধরনের প্রথম ফুলের বাণিজ্যিক চাষ দেখে তার বিশদ চাষ বিবরণ জানতে কৃষকের ওই বাগানে যান। কাকতালীয় ভাবে এ সময় ওই ফুল বাগানে দেখা হয়ে যায় মহেশখালী উপজেলা কৃষি অধিদপ্তরের দু’জন উপসহকারী কৃষি অফিসার মোঃ কায়ছার উদ্দিন ও মোঃ ইউনুছ আজিম এর সাথে। তারা চাষিকে এ ফুলের পরিচর্যা সম্পর্কে পরামর্শ দেয়াসহ নিয়মিত পরিদর্শন করছেন। এ প্রসঙ্গে কথা হয় কৃষক ও উপসহকারী কৃষি অফিসার মোঃ কায়ছার উদ্দিনের সাথে। চাষি জয় গোপাল বলেন, এখানকার লোকেরা প্রথাগত ভাবে ধান পান ও সব্জি চাষে অভ্যস্ত। কিন্তু বাণিজ্যিক ভাবে ফুল চাষ করেও যে অন্যান্য চাষের দ্বিগুণ আয় করা যায় মুলত এটিই শিখিয়ে মানুষকে ফুল চাষে উদ্বুদ্ধ করতে আমি গ্লাডিওলাস ফুলের চাষ করেছি। এ চাষে কি পরিমাণ খরচ, কি রকম পরিচর্যা করা হয় এবং এতে আয় করে লাভবান হয়েছেন কি না এ প্রশ্নের জবাবে জয় গোপাল বলেন, ২০ শতক জমির এ চাষে বীজ বাবদ খরচ হয়েছে প্রায় ৪২ হাজার টাকা। আর রোপণ পরিচর্যা ও সার কীটনাশক ব্যবহারে খরচ হয়েছে ১৭ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে তার পুঁজি পড়েছে ৬০ হাজার টাকা। চারা রোপণের তিন মাসের মধ্যে ফুল হার্ভেষ্ট করা যায়। মাত্র ১ম ফুল আহরণে তার বিক্রি হয়েছে ২০ হাজার টাকা। ২০ শতকের পুরো বাগানটি চট্টগ্রামের জনৈক ফুলের দোকান মালিক ৮০ হাজার টাকায় ক্রয় করতে ইচ্ছুক। কিন্তু আমি আশা করছি এ থেকে কমপক্ষে ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা বিক্রি মূল্য পাব। তিনি আরো বলেন, ধান পান সব্জি চাষে যতো পরিচর্যা করতে হয়, গ্লাডিওলাস ফুল চাষে তেমন ঝামেলা নেই। শুধুমাত্র রোপণ, সেচ দেয়া আর সার কীটনাশক দেয়া। এ কাজগুলো আমি আমার চাকরির পাশাপাশি নিজে করি এবং আমার ভাই হরি গোপালও আমাকে কাজে সহযোগিতা করে।
গ্লাডিওলাস ফুল চাষে কি রকম পরিচর্যা করতে হয় এবং এ ফুল চাষে লাভের সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে চাইলে, উপসহকারী কৃষি অফিসার মোঃ কায়সার উদ্দিন বলেন, মহেশখালীতে এ ফুলের চাষ এ বারই প্রথম। এটির বাণিজ্যিক চাষ বর্তমান চাহিদার প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত লাভজনক। এটি কম খরচে ও কম পরিচর্যায় খুব সহজেই চাষ যোগ্য। মহেশখালীর আবহাওয়া ও মাটি লবণাক্ত হলেও গ্লাডিওলাস লবণাক্ততা সহিষ্ণু ফসল। এটি বীজ রোপণের ৩ থেকে ৪ মাসের মধ্যে ফুল হার্ভেস্ট করা যায়। এক কোশিতে একবারই ফুল আহরণ করা যায়। এ ফুলের চারায় সাধারণত জাব পোকা, শোষক পোকা ও ছত্রাকের আক্রমণ হয়ে থাকে। এ রোগ বালাই দমনের জন্য সাইফারমেথ্রিন গ্রুপ, ইমিন্ডাক্লোরোফিড, মেনকোজেব ও কার্বনডাজিম গ্রুপের কীটনাশক ব্যবহার করলেই রোগ দমন হয়। তিনি আরো বলেন, মহেশখালীর মাটি ও আবহাওয়া গ্লাডিওলাস ফুল চাষের অত্যন্ত উপযোগী। তিনি কৃষকদের এ ফুল চাষে এগিয়ে আসার আহবান জানিয়ে বলেন, বাণিজ্যিক ভাবে ফুল চাষ করলে মহেশখালী কৃষি অফিস তাদের পরামর্শ ও দেখা শোনায় সার্বক্ষণিক সহযোগিতায় থাকবে।