গ্রামেগঞ্জে যেমন ছিল ভোটের চিত্র

সবুর শুভ, মোরশেদ তালুকদার ও সোহেল মারমা

সোমবার , ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৮ at ৬:১৬ পূর্বাহ্ণ
423

পটিয়া ও বাঁশখালীতে নির্বাচনী সহিংসতায় ২ জনের প্রাণহানির ঘটনা ছাড়া চট্টগ্রামের অন্যান্য উপজেলায় শান্তিপূর্ণভাবে ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। মীরসরাই, সীতাকুণ্ড, হাটহাজারী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, ফটিকছড়ি, বোয়ালখালী, চন্দনাইশ, আনোয়ারা, সাতকানিয়া-লোহাগাড়া উপজেলা সরেজমিনে ঘুরে ভোটার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত একটানা ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি ছিল বেশিরভাগ কেন্দ্রে। ভয়-ভীতি, শঙ্কা উপেক্ষা করে সকাল ৮টার আগেই মীরসরাই, সীতাকুণ্ড, হাটহাজারী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, ফটিকছড়ি, বোয়ালখালী, চন্দনাইশ, আনোয়ারা, সাতকানিয়া-লোহাগাড়া উপজেলায় ভোটকেন্দ্রে দলে দলে ছুটে গেছেন ভোটাররা। কেন্দ্রের গেট খোলার আগেই ভোট দিতে হাজির হন তারা। এছাড়া লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় ছিলেন অনেকে। কেউ কেউ পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পেরে হাসিমুখে ফিরছিলেন ঘরে। এদিকে পটিয়া ও বাঁশখালীতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে ২ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনায় আহত হয়েছেন অনেকে। গতকাল বাঁশখালী উপজেলার কাথারিয়া ইউনিয়নের বরইতলির প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে দুই পক্ষের সংঘর্ষে আহমেদ কবির (৪৫) নামে একজন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন। ভোরে স্থানীয় দুই গ্রুপের মধ্যে এই ঘটনা ঘটে। নিহত কবির কাথারিয়া ইউনিয়নের ৮ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা। পটিয়ায় ভোটকেন্দ্র দখলকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষে আবু সাদেক (১৮) নামে একজন নিহত ও দুজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। গতকাল বেলা ১১টার দিকে জিরি ইউনিয়নের দক্ষিণ মালিয়ারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে।
পটিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার জসিম উদ্দিন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। নিহত আবু সাদেক দক্ষিণ মালিয়ারা এলাকার আবুল কাশেম মেম্বারের ছেলে। আহতরা হলেন মো. মুন্না (২৮) ও মো. ইলিয়াস (৪০)।
পটিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার জসিম উদ্দিন বলেন, ভোটকেন্দ্র দখলকে কেন্দ্র করে ধানের শীষ ও নৌকার প্রার্থীরা সংঘর্ষে জড়ান। দুই পক্ষের সংঘর্ষের মাঝে পড়ে আবু সাদেক নিহত হন। খবর পেয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ওই কেন্দ্রে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। এই ঘটনায় এক ঘণ্টার মতো ভোট গ্রহণ বন্ধ ছিল। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর দুপুর ১২টার দিকে ফের ভোট গ্রহণ শুরু হয়।
গতকাল সকাল থেকে আনোয়ারা, পটিয়া, মীরসরাই, সীতাকুণ্ড, বোয়ালখালী, রাউজান, হাটহাজারীসহ বিভিন্ন সংসদীয় এলাকার ভোটকেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, কেন্দ্রগুলোর সামনে ভোটারদের উপচে পড়া ভিড়। অনেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য।
সকাল সাড়ে সাতটায় চট্টগ্রাম-১২ পটিয়া আসনের রাহাত আলী হাই স্কুল কেন্দ্রে দীর্ঘ লাইন ভোটারদের। চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা) আসনের এ জে চৌধুরী কলেজ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায় শত শত ভোটারের লাইন। শোভনদন্ডী স্কুল কেন্দ্রের ভোটার সাইফুল ইসলাম জানান, সবার আগে ভোট দিতে সকাল সকাল কেন্দ্রে এসেছি।
সকাল সাড়ে ৮টায় পটিয়ার আসনের আল্লাই ওখারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, কেন্দ্রের ভেতরে বাইরে ভোটাররা ভিড় করছেন। ভোট দিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন মফিজুর রহমান। তিনি জানান, কোনো ঝামেলা ছাড়া ভোট দিতে পেরেছি। তবে একই আসনের লড়িহরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে ভোটারদের তেমন উপস্থিতি চোখে পড়েনি। এই আসনের বিএনপির প্রার্থী এনামুল হক এনাম অভিযোগ করেন তার এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়েছে। নানাভাবে ভয় দেখানো হচ্ছে ভোটারদের।
এদিকে বিক্ষিপ্ত কিছু ঘটনা ছাড়া চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনে শান্তি পূর্ণ পরিস্থিতিতে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে বিএনপির প্রার্থীরা ভোট চুরি, জাল ভোট, এজেন্টদের ভোটকেন্দ্রে ঢুকতে না দেওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগ করেছেন।
দক্ষিণ চট্টগ্রামের পটিয়া, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া উপজেলার বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করে দেখা গেছে, পটিয়া এবং লোহাগাড়ার দুয়েকটি কেন্দ্র ছাড়া অন্য কোথাও বড় ধরনের অপ্রীতিকর কোনো ঘটনা ঘটেনি। পটিয়ায় একটি কেন্দ্রে দুই পক্ষের সংঘর্ষে একজন নিহত হয়েছেন। লোহাগাড়ার একটি কেন্দ্রে হামলা করেছে দুর্বৃত্তরা। তবে, হামলার জন্য পুলিশ প্রশাসন ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা দায়ী করেছেন বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীকে।
এছাড়া অন্যান্য ভোটকেন্দ্রে বড় ধরনের বিশৃঙ্খল কিছু ঘটেনি। সকালের দিকে বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। আবার কোনো কোনো ভোটকেন্দ্রে ভোটার ছিল হাতেগোনা। তবে এসব ভোটকেন্দ্রে সক্রিয় দেখা গেছে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর সমর্থকদের। কয়েক জায়গায় বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ করেছেন বিএনপি সমর্থকরা। এছাড়া বেশিরভাগ ভোটকেন্দ্রে ২০ দলীয় জোটের প্রার্থীর এজেন্টদের দেখা যায়নি।
সকাল ৯টায় পটিয়া লড়িহারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে, ভোট দেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছেন ভোটাররা। তবে ভোটারের সংখ্যা ছিল কম। এসময় ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হন বিএনপির প্রার্থী এনামুল হক এনাম। তিনি অভিযোগ করেন, আমার এজেন্টদের বের করে দিয়েছে। পটিয়ার বিভিন্ন কেন্দ্রে রাতেই নৌকার প্রার্থীর লোকজন ভোট দিয়ে ফেলেছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
এজেন্ট বের করে দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কেন্দ্রটির প্রিজাইডিং অফিসার শরফরাজ খান বলেন, রাস্তা থেকে আসতে দেয়নি। ওটা তো কেন্দ্রের বাইরে। কেন্দ্রটির মোট ভোটার সংখ্যা দুই হাজার ৬৭ উল্লেখ করে তিনি বলেন, সকাল থেকে শান্তিপূর্ণভাবে ভোট গ্রহণ চলছে। ৯টা পর্যন্ত ৫০ শতাংশ কাস্ট হয়েছে।
সকাল সাড়ে ৯টায় পটিয়ার মোহছেনা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দেখা গেছে, ভোটারদের দীর্ঘ লাইন। মহিলা ভোটারদের উপস্থিতি ছিল সবচেয়ে বেশি। সেলিম নামে এক ভোটার জানান, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট গ্রহণ চলছে।
সকাল ১০টা ১১ মিনিটে চন্দনাইশের হাশিমপুর মকবুলিয়া ডিগ্রি মাদ্রাসায় দেখা গেছে, ভোট গ্রহণের বুথের সামনে ভোটারদের জটলা। এসময় গণমাধ্যমকর্মীদের দেখে ‘লাইনে দাঁড়াও’ বলতে শোনা যায় স্থানীয় ছাত্রলীগ, যুবলীগ কর্মীদের। কেন্দ্রটির প্রিজাইডিং অফিসার বিঞ্চু চক্রবর্তী বলেন, কেন্দ্রের মোট ভোটার চার হাজার ৭১টি। এর মধ্যে এক হাজার ৬০০ কাস্ট হয়েছে।
সকাল ১০টা ৩৯ মিনিটে দোহাজারী জামিজুরি আহমুদুর রহমান উচ্চ বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রে দেখা গেছে, সাংবাদিক দেখে লাইন ধরছেন কেন্দ্রটির মাঠে থাকা লোকজন। এর কিছুক্ষণ পর ওই কেন্দ্রে উপস্থিত হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী নজরুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি দৈনিক আজাদীর ফটো সাংবাদিককে বলেন, চারশ গজের মধ্যে ছবি তুলবেন না। এসময় তার সঙ্গে থাকা কর্মীদেরও নির্দেশ দেন, ওরা যেন ছবি তুলতে না পারে। এরপর কয়েকজন কর্মী এসেও ছবি তুলতে বারণ করেন।
কেন্দ্রটির প্রিজাইডিং অফিসার কুন্তল বড়ুয়া বলেন, কেন্দ্রের মোট ভোটার সংখ্যা দুই হাজার ৯২১। কাস্ট হয়েছে ১৮০০।
সাড়ে ১১টায় সাতকানিয়া মাদারবাড়ি সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে দেখা গেছে মহিলাদের দীর্ঘ লাইন। তবে তাদের অভিযোগ ছিল, ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকলেও ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না।
মর্তুজা আকতার নামে এক ভোটার জানান, গত দুই ঘণ্টা ধরে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি। লাইনের অগ্রগতি নেই। ধানের শীষের প্রার্থীর সমর্থক জাকির বলেন, আমাদের এজেন্টদের বের করে দিয়েছে।
কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার তরিত কুমার ভট্টাচার্য বলেন, দুই হাজার ৪৩৪ জন ভোটার আছেন। ইতোমধ্যে ৭০ শতাংশ কাস্ট হয়েছে।
দুপুর ১২টা ৫ মিনিটে ছদাহা কে কে উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে দেখা গেছে, মহিলা বুথের সামনে কোনো ভোটার নেই। পুরুষ বুথের সামনে ছিল ২ জন। এসময় একটি কক্ষে দুই যুবককে ব্যালট পেপারে সিল মারতে দেখা গেছে। কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার রেজাউল হক সরকার বলেন, শান্তিপূর্ণভাবে ভোট গ্রহণ চলছে।
দুপুরে উত্তর পদুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে দেখা গেছে ভোটারশূন্য। স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাড়ে ১২টার দিকে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে ২০ দলীয় জোটের প্রার্থীর ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার ধীরেন্দ্র দেব নাথ বলেন, সকালে সুন্দর ভোট গ্রহণ ছিল। সামান্য বাদানুবাদ হয়েছে এজেন্টদের মধ্যে।
ছাত্রলীগ নেতা তাজউদ্দিন দৈনিক আজাদীকে বলেন, শান্তিপূর্ণ ভোট গ্রহণ চলছিল। জামায়াত-শিবিরের ক্যাডাররা প্রতিবন্ধকতা তৈরির চেষ্টা করে।
কেন্দ্রে হামলা
দুপুর ১২টা ৫৩ মিনিটে পদুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে, পুলিশ ও বিজিবির সদস্যরা কেন্দ্রের বাইরে অবস্থান করছেন। এসময় রাস্তায় ৬/৭টি গুলির খোসা পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
সাতকানিয়া সার্কেলের এডিসি হাসানুজ্জামান মোল্লা দৈনিক আজাদীকে বলেন, ১১টার দিকে হাজার দুয়েক বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মী কেন্দ্রে আক্রমণ করে। আগুন দেওয়ার চেষ্টা করে। ব্যালট বাঙ ছিনতাইয়ের চেষ্টা করে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে এসে আমরা নিয়ন্ত্রণ করি।
দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামরুন নাহার আজাদীকে বলেন, অতর্কিত হামলা করে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নষ্ট করতে চেয়েছে জামায়াত-শিবির। হামলায় নৌকার কর্মী পারভেজ, জহিরুল ইসলাম, মোস্তাফিজুর, তারেকুল ইসলাম আহত হয়েছেন।
আহত জহির বলেন, জাল ভোট দেওয়ার চেষ্টাকালে বাধা দিই। এরপর তারা আক্রমণ করে। এসময় জহিরের মাথা থেকে রক্ত পড়তে দেখা গেছে। এছাড়া ওই ভোটকেন্দ্রের মাঠে অগণিত ইটের টুকরো পড়ে থাকতে দেখা গেছে। ভোট কেন্দ্রের কক্ষেও ভাঙচুরের চিহ্ন ছিল। এসময় কেন্দ্রটির প্রিজাইডিং অফিসার কথা বলতে চাননি।
এদিকে গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পটিয়ার পশ্চিম মালিয়ারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে বিএনপি-আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে আবু ছাদেক (১৬) নামে একজন মারা যান।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (দক্ষিণ) আফরুজুর হক টুটুল গণমাধ্যমকে বলেন, কেন্দ্র দখলের চেষ্টায় নৌকা ও ধানের শীষের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় আবু ছাদেক নিহত হন। ঘটনার পরপরই পশ্চিম মালিয়ারা পাড়া কেন্দ্রটিতে ভোট গ্রহণ স্থগিত করা হয়।
পটিয়া আসনের সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও পটিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাবিবুল হাসান জানান, কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে।
পটিয়া থানার ওসি নেয়ামত উল্লাহ জানান, শান্তিপূর্ণভাবে পটিয়ায় ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। তবে দুয়েকটি কেন্দ্রে দুষ্কৃতকারীরা কেন্দ্র দখলের চেষ্টা চালালে প্রিজাইডিং অফিসারের নির্দেশে সরকারি সম্পদ রক্ষার জন্য পুলিশ ফাঁকা গুলি ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। শনিবার রাতে বিএনপি-জামায়াতের হামলায় নিহত যুবলীগ কর্মী হত্যায় পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো এজাহার না দেওয়ায় মামলা হয়নি বলে জানান তিনি।
পটিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আ ক ম সামশুজ্জামান চৌধুরী বলেছেন, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্য দিয়ে পটিয়ায় ভোট হয়েছে। বিএনপি-জামায়াতের ক্যাডাররা গোলযোগ সৃষ্টি করতে চাইলেও পারেনি।
এদিকে ভোট শেষ হওয়ার এক ঘণ্টা দলীয় কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনেছেন বিএনপি প্রার্থী এনামুল হক এনাম। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ভোটের আগের রাত থেকে ভোট চলাকালীন কেন্দ্র দখলে রাখে। কেন্দ্রে কেন্দ্রে গিয়ে ভোটের দিন রাতে নৌকার পক্ষে সিল মারে। সকাল থেকে বিএনপির কোনো এজেন্টকে কেন্দ্রে ঢুকতে দেয়নি। এছাড়া কয়েকটি কেন্দ্রে গুলিতে প্রায় ১২ জন গুলিবিদ্ধ বলে জানালেও তাদের নাম দিতে পারেননি।
আনোয়ারা ও কর্ণফুলীতে নির্বাচনের পরিবেশ ছিল নিরুত্তাপ। দুই নির্বাচনী এলাকায় ভোট রেকর্ডে অস্বাভাবিকতা, প্রার্থীর এজেন্ট বের করে দেওয়ার অভিযোগ, কেন্দ্রে কেন্দ্রে এজেন্টহীনতা ও নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর সমর্থকদের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের। এর মধ্যে আনোয়ারা আসনে বিএনপি প্রার্থী নিজের কেন্দ্রে ভোট দিতে যাননি বলেও জানা গেছে।
গতকাল চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনের চাঁদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে পৌঁছাতেই কয়েকজন ভোটার স্কুলের সামনে ঘিরে ধরেন সাংবাদিকদের। তাদের অভিযোগ, তারা কেন্দ্রে ভোট দিতে যেতে চাইলে কেন্দ্রের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নৌকা প্রতীকের সমর্থকরা তাদের বাধা দিচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়।
কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, পুরুষ বুথের সামনে তিন-চারজন মানুষ দাঁড়ানো। মহিলা বুথের লাইনে কোনো ভোটার নেই। এসময় কেন্দ্রের বাইরে অবস্থান করছেন প্রিজাইডিং অফিসার তুষার কান্তি ভারতী। তিনি বলেন, শীতের কারণে কোনো মহিলা ভোট দিতে আসেননি। তাই লাইন ফাঁকা। এমনকি পুরুষ ভোটারের সংখ্যাও কম। তবে কেন্দ্রের ভেতরে ব্যালেট পেপারের কয়েকটা খালি মুন্ডা (অবশিষ্ট অংশ) দেখার পর জানতে চাইলে তিনি জানান, সকাল নয়টা পর্যন্ত ৭৫০ ভোট কাস্ট হয়েছে। সকাল বেলা ভোটারের উপস্থিতি না থাকার পরও এক ঘণ্টার মধ্যে ৭৫০ ভোট সংগ্রহ হয়েছে এ কেন্দ্রে? এর কোন উত্তর ছিল না তাঁর কাছে। এ কেন্দ্রে ভোটার সংখ্যা তিন হাজার ২০২ জন। কেন্দ্রে নৌকা ছাড়া অন্য কোনো প্রতীকের এজেন্ট খুঁজে পাওয়া যায়নি। যদিও এ আসনে ধানের শীষ প্রতীক লড়েছেন বিএনপির জাফরুল ইসলাম চৌধুরী। জাতীয় পার্টির লাঙল প্রতীকে নির্বাচন করছেন মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী এবং আপেল নিয়ে লড়ছেন জামায়াতের জহিরুল ইসলাম।
মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী অভিযোগ করেন, বাঁশখালীতে ৪০টি কেন্দ্রে রাতেই ভোট কেটে নিয়েছে নৌকার লোকেরা। দিনের বেলা বাকি কাজ সম্পন্ন করেছে। এর মধ্যে দিনের বেলা কেন্দ্র থেকে আমার এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়েছে।
বানীগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সাড়ে ১০টায় গিয়ে দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। কেন্দ্রের ১৭৮৩ ভোটের মধ্যে তখন পর্যন্ত প্রায় ৩০০ ভোট সংগ্রহ হয়েছে। এ কেন্দ্রে নৌকা, ধানের শীষ, লাঙল ও আপেল প্রতীকের এজেন্ট দেখতে পাওয়া যায়। সব প্রতীকের প্রার্থীরাই বলেন, এই কেন্দ্রে সুষ্ঠু ভোট হচ্ছে। প্রিজাইডিং অফিসার জসিম উদ্দিন বলেন, এ কেন্দ্রে সকাল থেকে সুষ্ঠ ভোট চলছে। কোনো দলের লোকজন প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেনি।
একইভাবে দীর্ঘ লাইনে ভোট দিতে দেখা গেছে বাঁশখালীর দক্ষিণ সাধনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কাতারিয়া বরইতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে। বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতের শক্তিশালী প্রার্থী থাকার কারণে বাঁশখালীর বহু কেন্দ্রে সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে বলে মনে করেন ভোটাররা।
বাঁশখালীতে ছোটখাট বিছিন্ন ঘটনা ছাড়া ভোট প্রদান স্বাভাবিক থাকলেও পুইছড়ি মকসছুদা খাতুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে সকালের দিকে প্রায় ঘণ্টা দেড়েক সময় ভোট গ্রহণ বন্ধ থাকলেও পরবর্তীতে আবারো স্বাভাবিকভাবে ভোট গ্রহণ চলে।
বাঁশখালীর সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা মোমেনা আক্তার বলেন, নির্বাচনের স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করেছে। কোথাও অভিযোগ পাওয়া গেলে সেখানে সাথে সাথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রেরণ করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা হয়েছে।
বাঁশখালী প্রতিনিধি কল্যাণ বড়ুয়া মুক্তা জানান, বাঁশখালীতে নির্বাচনের পরিবেশ ও সামগ্রিক প্রশাসনিক অবস্থা দেখতে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল মান্নান কয়েকটি কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। এসময় তিনি জানান, প্রধান সড়কের দুই পাশের কেন্দ্রগুলো দেখেছি। কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাইনি। প্রতিটি কেন্দ্রে জনগণ উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট প্রদান করছে।
এদিকে আনোয়ারা ও কর্ণফুলীর বিভিন্ন কেন্দ্র পরিদর্শনে দেখা গেছে, সার্বিক পরিবেশ শান্ত। তবে ভোটার সংখ্যা ছিল তুলনামূলক কম। সকালের দিকে থাকলেও দুপুরের পর তা অনেক কমে যায়। তবে কেন্দ্রে কেন্দ্রে ছিল নৌকার সমর্থকদের পদচারণা। অনেককে নৌকা প্রতীকের ব্যাজ লাগানো অবস্থাও দেখা গেছে। এসময় বিএনপির কোনো নেতাকর্মীকে কেন্দ্রে দেখা যায়নি। এখানকার ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ১০ হাজার ৪০৬ জন।
আনোয়ারা প্রতিনিধি এম নুরুল ইসলাম জানান, বিএনপি প্রার্থী সরওয়ার জামাল নিজাম তৈলারদ্বীপ বারখাইন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোট দেওয়ার কথা থাকলেও ভোট দিতে যাননি। এখানে নৌকা প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ। এ আসনের বিভিন্ন কেন্দ্রে অবশ্য ইসলামী ফ্রন্ট ও ইসলামিক ফ্রন্টের প্রার্থীর এজেন্টদের দেখা গেছে।
কোনো ধরনের সংঘাত ছাড়াই নজিরবিহীন ভোট হয়েছে হাটহাজারী, ফটিকছড়ি, রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া আসনে। চট্টগ্রাম-৫ হাটহাজারী আসনের ১২ নং চিকনদন্ডী ইউনিয়নের ভোটার শিব শংকর। তিনি বলেন, এখনো ভোট দিইনি। তিনি জানান, বিভিন্ন নির্বাচনের সময় এই ইউনিয়নে কখনো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হয়নি। ওই কেন্দ্রে আধিপত্য ছিল লাঙলের। এদিকে দক্ষিণ মাদার্শা ইউনিয়নের একটি কেন্দ্র আকবরিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজে সাধারণ ভোটারদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। লাইনে দাঁড়িয়ে অনেককেই অপেক্ষা করতে দেখা যায়। কেন্দ্রের অদূরে মোমবাতি মার্কা নিয়ে নির্বাচন করা ইসলামী ফ্রন্টের মুহাম্মদ নঈমুল ইসলামেরও একটি নির্বাচনী ক্যাম্প ছাড়া অন্য কোনো প্রার্থীর লোকজনের জমায়েত ছিল না।
এ আসনে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মোহাম্মদ ইবরাহিম ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেন। মহাজোট থেকে ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ লাঙল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেন।
ইছাপুর বাজার সংলগ্ন রহিমপুর ওয়ার্ডের জান আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সকাল ৮টা থেকে ভোট কেন্দ্রে উপস্থিত হওয়ার পর দীর্ঘসময় থেকেও ভোট দিতে পারেনি বহু ভোটার। অনেক কেন্দ্রে ঐক্যফ্রন্টের এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ আছে।

x