গ্যাস বিস্ফোরণ জনিত দুর্ঘটনা এড়াতে দায়িত্বশীল ভূমিকা চাই

মঙ্গলবার , ১৯ নভেম্বর, ২০১৯ at ৩:৪৪ পূর্বাহ্ণ
20

নগরীর পাথরঘাটা এলাকায় গ্যাস বিস্ফোরণে সাতজনের নিহত হওয়ার ঘটনায় আমরা মর্মাহত। গত রোববার সকালে পাথরঘাটার বড়ুয়া ভবনের সামনে এ ঘটনা ঘটে। গ্যাস বিস্ফোরণে হতাহতের যে কোনো ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক ও মর্মান্তিক। কেননা গ্যাস দুর্ঘটনায় দগ্ধ হওয়া অধিকাংশের অবস্থা আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছতে পারে। এক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকিও বেশি। কেন এবং কীভাবে বিস্ফোরণ ঘটেছে, এ বিষয়ে তদন্ত চলছে। তবে তার দায় নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে পত্র-পত্রিকায়। দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ দুর্ঘটনার পর পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ। তবে বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞগণ বলছেন, ‘গ্যাস লিকেজের কারণেই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। এটা ধারণা করার কিছু নেই, এ বিষয়ে আমরা পুরোপুরি নিশ্চিত।’ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিদর্শক তোফাজ্জল হোসেন বলেন, ভবনের রাইজার ও পাইপ লাইন খুব পুরনো। পাইপ লাইন রবার দিয়ে মোড়ানোর কথা ছিল। যেহেতু পাইপ লাইন রবার দিয়ে মোড়ানো ছিল না, আমরা ধারণা করছি, পাইপ লাইনের কোনো ফুটো দিয়ে গ্যাসটা বের হয়েছে। যেহেতু পাশে দেয়াল ছিল তাই গ্যাস রুমের মধ্যে প্রবাহিত হয়েছে। তিনি বলেন, প্রবাহিত গ্যাস ঘরের ইলেকট্রনিক্স সুইচ বোর্ডেও প্রবেশ করতে পারে এবং সেখানে স্পার্কিংয়ের মাধ্যমে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। আমরা জানতে পেরেছি, আহত একজন ঘরে দেয়াশলাই জ্বালিয়েছে। এতে আগুনের উৎস পেয়ে বিস্ফোরণ ঘটেছে।
গ্যাস থেকে বিস্ফোরণ হলে আগুনের মাত্রা ভয়াবহ হত বলে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) কর্মকর্তাদের বক্তব্য তুলে ধরলে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের কর্মকর্তা তোফাজ্জল বলেন, আমাদের কাছে ছবি আছে। যে গ্যাস লাইনে বিস্ফোরণ হয়েছে, সেটা ব্যবহার করতে করতে খুব পুরাতন ও সূক্ষ্ম হয়ে গেছে। আর গ্যাসের সাথে আগুনের স্পর্শ হলে আগুনের ঝলক হয়। এতে আগুন লাগার কোনো সুযোগ নেই। কারণ গ্যাসের তীব্রতা দ্রুত শেষ হয়ে যায়। তবে গ্যাস চুলা থেকে না কি লাইন থেকে ছড়িয়েছে, সে বিষয়টি প্রথমে শনাক্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। এর আগে দুপুরে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড মহাব্যবস্থাপক (বিপণন) আ ন ম সালেক ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ফায়ার সার্ভিসের বক্তব্যের বিরোধিতা করে বলেন, গ্যাস লাইনের ত্রুটি থেকে কোনো বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেনি। তিনি বলেন, গ্যাস লাইনের ত্রুটি থেকে কোনো বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটলে চুলা অক্ষত থাকতে পারে না। এখানে চুলা ছিল অক্ষত। এছাড়াও ওই বাসায় শুকাতে দেওয়া কাপড় চোপড়েও আগুন লাগেনি। গ্যাস লাইনের রাইজার অক্ষত পাওয়া গেছে। এদিকে চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের উপপরিচালক জসিমউদ্দিন বলেন, বড়ুয়া বিল্ডিংয়ের নিচতলায় সীমানা প্রাচীরের পাশেই ওই বাড়ির গ্যাস রাইজার। বিস্ফোরণটি নিচতলাতেই হয়েছে। হয়ত রাইজারে কোনো সমস্যা ছিল, হয়ত লিকেজ থেকে গ্যাস বের হয়ে জমে গিয়েছিল। সকালে বাসায় কেউ আগুন ধরালে তাতে বিস্ফোরণ ঘটে থাকতে পারে। গ্যাস লাইন পুরোনো ছিল। এই দুর্ঘটনায় গ্যাস লাইনের লিকেজ, রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া কিংবা নাশকতামূলক কোন কর্মকাণ্ডের উপস্থিতি আছে কি না, তা তদন্ত করা হচ্ছে।
এ ব্যাপারে যথাযথ তদন্তের পর সুস্পষ্ট বক্তব্য দেওয়া সম্ভব হলেও সংশ্লিষ্ট গ্যাস কতৃর্পক্ষ এ দুঘর্টনার দায় এড়াতে পারে না। বিশেষজ্ঞদের অভিমত হলো, কারিগরি ত্রুটি, অসচেতনতা ও অসতর্কতার ফলে দেশে এ ধরনের গ্যাস দুর্ঘটনা ঘটছে এবং দিন দিন তা বেড়েই চলেছে, যা রীতিমতো উদ্বেগের বিষয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ সমস্যা সমাধানের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে মনে হয় না। দেশে গ্যাস দুর্ঘটনা বা অগ্নিকাণ্ডের খবর পেলে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সেখানে ছুটে যান। উদ্ধারের চেষ্টা চালান। কিন্তু একটি কথা সবারই জানা আছে, প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম। দেশে এ ধরনের দুর্ঘটনা যেন না ঘটে, সে বিষয়ে যথাযথ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া দরকার বলে।
বিস্ফোরণে দায় যার, তার এবং সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা দরকার। পাশাপাশি গ্রাহক ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে গ্যাস ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা ও সচেতনতার পরিচয় দিতে হবে। গ্যাস বিস্ফোরণজনিত দুর্ঘটনা এড়াতে সংশ্লিষ্ট সকলের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন জরুরি।

x