গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি : জনজীবনে বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা

মঙ্গলবার , ২ জুলাই, ২০১৯ at ৫:৫৮ পূর্বাহ্ণ
36

সমাজের বিভিন্ন অংশের আপত্তির মধ্যেই সরকার সব পর্যায়ে গ্যাসের দাম গড়ে ৩২.৮ শতাংশ বাড়িয়েছে, যা জুলাইয়ের প্রথম দিন থেকেই কার্যকর শুরু হয়েছে। আজাদীতে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, আবাসিক গ্রাহকদের ১৭৫ টাকা বেড়ে এক চুলার জন্য মাসে ৯২৫ টাকা এবং দুই চুলার জন্য ৯৭৫ টাকা দিতে হবে, যা এতদিন ছিল ৭৫০ টাকা ও ৮০০ টাকা। এছাড়া গৃহস্থালিতে মিটারে যারা গ্যাসের বিল দেন তাদের প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের ব্যবহারের জন্য সাড়ে তিন টাকা বাড়িয়ে ১২ টাকা ৬০ পয়সা করে দিতে হবে, যা এতদিন ছিল ৯ টাকা ১০ পয়সা। অর্থাৎ রান্নার গ্যাসের জন্য চুলাভিত্তিক গ্রাহকদের প্রতি মাসে ২৩ শতাংশ এবং মিটারভিত্তিক গ্রাহকদের ৩৮ শতাংশ বেশি অর্থ খরচ হবে। পাশাপাশি যানবাহনে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাসের (সিএনজি) দাম প্রতি ঘনমিটারে ৩৮ টাকা থেকে ৫ টাকা বাড়িয়ে ৪৩ টাকা দিতে হবে। ফলে গাড়ির গ্যাসের জন্য মালিকদের খরচ বাড়বে সাড়ে ৭ শতাংশ। স্বাভাবিকভাবেই গণপরিবহনে এর প্রভাব পড়বে এবং এর মাসুল যাত্রীদেরই দিতে হবে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার, শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে ৩৫ থেকে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত। ফলে শিল্পোৎপাদনে খরচ বাড়বে। আর ব্যবসায়ীরা দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে দিয়ে ক্রেতাদের কাছ থেকেই তা আদায় করবেন।
এলএনজি আমদানির কারণে ব্যয় বৃদ্ধির অজুহাতে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির ফলে সাধারণ ভোক্তারা চাপে পড়বেন বলে মনে করছেন বিশিষ্টজনরা। তাঁরা বলছেন, গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির ফলে দরিদ্র জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। ব্যয় বাড়বে ভোক্তাদের। শিল্পের উৎপাদন খরচ বাড়বে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন ভোক্তারাই। কনজ্যুমার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এর পক্ষ থেকে বলা হয়, গ্যাসের দাম বাড়ানোর বিষয়টি অযৌক্তিক। গ্যাস বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবের ওপর বিইআরসি গণশুনানি করেছিল। আমরা গণশুনানিতে বলেছিলাম- দুর্নীতি, অনিয়ম ও অপচয় বন্ধ করা গেলে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন পড়বে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাসের দাম বাড়ানো অবশ্যই জনজীবনে বিরূপ প্রভাব পড়বে। যারা সীমিত আয়ের লোক তাদের ওপর এর প্রভাব বেশি পড়বে। কারণ ১০০ টাকা বৃদ্ধিও কিন্তু কম নয়। এক্ষেত্রে সরকার বিকল্প কিছু পদক্ষেপ নিতে পারতো। বিশেষ করে গ্যাস ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত ছিল। কিন্তু গ্যাস ব্যবহারে তেমন কোনো গাইডলাইন নেই। আমরা শুধু ব্যবহারই করে যাচ্ছি।
আসলে মধ্যবিত্তদের মাসিক আয় তো খুব সীমিত। এই সীমিত আয় তাদের হিসেব করে খরচ করতে হয়। এমতাবস্থায় অনাকাঙ্ক্ষিত গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির ফলে আর্থিকভাবে তাদের অনেকটাই বিপদে ফেলে দেবে। আর গ্যাসের এই উচ্চমূল্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করেন।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অর্থনীতি বেশ এগিয়ে গেছে। মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি (জিডিপি) কয়েক বছর ধরে ৬ শতাংশের ওপরে রয়েছে। চলতি অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। মূল্যস্ফীতিও বেশ নিয়ন্ত্রণে। তবে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কিছুটা ধীরগতি রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে গ্যাসের দাম বাড়ানোর ফলে ব্যবসা পরিচালন ব্যয়, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে। ফলে বেড়ে যাবে পণ্যের মূল্য। ফলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে। সেইসঙ্গে বিনিয়োগ ও শিল্প উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। ফলে জিডিপির প্রবৃদ্ধিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ভোগান্তিতে পড়বে সাধারণ মানুষ। কারণ আমরা সবসময় দেখি গ্যাসের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হুট করে সব কিছুর দাম বেড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ানো হয়। বাড়ি ভাড়ার ক্ষেত্রেও এমনটি হয়। তাঁরা বলেন, বর্তমানে রফতানিতে একটি বিরূপ প্রভাব রয়েছে। চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছে রফতানি আয়। গ্যাসের দাম বাড়ানোর ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে। যদি বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে দর কষাকষি করে মূল্য বাড়াতে না পারে তাহলে রফতানি লক্ষ্যমাত্রা বাধাগ্রস্ত হবে। মোট কথা, এ মুহূর্তে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলবে।

x