গোধূলির আলো

সাধারণ রূপে অসাধারণ এক উপস্থাপন

পাভেল আল মামুন

মঙ্গলবার , ৬ আগস্ট, ২০১৯ at ১১:৪৭ পূর্বাহ্ণ
63

গোধূলির আলো, একাডেমী অব পারফর্মিং আর্টস এর এই নাটকটি প্রথম মঞ্চে এসেছে ২০০৮ সালে। এক যুগে মঞ্চায়িত হয়েছে কুড়িবার। সর্বশেষ ২ আগস্ট। ২০১৯ শুক্রবার, চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমীর মঞ্চে। বারো বছরে প্রদর্শনীর সংখ্যা খুব বেশি না হলেও সংখ্যাটি এটুকু জানান দেয় যে এক দীর্ঘ সময় নাটকটির কলাকুশলীরা এর সাথে আছেন। অন্য শিল্প মাধ্যম এর তুলনায় থিয়েটারে একটি বিশেষ সুযোগ রয়েছে- তা হলো প্রতিনিয়ত সংযোজন আর বিয়োজনের। প্রতিটি প্রদর্শনিতেই নির্দেশকবৃন্দ এই কাজটি করে থাকেন। সে অর্থে গোধূলির আলো’র কুড়িতম মঞ্চায়নটি দর্শকের সামনে যা উপস্থাপন করেছে তা দীর্ঘ নিরীক্ষার এক প্রাপ্তি আর এই নিরীক্ষাটি মোটেই ম্যাজিক্যাল থিয়েটার বা চমক আশ্রয়ী নয়। বরং ছোট ছোট নরম অনুভূতিকে এক সরল সুতোয় বেঁধে খুব সাধারণ ভঙ্গিতে চিরন্তন মানবিক সম্পর্ক আর চাওয়াকে দৃশ্যায়িত করা হয়েছে। যা সামগ্রীকতায় হয়ে উঠেছে সরল সহজ আর সাধারণ রূপে অসাধারণ।
রাশিয়ান নাট্যকার আলেক্সেই আবুঝভ এর নাটক রামোদোনাইয়া কোমেদীয়া এর ইংরেজি অনুবাদ অহ ঙষফ ডড়ৎষফ ঈড়সবফু থেকে পুরানো পালা নামে বাংলা অনুবাদ করেন আনিসুজ্জামান। স্থান কাল আর পাত্র বিবেচনায় গোধূলির আলো নামে বর্তমান পাণ্ডুলিপি নির্মাণ, সম্পাদনা ও নাটকটির নির্দেশনা দিয়েছেন মুনির হেলাল। সাগর পাড়ের ছোট এক শহরকে ঘিরে এর গল্প। শহরের একপ্রান্তে, সমুদ্র সংলগ্ন হাসপাতাল। এ হাসপাতাল এর এক ডাক্তার আর রোগীর জীবন আর সরল মনস্তত্ত্ব এই নাটকের মূল উপজীব্য। মধ্যবয়সী পুরুষ ডাক্তার এবং কাছাকাছি বয়সের একজন নারী রোগী যিনি ভর্তি হয়েছেন তার মানসিক ভারসাম্যহীনতার চিকিৎসার জন্য, বেশ ক্থদিন ধরেই রয়েছেন এখানে। প্রচলিত নিয়মের বিরুদ্ধ স্বভাবের এই রোগী নিয়ে ডাক্তার নার্স সবাই বেশ বিরক্ত। এ-নিয়েই ডাক্তার আর রোগীর আলাপ এর শুরু- এবং নাটকেরও পথচলার শুরু। এই আলাপের সূত্র ধরে এগিয়ে চলে গল্প। এবং ক্রমেই তাদের কথোপকথনের মাধ্যমে মূর্ত হতে থাকে তাদের ব্যাক্তি জীবন, তাদের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, উঠে আসে বাঙালির ভাষার লড়াই, মুক্তিযুদ্ধে সন্তান হারানো মায়ের বেদনা এবং হানাদার পাক বাহিনীর নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার ডাক্তারের স্ত্রীর কথা । গল্প ক্রমেই এগিয়ে যায় এই দুই মানব-মানবীর জীবন-জীবিকা, ভালোলাগা-মন্দলাগা, এসবকে ঘিরে। গড়ে ওঠে নিবিড়তা, নির্ভরতা। মধ্য গগনে বিরাজমান তাঁদের জীবন। সুখ-দুঃখ-আনন্দ-বেদনার স্মৃতির দোলায় ভাসতে থাকা দুটি মানুষ। কথা বলতে বলতে এবং শুনতে শুনতে কখন যে একে অন্যের জীবনের ভেতরে ঢুকে যায় তারা নিজেরাও বুঝতে পারে না। এগিয়ে চলে দুটি জীবন। এগিয়ে চলে সাধারণ একটি গল্প। যা বলা হয়েছে খুব সাধারণ করে। খুব সচেতনতায় খেয়াল রাখা হয়েছে যেন কোনো অসাধারণ কিছু এর সারল্যকে আটকে না দেয়। দর্শক যেন ছোট ছোট আনন্দের টুকরো হাতরাতে হাতরাতে আবিষ্কার করে নাটকটির গল্প।
গল্প বলার এই স্বতন্ত্র ধরণটিই নির্দেশককে আলাদা করে উপস্থাপন করে। প্রকাশ করে থিয়েটার এর ভাষা প্রয়োগে তার অসাধারণ দক্ষতাকে । খুব স্বল্পাকার-আর আর্থিক সাশ্রয়ী সেট, বুদ্ধিদীপ্ত ব্যবহারে দর্শককে খুব সহজেই সম্পৃক্ত করে নেয় স্থানগুলোর সাথে। মঞ্চটিকে চারটি ভাগে ভাগ করে আলোর সহযোগিতায় জোনগুলিকে আলাদা করা হয়েছে। খুবই সাধারণ প্রতীকগুলো থেকে দর্শক বুঝে নেয় ঘটনার স্থান। আলোর পাশাপাশি নেপথ্য সঙ্গীত দর্শককে কল্পনার রথে চড়ায় গল্পের পথে, যা মঞ্চে দেখা যাচ্ছে তার পাশাপাশি যা সম্মুখে দৃশ্যমান নয়- দর্শক তাও দেখতে পায়। রোগী আর ডাক্তার দুজন মিলে দেখতে যায় বৌদ্ধ মন্দির। তারা মঞ্চ থেকে বেরিয়ে গেলেন। আলো নিভে গেলো। নেপথ্যে তখন বাজছে ম্যান্ডারিন সঙ্গীত, যা দর্শককে নিয়ে যায় মঞ্চের বাইরে বৌদ্ধ মন্দিরে। একই সাথে এটি ইন্টারলিউডের কাজও করে। মঞ্চকৌশলে এটি দর্শককে যেমন আচ্ছন্ন করে রাখে তেমনি কুশীলবদের সুযোগ করে দেয় পরবর্তী দৃশ্যের প্রস্তুতির । প্রতিটি দৃশ্যান্তরেই খুব যৌক্তিকভাবে ইন্টারলিউড ব্যবহার করা হয়েছে দৃশ্যের মনস্তত্ত্বকে ভাবনায় রেখে।
নাটকটি আগাগোড়া বাস্তবধর্মী। এই ধারার নাটকে বড় ঝুঁকি থাকে অভিনয়। সনজীব বড়ুয়া আর সাবিরা সুলতানা বীণা এক্ষেত্রে পুরোপুরি সফলতা থেকে অনেকখানি দূরে। বীণার অপ্রয়োজনীয় হাঁটা আর সনজীব এর মাত্রাতিরিক্ত দেহভঙ্গি নান্দনিকতায় বেশ খানিকটা ছেঁদ ঘটিয়েছে বারবার। অভাব ছিল দর্শকের সাথে চোখে চোখে কথা বলার। তবে তাদের সংলাপ প্রক্ষেপন কাঙ্ক্ষিত মানের । অভিনয়ে কিছুটা মাত্রাবোধের অভাব পরিলক্ষিত হলেও আলো, নেপথ্য সঙ্গীত, মঞ্চসজ্জা, পোশাক কোথাও নেই অতিমাত্রা । বরং খুব সযতনে ধরে রাখা হয়েছে সরলতা । এই সাধারণ উপস্থাপন আর সরল মিথষ্ক্রিয়াই এই নাটকের বিমূর্ততা। সকল দর্শক এই সরলতার বিমূর্ত রহস্য উদঘাটন করতে না পারলেও সাধারণ আনন্দের তুষ্টি পেয়েছেন নিশ্চিত। দেড়ঘণ্টা তাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে ছোট-ছোট আনন্দ। যে-আনন্দের প্রত্যাশা তার প্রতিদিনের জীবনে প্রাপ্তিতে বা অপ্রাপ্তিতে তাকে একাত্ম করেছে নাট্যকর্মটি ।

x