গণিতবিদ যখন গল্প-কথক

সালমা বিনতে শফিক

মঙ্গলবার , ২৬ নভেম্বর, ২০১৯ at ৫:১৯ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত ও ভৌত বিজ্ঞান গবেষণাগারে আজই (১১/১১/২০১৯) প্রথম প্রবেশ করার সৌভাগ্য হল। ইতিহাসের মানুষ এখানে কেন? এখানে আজ গণিতের ইতিহাস, সপ্তদশ শতকের বৈজ্ঞানিক বিপ্লব ও রেনেসাঁর ইতিহাস, এবং অষ্টম শতকের ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান নিয়ে দিনব্যাপী কথা বলতে এসেছেন ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের অধ্যাপক ড. পিয়ার্স বার্সিল হল (Dr. Piers Bursill Hall)। দর্শকদের মাঝে বিজ্ঞানের চেয়ে মানববিদ্যার মানুষ কম ছিলেন না। ক্যামব্রিজের অধ্যাপকতো বটেই, বিষয়বস্তুও আকৃষ্ট করেছে আমার মতো কলা ও মানববিদ্যা অনুষদের মানুষদেরকে। যতদূর জানি, কেবল শিক্ষকগণকেই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল এই আলোচনা সভায়।
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট বুলবুল দুর্বল হয়ে বাংলাদেশের সীমানা পার হয়ে গেলেও আকাশ থম মেরেছিল সকাল থেকে। নগণ্য উপস্থিতি নিয়ে যথারীতি আমাদের বাংলা চালে একটু দেরিতেই শুরু হয় মূল আয়োজন। সমাবেশটা ছোটখাট, বড়জোর তিরিশ জনের মতো উপস্থিত। চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ ক’জন শিক্ষক যোগ দেওয়ায় সংখ্যাটা তিরিশের কোঠায় পৌঁছেছে বলা যায়। আমন্ত্রিত অতিথিগণের সবাই শিক্ষক। দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, নিত্যসঙ্গী মুঠোফোনগুলোকে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে বেশির ভাগ দর্শকই ভুলে গিয়েছিলেন। ফলাফল কিছুক্ষণ পর পর সঙ্গীতের মূর্ছনা। কেউ কেউ আবার নিম্নস্বরে কথাও বলতে শুরু করেন। নিশ্চয় জরুরী কথা। তবে অনুষ্ঠানের গুরুত্বতো আমাদের বুঝতে হবে। মঞ্চে বিদেশী অতিথি বলেই নয়, বক্তা যেই হন না কেন মুঠোফোন বন্ধ রাখা, নিদেনপক্ষে যন্ত্রটাকে শব্দহীন করে রাখা আমাদের নৈতিক দায়িত্বের মতো। আর ভিনদেশী বক্তা হলেতো আমাদের বিব্রতকর আচরণের দায়ভার পুরো জাতির ওপর গিয়ে বর্তায়, কারণ আমাদের সম্পর্কে বিদেশী অতিথি মানুষটি একটা নেতিবাচক ধারনা পোষণ করতেই পারেন। কেবল এই অপ্রীতিকর অংশটুকু বাদ দিলে একটা অবিস্মরণীয় ঐতিহাসিক অধ্যায় যুক্ত হল জীবন খাতায়।
গণিতের সৌন্দর্যের আলোচনা দিয়ে বক্তব্য শুরু করেছিলেন অধ্যাপক ড. পিয়ার্স বার্সিল হল। মুল আলোচনার আগে অনানুষ্ঠানিক আলাপচারিতায় আমারই উত্থাপিত কথার সুত্র ধরে ঘণ্টার বেশি সময় ধরে গণিতের সৌন্দর্য বর্ণনা করে গেলেন, স্বভাবজাত প্রাণবন্ত উপস্থাপনায় গল্প বলার ঢঙে। সব কথা আমার বোধগম্য হয়নি, বলা বাহুল্য। কারণ অংকের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোবার পর থেকেই। তবে গণিতের ভাষা ও সার্বজনীনতা, গণিতের দর্শন, গণিতের ইতিহাস, গণিতের আইন নিয়ে ছন্দবদ্ধ যে বর্ণনা তিনি দিয়ে গেলেন তা অভূতপূর্ব। আমার কেবলই মনে হচ্ছিল তিনি যেন গণিতের সুর ভাঁজছিলেন।
পরীক্ষার পূর্ব রাত্রির মতো আগের রাতে ‘কে এই পিয়ার্স বার্সিল হল’- জানতে কড়া নেড়েছিলাম গুগোল মশাইয়ের দুয়ারে। পৃথিবীর নানা প্রান্তে সৌম্যদর্শন এই ইংরেজ ভদ্রলোকের বক্তৃতা ও সাক্ষাৎকারের স্থিরচিত্র, চলমান চিত্র সব চলে আসে চোখের সামনে একের পর এক। সব আলোচনাই সুদীর্ঘ; ঘণ্টার ওপরে। অত শুনে কুলকিনারা পাওয়া যাবেনা। তাই একটাই বেছে নিলাম, শিরোনাম দেখে; ‘গণিতের সৌন্দর্য’। সৌন্দর্য নিয়ে আমাদের ভাবনা চিন্তাতো অন্যরকম; বাহ্যিক ঠাঁটবাট, জাঁকজমকই আজকাল সৌন্দর্যের মাপকাঠি। গণিতের মতো নিরস, আর ভয় জাগানিয়া বিষয়ে কী এমন সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকতে পারে! সকাল বেলায় প্রথম দেখায় পেড়েই ফেলি মনের কথাটা। স্বয়ং তাঁরই কাছে। ঘরোয়া আলাপকে তিনি টেনে নিয়ে যান মঞ্চে, আর বিস্ময়করভাবে টানা দুঘণ্টার বেশি কথা বলে যান রঙ চা দিয়ে গলা ভিজিয়ে ভিজিয়ে। আগের দুদিন ঢাকায় অনুষ্ঠিত গুণীজন সম্মেলন ‘লিট ফেস্টিভ্যাল’ এ টানা কথা বলে গলা ভেঙে বসেছেন।
গণিতের সৌন্দর্যের পর ড. হল বর্ণনা করেন গণিতের শ্রেষ্ঠত্বের কথা। অক্ষর জ্ঞানহীন মানুষও গনিতে দক্ষ হতে পারে, আর প্রাত্যহিক লেনদেনের কাজ সুচারুরূপে সম্পাদন করতে পারে। তিনি বলেছেন, গণিত নিজেই একটা ভাষা, এবং এই ভাষা সার্বজনীন। সমাজ জীবনে সকলের জন্য অতি প্রয়োজনীয় জীবনমুখী শাস্ত্র গণিত, কোন সন্দেহ নেই, যদিও আদিকালের মানুষদের মতো আজকের সমাজের অনেকেও গণিতের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিতে পারেনা। অংকভীতি পেয়ে বসে বেশীর ভাগ মানুষকে ছেলেবেলাতেই। তিনি আরও বলছিলেন অংক হচ্ছে একটা খেলা। গল্প কবিতা যেমন শব্দ নিয়ে খেলে, তেমনি অংক খেলা করে সংখ্যা নিয়ে। এবং সবাই মিলে তৈরি করে ইতিহাস।
ধর্মবিশ্বাস নিয়ে দারুন কথা বলেছেন ড. হল। তাঁর মতে, অনেক গনিতবিদই কথায় কথায় বলে ফেলেন আল্লাহ খোদা তথা ঈশ্বর গডে কোন বিশ্বাস নেই তাঁদের, কারণ তাঁরা সবসময় যুক্তি প্রমাণ খোঁজেন। তবে দিনশেষে তাঁদের অনেকেই আবার ধর্মের মাঝে স্বস্তি আর মুক্তি খুঁজে পান, কাজে কর্মে ধর্ম পালন করুন কি নাইবা করুন। অনেকটা পৃথিবীর নামজাদা শৈল্য চিকিৎসাবিগণের মতো; গুরুতর কোন অস্ত্রোপচারের আগে রোগীর স্বজনকে আশ্বস্ত করেন এই বলে যে ু ‘আমরা আমাদের সাধ্যের সেরাটা দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাব, বাকিটা ওপরওয়ালার হাতে। তাঁর কাছে প্রার্থনা করুন’। অসহায় মানুষের নির্ভরতা ও আত্মসমর্পণের একটাই স্থান; স্বয়ং সর্বশক্তিমান, বিশ্বাসী মাত্রই যা ধারণ করে অন্তরে।
ড. হলের উপস্থাপিত সব কথা যে ভাল্‌ভাবে বুঝতে পেরেছিলাম তা নয়, তবে একজন মানুষকে খুব মনে পড়ছিল সকাল থেকে। জামাল নজরুল ইসলাম; তিনি কিংবদন্তী, তিনি ইতিহাস। পৃথিবীর জ্ঞান বিজ্ঞানের ইতিহাসে অবদান রাখার স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে যে অল্প ক’জন সোনার মানুষের নাম শোনা যায়, তাঁদেরই একজন অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলাম। তাঁর হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান এই গণিত ও ভৌত বিজ্ঞান গবেষণাগার। তাঁর হাতের স্পর্শ, পায়ের চিহ্ন লেগে আছে লোকালয় থেকে বেশ দূরে স্থাপিত এই প্রতিষ্ঠানের সর্বত্র। দূর থেকে দেখেছিলাম তাঁকে বেশ কিছু সভায়। বৈজ্ঞানিকসুলভ গুরুগম্ভীর ভাব নিয়ে নয়, শিল্প সাহিত্য আর ইতিহাসের রস নিয়ে হাস্যমুখে মাটির মানুষের মতো কথা বলতেন।
ভাবনা থেকে ফিরে আসি বাস্তবে। দুপুরের খাবারের পর আবার মুখোমুখি হই ড. পিয়ার্স হলের। তাঁর মুখ থেকে জামাল নজরুল ইসলামের কথা জানতে ইচ্ছে হল খুব। প্রশ্ন শুনেই হেসে উঠলেন; ‘হি ওয়াজ অ্যা সু্‌ইট ম্যান’। স্নাতকের শ্রেণীকক্ষে তাঁকে সরাসরি পড়িয়েছিলেন জামাল নজরুল। প্রিয় শিক্ষক হিসেবে তালিকার প্রথম দিকেই নাম তাঁর। তাঁর মতো একজন মানুষ, যিনি একইসঙ্গে বিজ্ঞান, ইতিহাস, ও সাহিত্যকে ধারণ করতেন, এবং ছাত্রবৎসল আচরণ দিয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে মুগ্ধতার আবেশ ছড়িয়ে দিতেন, যে কোন শিক্ষার্থীর কাছেই প্রিয় হওয়ার কথা, তা দেশেই হোক কি দেশের বাইরে। সেকারনেই বোধ করি আবেগের বশে ‘সু্‌ইট ম্যান’ কথাটা বলে ফেলেছেন ড. হল। গণিত ও ভৌত বিজ্ঞান গবেষণাগারের দ্বিতীয় তলা সাজানো বিশ্বখ্যাত গণিতবিদগণের প্রতিকৃতি দিয়ে। জামাল নজরুলের পাশেই নোবেল বিজয়ী আবদুস সালাম। সেই ছবির দিকে ইঙ্গিত করে ড. হল বললেন তিনিও আছেন প্রিয় শিক্ষকের তালিকায়। নোবেল জয়ী গণিতবিদ জন ন্যাশের জীবনীর ওপর ভিত্তি করে নির্মিত হলিউডের অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র ‘অ্যা বিউটিফুল মাইন্ড’’ নিয়েও আলাপ হল ড. হলের সঙ্গে।
এরপর তাঁর মায়ের কথা জানতে চাইলাম, সঙ্গত কারণেই। আগের রাতে ইউটিউবে সংরক্ষিত তাঁর এক বক্তৃতায় শুনলাম, মজা করেই বলছিলেন- তাঁর লেখা বই সর্বোচ্চ পাঁচ কপি বিক্রি হয়, আর পাঠক বড়জোর তিনজন, তার মধ্যে একজন তাঁর মা। মায়ের গল্প করলেন আমার সঙ্গে দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে; কানাডা’র ভেঙ্কুভারে একাই থাকেন তিনি। পঁচানব্বই বছরে ঘর গেরস্থালী সামাল দেন একা হাতে, এখনও গাড়ী চালান, ছেলেমেয়েদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন অন্তর্জালের মাধ্যমে। আমার কাছে হঠাৎ যেন মনে হল- ছোট্ট ছেলেটি হয়ে গেছেন ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের অধ্যাপক ড. পিয়ার্স বার্সিল হল মানুষটা।

x