গণহত্যা ’৭১

ফারহানা আনন্দময়ী

মঙ্গলবার , ২৬ মার্চ, ২০১৯ at ৬:৪১ পূর্বাহ্ণ
62


‘মুক্তিযুদ্ধ’ শব্দটির মুক্তি তথা বিজয় যতটুকু সাড়ম্বরে উদযাপন করা হয়, যুদ্ধ শব্দটুকু ঠিক ততটুকুই আড়ালে রয়ে যায়। এই ‘মুক্তি’ পর্যন্ত পৌঁছুতে যে ‘যুদ্ধ’টা লড়তে হয়েছে তার প্রায় পুরোটাই নির্যাতন আর বেদনার ইতিহাসে ভরা। আমরা বিস্মৃতিপ্রবণ জাতি, আমরা গন্তব্যে পৌঁছে হেঁটে আসা পথের নামধাম ভুলে যাই। স্বাধীনতা পরবর্তী আমাদের এক প্রজন্মকে স্বাধীনতা এবং যুদ্ধের ইতিহাস ইচ্ছাকৃত ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে অথবা বিকৃত ইতিহাস সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তাতে ক্ষতি কী হয়েছে? আমাদের এক প্রজন্মের কিছু অংশ বা তাদের উত্তরসারীরা ‘মুক্তিযুদ্ধ’কে চেতনা নামে গালি দেয়ার ধৃষ্টতা দেখাতে পারছে। আহা! তারা যদি একটিবার মুক্তিতে পৌঁছুনোর লড়াইটার প্রকৃত চিত্র পড়তে বা দেখতে কিংবা শুধুই শুনতে পেতো, আমি নিশ্চিত তারা ঠিকই অনুধাবন করতো, মুক্তিযুদ্ধ আসলে কতটা রক্তক্ষরণ, অশ্রুপাত আর আত্মত্যাগের ইতিহাস।
অশ্রুজলে লেখা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের প্রতি পাতায় লেখা আছে নির্মম গণহত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ, উদ্বাস্তুদের হাহাকার, আর কতশত পরিবারের বেদনার কাহিনী। সেই কাহিনীকে স্মরণে আনতে চাইলে আজকের স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে কেউ কেউ বলেন, এতো অতীতমুখি হলে সামনে এগুনো যায় না। কোন্‌‌অতীতকে ভুলে যেতে বলছেন আপনারা! বাংলাদেশের সমান বয়স আমার। ছোটবেলা থেকে যতবারই বগুড়ায় নানাবাড়িতে গেছি, নানীর ঘরের একটা দেয়াল আমাকে কিছুতেই এই অতীত ভুলতে দেয় না। খোকন পাইকাড়, আমার সেজো মামা, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার তিন মাসের মাথায় পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়েছিলেন। জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে মুক্তিবাহিনীর সেই দলের সকলকে চোখ বেঁধে গুলি ক’রে একটি গর্ত খুঁড়ে সেখানে ছুড়ে ফেলেছিল তারা। ধরা পড়ার পরে পালিয়ে যেতে-পারা এক সহযোগীর কাছে তাঁর হাতকাটা কোটিটা দিয়ে বলেছিলেন, বেঁচে থাকলে এটি আমার মায়ের হাতে পৌঁছে দিয়ো। মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার একবছর পরে নানী সেটি পেয়েছিলেন, এবং বাকিজীবন নানীর ঘরে দেয়াল আলমারিতে সেই স্মৃতিচিহ্ন ঝুলানো ছিল। এই অতীত কি ভুলে যাওয়ার অতীত!
আজ এই প্রসঙ্গে এতো কথা লেখার একটাই কারণ হলো, কোনো কোনো বাঙালী এই অতীতকে মর্যাদার সাথে আন্তরিকভাবে সংরক্ষণ করতে চেয়েছেন। তাঁদের অন্যতম অধ্যাপক এবং ইতিহাস গবেষক ড: মুনতাসির মামুন। তাঁর ঐকান্তিক চেষ্টায় খুলনায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৯৭১; গণহত্যা- নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর। ২০১৪ সালের ১৭ মে, বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় এই তারিখটিও সংযুক্ত হয়ে যাবে। এই তারিখেই খুলনার ২৬ সাউথ সেন্ট্রাল রোডে এটির স্থায়ী ঠিকানা হয়। খুলনা আমার জন্মশহর, ২০১৪’র পরে যতবারই খুলনায় গেছি, অন্ততঃ একবার ছুঁয়ে এসেছি এই আর্কাইভ। বিশ্বাস করুন, একজন মানুষ যদি ন্যূনতম সংবেদনশীল হয়, দোতালা বাড়ির এই আর্কাইভে ঢুকলে তার মন বিষাদী হবেই, তিনি জীবনে আর কোনোদিন মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতে পারবেন না। এতো অত্যাচার, এতো নির্যাতন, সীমাহীন অপমান সহ্য করে যাঁরা এই দেশের স্বাধীনতায় চিহ্ন রেখে গেলেন, তাঁদের ঋণ আমরা কেবল স্বীকারই করতে পারি, শোধ করা অসম্ভব।
১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের একমাত্র গণহত্যা জাদুঘর। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রদান করা জমি ও বাড়িতে এই জাদুঘর ও আর্কাইভের কার্যক্রম চলছে। এই বাড়িটিও আমার ব্যক্তিগত স্মৃতিতে একটা আবছায়া জায়গা দখল করে আছে। বাড়িটা ছিল স্বাধীনতা পরবর্তীকালে বাগেরহাট থেকে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য আব্দুল লতিফ খানের আবাস। সম্পর্কে তিনি আমার বাবার বন্ধু ছিলেন এবং বন্ধুতা ছাড়াও তিনি আমার মাকে খুব স্নেহ করতেন। বাবা-মায়ের সাথেই, মনে পড়ে, কতবার বালিকা-আমি ওই বাড়িটিতে যেতাম।
খুলনায় স্থাপিত হলেও এটি কোন আঞ্চলিক জাদুঘর নয়। বাংলাদেশের একমাত্র গণহত্যা জাদুঘরটি খুলনায় স্থাপন করার কারণ হচ্ছে, খুলনার চুকনগরেই সবচেয়ে বড় ও নৃশংস গণহত্যা চালিয়েছিলো পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসররা। এটি একটি অলাভজনক বেসরকারী প্রতিষ্ঠান। ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই এর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অধ্যাপক ড. মুনতাসীর মামুন।
গত পাঁচ বছরে আর্কাইভে এসেছে মুক্তিযুদ্ধে নির্মমতার উপর প্রচুর আলোকচিত্র। আর্কাইভের নীচতলার একটি ঘরে সংরক্ষণ করা আছে এই গণহত্যায় নির্যাতিতদের ব্যক্তিগত ব্যবহারাদির কারো কারো স্মৃতিচিহ্ন। এঁদের মধ্যে জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, সেলিনা পারভিন, মুনীর চৌধুরী, আলীম চৌধুরী উল্লেখযোগ্য। আছে গণহত্যা বিষয়ক তথ্য, যা ক্রমাগত সংগৃহীত হয়ে চলেছে। ইতিমধ্যে খুলনা বিভাগে ২০টি বধ্যভূমি ও নির্যাতনকেন্দ্রে স্মৃতিফলক স্থাপন করা হয়েছে। আর্কাইভে আছে বধ্যভূমি সংক্রান্ত তথ্যভান্ডার, আলোকচিত্র, ও বিভিন্ন গ্রন্থ। গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভের একটি বিশেষ প্রকল্প হচ্ছে দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা গণহত্যাস্থল কেন্দ্রিক প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যভিত্তিক গ্রন্থের ভিত্তিতে গণহত্যা-নির্যাতন নির্ঘন্ট গ্রন্থমালা প্রকাশ। এই সময়ের মধ্যে ৩৩টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। জাদুঘর ট্রাস্টের উদ্যোগে প্রতিবছর একক বক্তৃতা, শহীদ স্মৃতি বক্তৃতা, এবং নানা প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। পালন করা হয় বিশেষ দিবসগুলি।
এই আর্কাইভের উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম ও অর্জনের মধ্যে রয়েছে: গণহত্যা আর্কাইভ জাতীয় জাদুঘরের সাথে যৌথ প্রদর্শনী আয়োজন করেছে। ত্রিপুরা সরকারের সাথে ’গণহত্যা-নির্যাতন ১৯৭১’ শীর্ষক প্রদর্শনী। এই ট্রাস্টের প্রস্তাবে সম্মত হয়ে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণে ত্রিপুরা সরকার একটি জাতীয় উদ্যান তৈরি করেছে এবং সেখানে গণহত্যা-নির্যাতন জাদুঘরের তত্ত্বাবধানে একটি ভাস্কর্য উদ্যান গড়ে তোলা হয়েছে। এই আর্কাইভের উদ্যোগে ’মুক্তিযুদ্ধ ও ত্রিপুরা ১৯৭১’ শিরোনামে ত্রিপুরা জাদুঘরের একটি কক্ষ সজ্জিত করা হয়েছে। এবং বাংলাদেশ ডাকবিভাগ গণহত্যা-নির্যাতন জাদুঘরের উপর একটি স্মারক খাম প্রকাশ করেছে। মুক্তিযুদ্ধের বই বিক্রির জন্য জাদুঘরে একটি বিক্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে এবং দর্শনার্থীদের জন্য একটি ক্যাফেটেরিয়া রয়েছে। জাদুঘরের নিজস্ব গ্রন্থাগারে মুক্তিযুদ্ধের অঞ্চলভিত্তিক নানা প্রকাশনা ছাড়াও এ বিষয়ক আরো অনেক সমৃদ্ধ প্রকাশনা রয়েছে। জাদুঘরের অভ্যন্তরে একটি মুক্তমঞ্চ গড়া হয়েছে, নির্দিষ্ট সৌজন্যমূল্যের বিনিময়ে যেটি সংস্কৃতিসেবীরা ব্যবহার করছেন।
বাংলাদেশের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় খুলনার সোনাডাঙা এলাকায় গণহত্যা জাদুঘর চালু করেছে গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধ কেন্দ্র (ঈবহঃৎব ভড়ৎ এবহড়পরফব-ঞড়ৎঃঁৎব ধহফ খরনবৎধঃরড়হ ডধৎ ঝঃঁফরবং) প্রকল্প। মুক্তিযুদ্ধের গণহত্যার ইতিহাস নিয়ে সেখানে গবেষণা করছেন এই প্রজন্মেরই কত উজ্জ্বল তরুণ। অবাক হতে হয়, দেশের বিভিন্ন জেলা, প্রত্যন্ত অঞ্চলে গণহত্যা আর নির্যাতনের ইতিহাস তুলে ধরতে তাঁদের আন্তরিকতা, মেধা আর পরিশ্রম দেখলে। এদের কাজ দেখলে মনে হয়, এই বাংলাদেশকে নিয়ে এখনো কিছু স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখাই যায়। এই প্রকল্পের আওতায় মুক্তিযুদ্ধ, গণহত্যা এবং নির্যাতন নিয়ে তিন মাসের একটি একটি ইনটেনসিভ সার্টিফিকেট কোর্স করানো হবে। এই প্রকল্পের সার্বিক তত্ত্বাবধানে রয়েছে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়।
এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন, গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধ কেন্দ্র চট্টগ্রামেও শতাধিক গণহত্যার স্মৃতিচিহ্ন খুঁজে পেয়েছেন এবং সেই বিষয়ে রিপোর্টও ছেপেছে, বলা হয়েছে চটগ্রাম বধ্যভূমির শহর। সবচেয়ে বড় বধ্যভূমিটি পাওয়া গেছে ফয়েজ লেক এলাকায়। একইসাথে নগরীর অন্যান্য এলাকায় শহিদনগর তথা লালখানবাজারে, আমবাগান, পুলিশ লাইন, গুডস হিল, সার্কিট হাউস, মহামায়া ডালিম হোটেল, ঝাউতলা, টাইগারপাস, গরীবুল্লাহ শাহ মাজার এলাকাসহ প্রায় পঁচিশটি বৃহৎ বধ্যভূমি চিহ্নিত করেছে, যেসব জায়গাগুলো সাক্ষি হয়ে রয়েছে ১৯৭১ ঘটে যাওয়া অজস্র গণহত্যা আর নির্যাতনের নির্মমতার। এই নিষ্ঠুরতার স্মৃতিগুলো যত্নের সাথে, মর্যাদার সাথে সংরক্ষণ করা হোক আগামি প্রজন্মের বোধের উন্মেষের স্বার্থে।
তথ্যসূত্র : গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও যাদুঘর লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক

x