গণপরিবহন নৈরাজ্যে ঘরে ফেরা মানুষের চরম দুর্ভোগ

ট্রেনে নেই ঠাঁই, বাস ভাড়া কয়েক গুণ বেশি

শুকলাল দাশ

রবিবার , ১১ আগস্ট, ২০১৯ at ৭:৩২ পূর্বাহ্ণ
37

প্রিয়জনের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে বাড়ি যেতেই হবে। আর এই আনন্দে মানুষ ছুটছে বাস আর রেল স্টেশনে। গতকাল ঈদে বাড়ি ফেরার শেষ দিনে সবখানে ছিল উপচে পড়া ভিড়। দূর পাল্লার বাসের টিকিটের জন্য ছিল হাহাকার। টিকিটের জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে করতে অনেকেই দ্বিগুণ-তিনগুণ বেশি দামে টিকিট কিনতে বাধ্য হয়েছেন। এদিকে গতকালের প্রতিটি ট্রেনে ভেতরে-বাইরে ছিল সমান যাত্রী। নিয়মিত ট্রেনের ধারণ ক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি যাত্রী ছিল প্রতিটি ট্রেনে।
প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা শত শত যাত্রীদের বাধ্য হয়ে স্ট্যান্ডিং টিকিট দিতে দেখা গেছে রেল কর্মচারীদের। কারণ হিসেবে রেল কর্মচারীরা জানান, টিকিট না দিলেও তারা টিকিট ছাড়া চলে যাবেন ছাদে করে। তাই বাধ্য হয়ে প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে টিকিট দিচ্ছি। অধিক যাত্রীর চাপে রেল কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একেকটি ট্রেন ছাড়তে রীতিমত হিমশিম খেতে হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ে অধিক যাত্রীর কারণে অনেক ট্রেন ছাড়তে পারেনি গতকাল। দুর্ঘটনা রোধে জোর করে শত শত যাত্রীদের ট্রেন থেকে নামিয়ে দিতেও দেখা গেছে। গতকাল চট্টগ্রাম রেল স্টেশনে গিয়ে দেখা গেছে, রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য, জিআরপি পুলিশ কেউ এই জনস্রোত থামাতে পারছেন না। বিকাল সাড়ে ৩টায় চাঁদপুর স্পেশাল-২ ট্রেনটির ভেতরে কানায় কানায় ভরে যাওয়ার পর ছাদে উঠে পড়ে শতশত মানুষ। এসময় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা এসে একদিকে ছাদ থেকে জোর করে যাত্রীদের নামিয়ে দিলেও অন্যদিকে আবার উঠে পড়ে। একই অবস্থা ছিল ময়মনসিংহ এঙপ্রেস, ময়মনসিংহগামী বিজয় এঙপ্রেস, নাছিরাবাদ এঙপ্রেস, চাঁদপুরগামী প্রতিটি ট্রেন, সিলেটগামী পাহাড়িকা ও উদয়নে। একটি ট্রেন নির্দিষ্ট সময়ে প্লাটফর্মে আসার দুই থেকে তিন ঘণ্টা আগে শত শত যাত্রী স্টেশনে এসে ভিড় করতে থাকে। অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে টিকিট নিয়েও অনেকেই নির্দিষ্ট আসনে বসতে পারেননি।
ভিড় ঠেলে নিজের আসনে বসতে না পেরে সিলেটগামী পাহাড়িকা এঙপ্রেসের যাত্রী সাইফুল ইসলাম জানান, স্ত্রী-কন্যাসহ তিনজনের টিকিট কেটেছিলাম। কিন্তু আমি আমার বগি খুঁজে পাইনি। তবে ট্রেনে উঠতে পেরে তার এই ক্লান্তি কিছুটা কেটে গেছে বলে জানান তিনি। একই অবস্থা ছিল ময়মনসিংহগামী বিজয় এঙপ্রেসের যাত্রী রোজী আকতার ও মামুনের। তারাও ভিড়ের কারণে নিজেদের বগিতে উঠতে পারেননি।
শুধু সাইফুল ইসলাম, রোজী আকতার বা মামুন নয়, এরকম শত শত যাত্রী নিজেদের আসনে বসতে পারেননি ভিড়ের কারণে। তারপরও বাড়ি ফেরার পথে সকল ক্লান্তি ভুলে যেতে চান প্রিয়জনের সান্নিধ্যে।
গতকাল ট্রেন স্টেশনের সেই একই ভিড় পরিলক্ষিত হয়েছে নগরীর কদমতলী বাস স্টেশনে গিয়ে। একটা টিকিটের জন্য চারিদিকে গিজগিজ করছে অসংখ্য মানুষ। একই চিত্র দেখা গেছে একে খান মোড়ে বাস কাউন্টারগুলো ঘুরে। বিআরটিসি বাস স্টেশন ও গরিবুল্লাহ শাহ মাজার গেইটে আন্তঃনগর বাস কাউন্টার, নতুন ব্রিজ বাস কাউন্টার, অলঙ্কার মোড়, অঙিজেন এবং নতুন কাপ্তাই রাস্তার মাথায় বাসের টিকিটের জন্য রীতিমত হাহাকার করতে দেখা গেছে যাত্রীদের।
নতুন ব্রিজ এলাকায় চকরিয়ার যাত্রী মো. সানাউল্লাহ জানান, স্বাভাবিক সময়ে নতুন ব্রিজ থেকে চকরিয়ার বাস ভাড়া ১৮০ টাকা হলেও ঈদ উপলক্ষে ঘরমুখো মানুষের বাড়তি ভিড়কে পুঁজি করে বাস চালকরা ভাড়া দাবি করছেন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা।
আনচার নামের রামুর আরেকজন যাত্রী বলেন, নির্ধারিত ভাড়া ২৫০ টাকা হলেও কাউন্টারগুলোতে কয়েকগুণ বেশি ভাড়া দাবি করছে। মানুষকে একপ্রকার জিম্মি করেই তারা এসব করছেন। ঈদযাত্রায় মানুষের এমন সীমাহীন দুর্ভোগেও প্রশাসন নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে। পরিবহন সিন্ডিকেটের কাছে তারাও যেন জিম্মি হয়ে গেছে। পরিবহন সংশ্লিষ্টরা কী সরকার এবং প্রশাসনের চেয়েও শক্তিশালী? প্রশ্ন এ যাত্রীর।

x