গণপরিবহনে যৌন হয়রানির শিকার ৮১ শতাংশ নারীই চুপ থাকেন

নিপা দেব

শনিবার , ১১ জানুয়ারি, ২০২০ at ১০:৫১ পূর্বাহ্ণ

এমন কোনও দিন বাদ নেই যে পত্রিকার পাতা খুললেই নারী নির্যাতনের খবর চোখে পড়েনি। ঘরের ভিতর কিংবা বাইরে, পথে-ঘাটে, মাঠে-ময়দানে, বাসে, ট্রাকে, মাইক্রোবাসে এমনকি নৌযানে- সবখানে-সবস্থানে ঘাপটি মেরে বসে আছে ধর্ষকরা- নারী নির্যাতনকারীরা। সুযোগ পেলেই সেইসব পুরুষের ভিতর থেকে হায়েনা বেরিয়ে আসে।
একটি গবেষণা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে খবরটিতে জানানো হয়- দেশে গণপরিবহনে যাতায়াতের সময় ৯৪ শতাংশ নারী মৌখিক, শারীরিক বা অন্যান্যভাবে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। রাস্তা থেকে শুরু করে গণপরিবহনে ভ্রমণ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের হয়রানির ঘটনা ঘটে থাকে। আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ না থাকা, বাসে অতিরিক্ত ভিড়, যানবাহনে পর্যাপ্ত আলো না থাকা আর তদারকির অভাবকে যৌন হয়রানির অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষণাটি নিয়ে একটি প্রতিবেদন চলতি বছরের মে মাসে দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত হয়।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের পক্ষ হতে ‘নারীর জন্য যৌন হয়রানি ও দুর্ঘটনামুক্ত সড়ক’ শীর্ষক উক্ত গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন ব্র্যাকের জেন্ডার, জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভার্সিটি কর্মসূচির সমন্বয়ক হাসনে আরা বেগম এবং ব্র্যাক ইন্সটিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) এর গবেষণা সহযোগী কবিতা চৌধুরী। ২০১৭ সালের এপ্রিল থেকে জুন- এই তিন মাসে এ গবেষণাটির জরিপে ৩৫৭ জন নারী অংশ নেন। আর গুণগত গবেষণায় ২৯ জন করে নারী ও পুরুষ অংশ নেন।
ঢাকার মতিঝিল, মহাখালী, বনানী, মিরপুর ও কল্যাণপুর, গাজীপুর ও সাভারের বিরুলিয়া ইউনিয়নের খাগান গ্রামের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, কর্মজীবী নারী ও গৃহিণী যারা প্রতিনিয়ত গণপরিবহন ব্যবহার করেন তাদের নিয়ে এ গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে। এছাড়াও ২৯ জন পুরুষ যাত্রী, বাস, টেম্পো ও সিএনজি চালক ও চালকের সহকারীরও সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া ৭৪ শতাংশ নারী বাস, টেম্পো বা সিএনজিতে যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। এর মধ্যে টেম্পোতে যাতায়াতকারীরাই সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এছাড়াও পথচারী ২৬ শতাংশ নারী যৌন নিপীড়নের কথা বলেছেন। গবেষণায় অংশ নেওয়া বেশিরভাগ নারীই (৬৬ শতাংশ) জানিয়েছেন, তারা ৪১ থেকে ৬০ বছর বয়সী পুরুষ দ্বারা যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। ব্র্যাকের জেন্ডার, জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভার্সিটি কর্মসূচির সমন্বয়ক হাসনে আরা বেগম বলেন, অশালীন বা পীড়নমূলক ভাষার মাধ্যমে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন ৬৮ শতাংশ নারী। ৮১ ভাগ নারী বলছেন, যে তাকে চেনে না সে তার দিকে অশ্লীল বা কুদৃষ্টিতে তাকিয়েছে। বয়সভেদে এর কোনো পার্থক্য নেই। সব বয়সী নারীরাই যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন।
ওই গবেষণায় আরও বলা হয়- যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটলে অধিকাংশই অর্থাৎ ৮১ শতাংশ নারীই নিশ্চুপ থাকেন। হাসনে আরা বেগম জানান, যৌন হয়রানির শিকার হলে তাদের কিছু করার নেই বলেই/ ভেবেই তারা চুপ থাকেন। ৭৯ শতাংশ নারী আক্রান্ত হওয়ার স্থানটি থেকে সরে যান এবং ৫৫ শতাংশ নারী হয়রানিকারীকে আচরণটি বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। ১৪ শতাংশ নারী শারীরিকভাবে এ আচরণ ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন।
এছাড়াও ৪৬ ভাগ নারী নিজেদের নিরাপদ রাখার জন্য হিজাব ব্যবহার করছেন বলেও জানান এ গবেষক।
নারীর প্রতি যৌন হয়রানি বন্ধ ও দুর্ঘটনামুক্ত সড়ক নিশ্চিতে যুবসমাজ, শিক্ষক, গণমাধ্যমকর্মী, পরিবহন মালিক ও শ্রমিক, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামর্থ বৃদ্ধি, সর্বস্তরে জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও জনগণকে সংগঠিত করা এবং নীতিগত পর্যায়ে অ্যাডভোকেসি বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে ওই প্রতিবেদনে। পাশাপাশি সড়ক ও যানবাহনের নকশা, পরিবহন খাতে সেবা প্রদানকারীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও তদারকি নিশ্চিত করা এবং সড়ক ও পরিবহন ব্যবহারকারীদের নিরাপদ আচরণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ, সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পদক্ষেপ নেওয়ারও সুপারিশ করা হয়।
কিন্তু কেনো হচ্ছে এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি? এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পরিবহন মালিকেরা যানবাহনকে নিরাপদ করে তোলার ক্ষেত্রে কি কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে? কিংবা কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে তাদের আচরণগত প্রবণতার দিকটি কি কখনো বিবেচনায় রাখা হয় বা হচ্ছে? নারী-পুরুষ সমান বা নারীর প্রতি সবসময় সম্মান প্রদর্শনের ব্যাপারে কি তাদেরকে কখনো বা কোনোসময় কাউন্সেলিং করা হয় বা হয়েছে? রাষ্ট্রযন্ত্র কি এক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা রাখতে পারে না কিংবা কখনো রেখেছে?
উপরন্তু, যারা ধরা পড়ছে পুলিশের হাতে কয়জনেরইবা শাস্তি নিশ্চিত করতে পেরেছে বিচার ব্যবস্থা? কয়টি বিচারইবা যথাসময়ে সম্পন্ন হয়েছে? কয়জন ভিকটিমকেইবা সমাজ বিচার চাওয়ার ক্ষেত্রে উৎসাহিত করেছে? এক্ষেত্রে মিডিয়ার সামাজিক ভূমিকাও কি মিডিয়া পালন করেছে ঠিকমত? মিডিয়া কি অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত হওয়া পর্যন্ত ফলো-আপ রিপোর্ট অব্যাহত রেখেছে? সমাজের যাঁরা জনপ্রতিনিধি আছেন- তাঁরাও কি বিষয়গুলো নিয়ে সোচ্চার ভূমিকা রেখেছেন? বরং মাঝে-মাঝে উল্টো শুনতে পাই- ‘তুফান সরকারদের’ বাঁচানোর জন্য ক্ষমতাবান মানুষেরা ভিকটিমের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে তো আবার রক্ষককেই ভক্ষক হয়ে উঠতে দেখছি!
এমনকি- মেয়েদের ভোগ্যপণ্য হিসেবে দেখার যে ‘ভাইরাস’ এই পুরুষশাসিত সমাজের অস্থিমজ্জায় মিশে আছে- তা দূর করার ক্ষেত্রে ছোটো-বড় সকল স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোইবা কী ভূমিকা রাখছে?
যদি প্রশ্ন করি, গত এক দশক ধরে কতোসংখ্যক ধর্ষণ কিংবা নারী নির্যাতন মামলা ঝুলে আছে দেশের বিভিন্ন আদালতে? তার মধ্যে মাত্র কতো শতাংশের বিচার সম্পন্ন হয়েছে? দ্রুত বিচারের মাধ্যমে কয়জন অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত হয়েছে? এর জবাব দেওয়া কি খুব সহজ হবে?
তার উপর, আমরা তো জানি-ই, এই দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার দরুণ নারীকে বারংবার আদালতে হাজিরা দিয়ে ধর্ষণের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিতে হয় আসামি পক্ষের কৌসুলির জেরায়।
তখন নারী যে কতোটা মানসিক যন্ত্রণায় থাকেন তার হিসেব কে রাখে?
অনেকেই আবার ধর্ষণের ঘটনায় প্রথমেই আঙুল তুলেন ধর্ষিতা নারীর দিকে। কেন তিনি রাতে বাইরে গিয়েছিলেন? কিন্তু তাঁরা ভুলে যান- আজ শিক্ষিত মহিলাদের বাইরে বের হতে হয় নানা কাজকর্মে। জীবিকার তাগিদে দুটো বাড়তি রোজগারের আশায় অনেক নারীকে কাজ করতে হয় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত। চড়তে হয় গণপরিবহনে। কিন্তু তার জন্য তাঁকে কি যৌন নিগ্রহের শিকার হতে হবে? এজন্য কি রূপা খাতুনের মতো যাত্রীদের চলন্তবাসে ধর্ষণ করে তাঁর ঘাড় মটকে হত্যা করা হবে? কে দেবে এসবের জবাব? কে?