গঞ্জের ফেরিওয়ালা

মিলন বনিক

রবিবার , ১১ আগস্ট, ২০১৯ at ৯:২৫ পূর্বাহ্ণ
40

গঞ্জের হাট থেকে ফিরছিল নিধু গোয়ালা।
অনেক রাত হয়েছে। শুক্লপক্ষের দ্বাদশীর চাঁদ উঠেছে আকাশে। তার আলোয় ঘড়ির কাটাটা দেখে নিল নিধু। সোয়া এগারটা বাজে। এমন রাত প্রায়ই হয়। গঞ্জের দু’একটা হোটেল আর কয়েকটা বাসায় দুধ দিয়ে হিসাব নিকাশ শেষ করে বাড়ি ফিরতে হয়। মাঝে মাঝে রাত বারোটা বেজে যায়। তাতে কিছু যায় আসে না। অভ্যাস হয়ে গেছে।
অনেক বছরের পুরানো ব্যবসা। বাপ ঠাকুরদার আমলের। এখনও চলছে। এখন সংসার বড় হয়েছে। পাশাপাশি কিছু বর্গা জমি চাষ করে কোনোভাবে চলছে সংসারটা। সংসারের প্রয়োজনটা খুব বেশি। এখানে কর্তার কর্মই হলো কেবল কিছু দিয়ে যাওয়া। সে যেভাবেই হোক। জীবন যাক আর থাক্‌। তাতে কারও কিছু যায় আসে না। তার জন্য মাথাব্যথা খুব কম লোকের থাকে।
স্যাঁত সকালে নিধু বেরিয়ে যায়। কাঁধে বাঁশের বক আর দুটো পিতলের খালি কলসি। গ্রামের মিয়া বাজারে নিধু প্রথম কাষ্টমার। হরির দোকানে আয়েস করে বসে। তৃপ্তি ভরে গরম পরোটা আর চা খায়। তারপর একটা বিড়ি জ্বালিয়ে বেরিয়ে পরে। এ পাড়া ও পাড়া, এ বাড়ি ও বাড়ি করে দুপুর গড়িয়ে যায়। কলসির মুখে লাগানো থাকে এক পোয়া ওজনের একটি নারকেলের মালা। তাতে সারাক্ষণ কাঁচা দুধের গন্ধ লেগে থাকে। বাড়িতে ঢোকার সময় মালাটা কলসীর গায়ে টুং টুং করে টুকে লম্বা হাঁক দেয়- বাইচ্ছা ছাড়ো— বা— ই– চ্ছা , গেরস্থ বুঝতে পারে গোয়ালা এসেছে। বাছুর ছেড়ে দিয়ে কেউ কেউ দাঁড়িয়ে থাকে। নিধু বাছুরের মুখটা জোড় করে টেনে টেনে বাটগুলো ফেনিয়ে নেই। বাছুরটা মুখ তুলতেই চায় না। সন্ধ্যার পর থেকে সারারাত মায়ের দুধ খেতে পারেনি। ওলানে দুধ আসলে বাছুরটাকে মায়ের কাছ থেকে সামান্য দূরে বেঁধে রাখে। বোবা প্রাণী। বার কয়েক হাম্বা হাম্বা করে প্রতিবাদ করে। নিধু সে ভাষা বুঝে। প্রতিবাদের ভাষা। নিধু কতদিন ভেবেছে কোন মায়ের সামনে যদি এভাবে তার শিশুটিকে বঞ্চিত করা হতো?
ও টুকুতেই শেষ। দুধ না বেঁচলে খাবো কী? নিধু নিজেকে সান্তনা দেয়। যখন বড় দীঘির পানি নিয়ে তাতে গরুর দুধ আর নরেনের দোকানের বস্তার গুড়ো দুধ মিশিয়ে গঞ্জের পথে নিয়ে যায় তখন কতবার নিজেকে অপরাধী মনে হয়েছে। গরুর দুধের সাথে দীঘির জল মিশিয়ে খাঁটি গরুর দুধ হিসাবে চালিয়ে নিচ্ছে। শহরের লোকগুলো কি বোকা! এই সামান্য চালাকিটা ধরতে পারেনা। এতে নিধুর আত্মবিশ্বাসটা আরও বেড়ে যায়।
ঝর্ণা হোটেল থেকে বের হতেই লোকটাকে দেখে কেমন সন্দেহ হয় নিধুর। নিধু বুক পকেট থেকে টাকাটা সরিয়ে রাখে জাঙ্গিয়ার পকেটে। লোকটা মৃদু হাসছে। কেমন অর্থ-বোধক হাসি। সন্দেহ বাতিকগ্রস্থ লোকেরা যেমন হাসে। নিধু আরেকবার ভালো করে দেখে নিল লোকটাকে। কালো ছিপছিপে গড়ন। মাথার চুল কোঁকড়ানো। কান দুটো একটু অস্বাভাবিক রকমের লম্বা। চ্যাপ্টা নাক। ধবধবে সাদা দাঁত। নীচের পাটির সামনের দুটো দাঁত নেই। ভয়ার্ত চোখ দুটো যেন মুহূর্তেই নৃশংস হয়ে উঠতে পারে।
পরনে সাদা পাঞ্জাবী আর লুঙ্গি। লিকলিকে পায়ের পাতা দুটো কুলার মত চ্যাপ্টা। হাতের পাঁচটি আঙ্গুল ঝানু পর্যন্ত নেমে এসেছে। দূর থেকে দেখলে ক্ষুধার্ত বলে মনে হয়। কিন্তু চেহারাটা এত বিভৎস কেন? এত কুৎসিত চেহারার মানুষ থাকতে পারে ? নিধু এর আগে কখনও দেখেনি। এই প্রথম দেখেছে।
নিধু সাবধানে পথ চলছে। লোকটা তার পিছু নিয়েছে। নিশ্চয়ই কোন কুমতলব আছে। দুধ বিক্রির টাকাটায় বুঝি হাতিয়ে নেবে। নিধু মনে মনে সাহসী হতে চেষ্টা করে। জন্ম যখন নিয়েছি মরতে তো হবেই। শাালাকে সাথে নিয়েই মরব। এই রইলো কাঁধের উপর বক। বেশি তেড়ি মেরি করলে এক বারিতে শালাকে কাৎ করে দেব। এই বয়সে কত চোর চ্যাঁচড়া দেখলাম। আর কিনা এই লোকটা এসেছে চোরের উপর বাটপারি করতে।
রাত বাড়ছে। সাথে নিধুর ভয়ও বাড়ে। এই লোকটাকে বড় ভয়। মনে হচ্ছিল এই লোকটা সামনে এসে দাড়ালেই নিধু হার্টফেল করবে। এমন ভয় নিধু কখনও পায়নি। সে ভয় পাবার লোকও নয়। আজ তিরিশ বছর এ লাইনে। অনেক সময় কত রাত হয়েছে বাড়ি ফিরতে। কখনও গায়ে কাটাও দেয়নি। কিন্তু আজ এত ভয় লাগছে কেন। নিজের মনে ভয়টা ভীষণ তাড়া করছে।
শিমূলতলা।
নিধু বাস থেকে নেমে পরে। এখান থেকে ডানে বায়ে পল্লী গ্রামের রাস্তা। দেড় মাইল পথ পায়ে হেঁটে তারপর নন্দীপুর গ্রাম। গ্রামের শেষ প্রান্তে ছোট নদী। নদীর পাড়ে নিধুর ঘর। নিধু ভয়ে ভয়ে পা ফেলছে। মনে হচ্ছে ছায়ার মত কে যেন পিছু পিছু আসছে। দেখা যাচ্ছে না। তবে খুব কাছে থেকে কার শরীরের যেন নিঃশ্বাস পাচ্ছে। খুব বড় নিঃশ্বাস। শন শন বাতাসের বেগে সেই তপ্ত নিঃশ্বাস নিধুর কান ঘেষে চলে যাচ্ছে। নিধু পিছু ফিরছে না। তাতে নাকি ভয় আরও বাড়ে। তাছাড়া এসব প্রেতাত্মারা পিছু ফিরলেই কষে একটা চড় মারে। তাতে মানুষ অজ্ঞান হয়ে মারা যায়।
হাতের মধ্যে বিড়ির আগুনটা সমানে জ্বলছে। একের পর এক বিড়ি জ্বালাচ্ছে। আর লম্বা লম্বা টান দিচ্ছে। সেই শিমূলতলা থেকে জ্বালিয়ে রেখেছে বিড়িটা। আগুন আর লৌহা থাকলেও নাকি ভূতেরা কাছে আসতে পারেনা। নিধুর সে বিশ্বাস আছে। তাই কিছুটা ভরসা। কাঁধে ঝুলানো কলসী গুলোর মধ্যে ইচ্ছে করে একটা শব্দ তৈরী করে। ঝিক্‌…ঝিক্‌…ঝিক্‌…ঝিক্‌…শব্দ হচ্ছে পায়ের ছন্দে ছন্দে।
সন্ধ্যার পরে রাস্তাটা নির্জন। কোন জনমানব থাকেনা। সন্ধ্যার পর ভয়ে এই রাস্তা দিয়ে লোকজন খুব একটা আসেনা। অথচ নিধুকে প্রতিদিন আসতে হয় অনেক রাত করে। চারদিকটা কেমন নির্জন, নিস্তব্দ। ভূতুড়ে পরিবেশ। চারপাশে ঝোপ ঝাড়। কেউ বুঝি আড়ালে ওৎ পেতে বসে আছে। এখনি ঝাপটে ধরবে।
মেঘলা আকাশ। চাঁদের আলোটা ম্লান হয়ে আছে। গাছগুলোর ছায়া পরেছে রাস্তার উপর। আলো আঁধারীর এই রাত্রিতে ভয়টা আরও যেন বেশি করে লাগছে। সামনের পথটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। আঁধারের একটা নিজস্ব আলো আছে। সে আলোয় কিছুক্ষণ হাঁটলে খোলা রাস্তা ঠাঁহর করা যায়।
দুপাশে গভীর জঙ্গল। এখানে আঁধারের নিজস্ব আলো হারিয়ে গেছে। অমাবস্যার জমকালো আঁধারের মতোই মনে হচ্ছে। নিজের হাতও দেখা যায় না। দিনের বেলায়ও কেমন ছায়া জমে থাকে সারাক্ষণ। এক সময় পঞ্চানন বাবুদের বড় বাড়ি ছিল। পুকুর পাড়ে ছিল এ বাড়ির শ্মশান। এখন এ বাড়িতে কেউ নেয়। কেবল ঝোপ ঝাড়। জংলা পুকুরটাকে এখন আর পুকুর বলেই মনে হয় না। জায়গাটা ভীষণ ভয়ংকর। গভীর রাত হলে এক পাল মোষ নামে রাস্তায়। অবিকল মানুষের মত চিৎকার করে। আনন্দ ফুর্তি করে। হেসে খেলে সারাটারাত কাটিয়ে দেয়। তারপর সমস্ত মোষগুলো একত্রে পুকুরে নামে। ঝপাৎ ঝপাৎ শব্দ হয়। দূর থেকে শোনা যায় সে শব্দ। মানুষের মত হাসির শব্দ হয়। ভূতুড়ে বাড়িটা আনন্দে মেতে উঠে। ওরা মানুষের কোন ক্ষতি করে না। শুধু নীরবে চলে আসতে হয়। ভয়ে চিৎকার দিলে ওরা তেড়ে এসে ঝাপটে ধরে। তারপর সে মানুষটাকে আর পাওয়া যায় না। দুদিন পর সেই পুকুরের জলে ভাসতে দেখা যায়।
ঘটনাটা বলেছিল নিধুর বাবা। রাত করে বাড়ি ফিরছিল। দেখল একপাল মোষ পথে নেমে মানুষের মত চিৎকার করছে। নিধুর বাবা ভূত তাড়াবার ফন্দি জানত। পেশাব করে তাতে রাস্তার ধুলো মিশিয়ে বাম হাত দিয়ে ছিটাতে ছিটাতে নীরবে চলে এসেছিল। মোষের দল কোন ক্ষতি করতে পারেনি। বাড়ি ফিরে জ্ঞান হারাল নিধুর বাবা। জ্ঞান ফেরার পর চিৎকার করে বলেছিল-ঐ তো মোষ আসছে। তারপর আবার অজ্ঞান।
নিধুর এই মুহূর্তে সেই কথা মনে হলো। ভয়ে শরীর শিউড়ে উঠল। পেছনে কার পায়ের শব্দ শোনা গেল। নিধু তাকিয়ে দেখল একটা ছায়া মূর্তি দ্রুতপায়ে এগিয়ে আসছে। অবিকল সেই মানুষটার মত। সারা শরীর সাদা। যাকে নিধু ঝর্ণা হোটেলের সামনে দেখেছিল। লোকটার কথা ভুলেই গিয়েছিল নিধু। তাছাড়া এতদূরতো আসার কথা নয়। ভাবলো অন্য কেউ হবে হয়তো। দাঁড়ালে কেমন হয়? একজন সঙ্গী হলে মন্দ কী? গল্প করতে করতে এক সঙ্গে যাওয়া যাবে।

আস্তে আস্তে নিধুর পা চলছে। ছায়ামূর্তি দ্রুত এগুচ্ছে বটে, কিন্তু দুরত্ব কমছে না। নিধুর ভয় হয়। ভীষণ ভয়। সর্বাঙ্গ যেন হিম হয়ে আসছে। ধীরে ধীরে জঙ্গলের কাছাকাছি এসে পরে নিধু। খালি কলসীগুলোতে জোড়ে একটা ঝাঁকুনি দেয়। শব্দ তরঙ্গ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। অন্যদিন দুই ব্যাটারীর এভারিটি টর্চটা সাথে থাকে। আজ সেটাও আনার কথা ভূলে গেছে। বউয়ের ওপর খুব রাগ হলো। আসার সময় এটা নাই, ওটা নাই, অনেক কিছু বলল। লম্বা একটা ফর্দ দিল। অথচ মনে করে টর্চটা হাতে দিতে পারল না। পুরুষ মানুষের এসব কতক্ষণ মনে থাকে?
রাস্তার উপড় দুটো চোখ জ্বল জ্বল করছে। তীক্ষ দৃষ্টি। নিধুর চোখ পড়ল। নাহ্‌! মোষের চোখতো এভাবে জ্বলে না। কুকুর বিড়ালের চোখ হবে হয়তো। নিধুর গলাটা শুকিয়ে গেছে। জিহ্বা চেটে গলাটা ভিজাতে চেষ্টা করলো। ফল হলো না। শুকনো কাপড়ে হাত মোছার মতোই খস খস শব্দ হলো। ঝনাৎ করে কলসীর শব্দ হতেই তীক্ষ চোখ দুটো নিধুর দিকে ভোঁ দৌড় দিল। নিধু গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিতে চেষ্টা করল। কোন শব্দ বের হলো না। প্যারালাইসিস রোগীর মত শুধু মুখটা কয়েকবার নাড়ল।
– কোথায় যাবেন? পেছন থেকে অশরীরি কেউ জিজ্ঞাসা করল।
লোকটা এত দূরত্ব ডিঙ্গিয়ে দু’পায়ে এসে দাঁড়িয়েছে নিধুর পাশে। লোকটির গলার স্বর অন্যরকম। সাধারন মানুষের মত নয়। গলায় শ্লেষ্মা জড়ানো। গড় গড় করছে। অন্ধকারে লোকটির কিছুই দেখা যাচ্ছে না। নিধু লক্ষ্য করছে এসব। লোকটাকে দেখার চেষ্টা করল আড়চোখে। নিধুর শরীর কাঁপছে। নিজের কথাটা নিজে শুনতে পাচ্ছে না। শরীরের স্পন্দন আছে কি নেই তাও বিশ্বাস হচ্ছে না। বিড় বিড় করে জবাব দিল-সামনে।
– ভয় পেয়েছেন বুঝি ?
– না —- না—–, আমি পে—রা—য়—ই —- যায়।
নিধুর দাঁতে দাঁত লেগে যাচ্ছে। শত চেষ্টা করেও চোয়াল দুটোকে ফাঁক করা যাচ্ছে না। নিধুর মনে হলো লোকটির পা দুটো অনেক লম্বা। মাথাটা অনেক ওপরে। নিধুর দু’পাশে দুটি পা লিক লিক করে চলছে। দু’পায়ের মাঝখানে নিধু। অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটা প্রাণী। লোকটির বিশাল দেহ। পর্বতের মত। বিশ্রি একটা গন্ধ আসছে নাকে। লোকটি অশরীরি কেউ। ছায়ার মত সাথে সাথে চলছে। নিধু নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল। ভাবতে চাইল সব মনের ভয়। মনের ভয়টা বনের বাঘের চেয়েও বেশি। জিজ্ঞাসা করল-
– তুমি কে ? কোথায় যাবে ?
– পূর্ব পাড়া। বলরামের বাড়ি। আহা বেচারা, মারা গেল গত বছর। বড় ভালো লোক ছিল। শুনেছি এই জায়গাটাই নাকি মারা গিয়েছিল। শুনেছি এখানে ভূতের ভয় আছে। আমারও ভয় করছে। ভাগ্য ভালো। আপনার সাথে দেখা হয়ে গেল।
নিধু বাহ্যিক জ্ঞানশূন্য। বলরামের কথা শুনে শেষবারের মত ইষ্টনাম মুখে এল। একটু পানি পেলে যেন শেষ ইচ্ছাটা পূর্ণ হয়। গত বছর এইখানে বলরাম মারা গিয়েছিল। তার লাশ পাওয়া গিয়েছিল দু’দিন পর জংলা পুকরটাতে। সারা শরীরে হিংস্র নখের আঁচড়। নিধু দেখেছে বলরামকে। বলরামের মত নিজের একটা ক্ষত বিক্ষত ছবি ভেসে উঠল চোখের সামনে।
জঙ্গলটার প্রায় শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছেছে ওরা। সামনে চাঁদের আলো পরেছে রাস্তায় । চোখের পলকেই লোকটা সরে গেল। সামনে দেখল বিরাট লম্বা একটা লোক বাম দিকে চলে যাচ্ছে। অবিকল সেই ঝর্ণা হোটেলের পাশে দেখা লোকটির মত। কিন্তু লোকটা ওদিকে যাচ্ছে কেন? বলরামের বাড়ি তো ওদিকে নয়। নিধু খেয়াল করল লোকটির মাটিতে কোন ছায়া নেই। অনেকদূর এগিয়ে এসেছে নিধু। সামনের কবরস্থানটা পেরুলেই বাড়ি। নিধু যেন পথ হারাল। নিজের বাড়ির পথ চিনতে পারছে না। ভিড় ভিড় করে কাউকে যেন জিজ্ঞাসা করল-আমি কোনদিকে যাবো। আমাকে একটু নিয়ে যাবে?
নির্জন রাস্তা। মেঘলা আকাশ। চাঁদ ঢাকা পরেছে আড়ালে। আলো আঁধারীর লুকোচুরি চলছে রাস্তার উপর। গাছের ছায়ায়, পাতায় পাতায়। সামনেই কবরস্থান। কবরস্থান থেকে কে যেন হাত নেড়ে ডাকছে নিধুকে।
নিধুর শেষ রক্ষা হলো না। বাঁচাও বলে পাথরের মত নিশ্চল দেহটা রাস্তার উপর লুটিয়ে পড়ল। ঝন্‌ ঝন্‌ শব্দ হলো। দুধের কলসিগুলো রাস্তার উপর গড়িয়ে পড়লো। পেতলের কলসীগুলো হালকা চাঁদের আলোয় চিক চিক করছে। কে বা কারা নিধুকে বাড়ি নিয়ে এসেছে। বৈদ্য এলো। সারা পাড়ায় হৈ চৈ পরে গেছে। নিধুকে ভূতে ধরেছে। কালনিয়ারী ভূত। তাল গাছ থেকে খুব জোড়ে চড় মেরেছে। মুখটাও বাঁকা হয়ে গেছে। অনবরত মুখ দিয়ে ফেনা বেরুচ্ছে। মানুষ ছুটছে নিধুকে দেখার জন্য। নিধুর জ্ঞান ফিরেনি। নিধুকে রাখা হয়েছে আলাদা ঘরে। মশারীর ভিতর। কেউ ভিতরে যেতে পারছে না। নিরঞ্জন বৈদ্য বারণ করে দিয়েছে।
অনর্গল মন্ত্র পড়ছে বৈদ্য। হাতের কাঁচা অশ্বথের গোঁছা দিয়ে সমানে আঘাত করছে নিধুর শরীরে। তাতে ফল হচ্ছে না। ঘরের ভিতর গুম গুম শব্দ হচ্ছে। কাকে যেন বিশ্রি ভাষায় গালি গালাজ করছে। ফরমায়েশ করছে- কালি জিরা দে। এক স্রোতি খালের পানি দে। সরিষার তেল দে। আগুন দে আগুন, কালনিয়ারীর মুখে দেবো। মুখে, হুম—।
নিধুর হতবিহ্বল বউ দরজার ফাঁক দিয়ে সবকিছু এগিয়ে দিচ্ছে।
আধ মণ দুধ দিয়ে নিধুকে স্নান করানো হয়েছে সকালে। চারিদিকে আগুন জ্বালিয়ে ধূপের ধোঁয়া দেওয়া হচ্ছে। দরজা জানালা বন্ধ। সারা ঘর অন্ধকার। দম নেওয়া যাচ্ছে না। বাইরে মানুষের ঢল। ধূপের আগুনে পোড়ানো হচ্ছে কালিজিরা। ফড় ফড় শব্দ হচ্ছে। সারা ঘরটা যেন একবার কেঁপে উঠল। বৈদ্য হুংকার দিল। এসেছে— ঐ তো এসেছে। কলতলায় জামগাছের ওপর বসেছে কালনিয়ারী। সবাই পথ ছেড়ে দে। পথ ছেড়ে দে। আমি বাণ মেরে দিচ্ছি। আর যাবে কোথায়।
নিধুর জ্ঞান ফিরল ছব্বিশ ঘন্টা পর। ভয়ে ভয়ে একবার চারদিকটা তাকিয়ে দেখল। চেহারাটা ভীবৎস হয়ে গেছে। ধোঁয়ায় চোখ দুটো টকটকে লাল। চিৎকার করে উঠল নিধু। ঐ তো আসছে। আমাকে ডাকছে। আমি যাবো না। না না আমি যাবো না বলেই আবার অজ্ঞান হয়ে গেল।
নিধু তুই জেগে উঠ। কোনো ভয় নেই। আমিতো আছি। তোর কিচ্ছু হবে না। আমাকে সব খুলে বল। আমি তিল পড়া দিয়েছি। শক্ত ব্যবস্থা করেছি। কালনিয়ারীকে ঐ জাম গাছে আমি বন্দী করে রেখেছি। বেশ গর্বের সাথে অভয় দিল নিরঞ্জন বৈদ্য। নিধুর সাড়া নেই। বৈদ্য আবারও মন্ত্র পড়ল। একটা কাঁসার মধ্যে ঢং ঢং শব্দ তুলে কিছুক্ষণ বাজাল। নিধু চোখ মেলে তাকায়। ভীষণ ভয় করছে। আর বলছে-আমি বলবো না। আমার ভয় করছে। ঐ লোকটা বার বার আমাকে ডাকছে। আমি যাবো না।
নিরঞ্জন বৈদ্য সাহস দেয়। কোনো ভয় নেই। ভূত পেরেত কিছুই নেই। সব বন্দী করে রেখেছি। তুই সব খুলে বল। আমিতো আছি। ঘরটা ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। একটা মাত্র হারিকেন জ্বলছে মিট মিট করে। নিধু হারিকেনটা নিজের সামনে রাখে। একটা হাতে হারিকেনটা ছুঁয়ে আছে। খুব আস্তে আস্তে বলল-
কাল রাতে বাড়ি ফিরছিলাম। তালতলার মোড়ে খুব ভয় হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল কে একজন আমার পিছু নিয়েছে। আমাকে জিজ্ঞাসাও করল-ভয় পেয়েছি কিনা, কোথায় যাবো। লোকটা অশরীরি কেউ। তবুও সাহস হারায়নি।
নিধু কিছুক্ষণ থামল। সারা শরীর কাঁপছে ভয়ে।
– বল, তারপর ?
– জঙ্গলটা ফেলে আসতেই আমার আগে একটা ছায়ামূর্তি অদৃশ্য হলো। আমার ভয় আরও বেড়ে গেল। কবর স্থানের কাছে আসতেই—, নিধু আর বলতে পারছে না। দু’হাতে নিধুকে ধরে রেখেছে নিরঞ্জন বৈদ্য। বলল, তারপর..
– নিধু চারদিকে তাকিয়ে বলে, দেখলাম কবর স্থানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে একজন লোক আমাকে ডাকছে। অনেক লম্বা লোকটি। সারা শরীর সাদা কাপড়ে ঢাকা। নুইয়ে নুইয়ে দুলছিল। কাছাকাছি আসতেই আমি রাস্তার উপর পরে গেলাম।
– নিরঞ্জন বৈদ্য আশ্বাস দিল। ঠিক আছে। আগে কিছু খেয়ে নে। দু’দিন খাওয়া হয়নি। তারপর অন্য ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পর। যা হবার কাল সকালে হবে। আর কোন ভয় নেয়।
পরদিন নিধু অনেকটা সুস্থ। বাড়িতে বসে থাকার লোক নিধু নয়। দুধের ভাড় কাঁধে নিয়ে বেড়িয়ে পরল এ বাড়ি ও বাড়ি। ভাবল শহরে গিয়ে আর কখনও রাত করে ফিরবে না। বাজারে গিয়ে খবর পেল-নিধুর বাল্যবন্ধু মুন্সি মিয়া মারা গেছে। দুপুরে নিধু ছুটল গঞ্জের পথে। সে জানেনা কতক্ষণে ফেরা হবে।
কবর স্থানের পাশে যেতেই নিধু শিউড়ে উঠল। তাকিয়ে দেখল-মুন্সি মিয়ার সদ্য কবরের উপর সাদা কাপড়ে মোড়ানো একটা শুকনো লম্বা খেজুর পাতা বাতাসে দুলছে। দূর থেকে মনে হয়-যেন কাউকে ডাকছে।

x