খোলা জাহাজেই কয়লা পরিবহন

নিয়ম মানছে না চীনা লাইটারেজ চট্টগ্রাম বন্দরে ঝুঁকি

হাসান আকবর

মঙ্গলবার , ১৯ নভেম্বর, ২০১৯ at ৩:৪১ পূর্বাহ্ণ
376

কোনো ধরনের অনুমোদন না নিয়ে এবং প্রচলিত নিয়ম-নীতির কোনো তোয়াক্কা না করেই চীনের ‘ওপেন হ্যাজ ভ্যাসেল’ চট্টগ্রামে চলাচল করছে। খোলা হ্যাজের এসব জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেলসহ বহির্নোঙরে বড় ধরনের ঝুঁকির সৃষ্টি করছে। শুধুমাত্র উন্নয়ন প্রকল্পের বড় বড় ইক্যুইপমেন্ট পরিবহনের জন্য অনুমতি পাওয়া লাইটারেজ জাহাজ ক্যাটাগরির এই ভ্যাসেলগুলো উন্মুক্ত অবস্থায় কয়লাসহ বিভিন্ন ধরনের মালামাল পরিবহন করছে। জাহাজগুলো চট্টগ্রামে বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
সূত্র বলছে, বিশ্বের নানা দেশ থেকে আসা ভোগ্য পণ্যসহ বিভিন্ন ধরনের লাখ লাখ টন পণ্য নিয়ে আসা বড় বড় মাদার ভ্যাসেলগুলো বন্দরের জেটিতে ভিড়তে পারে না। এসব জাহাজ থেকে লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে পণ্য খালাস করে কর্ণফুলী নদীর ১৬টি ঘাটের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রেরণ করা হয়। এছাড়া চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা নারায়ণগঞ্জ নোয়াপাড়াসহ দেশের অন্তত পঁচিশটি গন্তব্যে লাইটারেজ জাহাজ চলাচল করে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য পরিবহনে প্রায় দেড় হাজার লাইটারেজ জাহাজ রয়েছে। ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল লাইটারেজ জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে। প্রতিদিন বার্থিং সভা করে ডব্লিউটিসি মাদার ভ্যাসেলের বিপরীতে চাহিদানুযায়ী লাইটারেজ জাহাজ বরাদ্দ দেয়। যেগুলো বহির্নোঙরে গিয়ে মাদার ভ্যাসেল থেকে পণ্য খালাস করে। পণ্য বোঝাই করে এসব জাহাজ বন্দর চ্যানেলের ১৬টি ঘাটে পণ্য নিয়ে আসে। এছাড়া বহির্নোঙর থেকেও পণ্য নিয়ে সন্দ্বীপ চ্যানেল হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে রওয়ানা দেয়।
জানা যায়, দেশের দেড় হাজারের মতো লাইটারেজ জাহাজের ধারণক্ষমতা গড়ে এক হাজার থেকে চার হাজার টন পর্যন্ত। এসব জাহাজের মধ্যে এক হাজার বারোশ’ টন ধারণক্ষমতার জাহাজগুলোতে দুটি হ্যাজ এবং বড় জাহাজগুলোতে তিনটি হ্যাজ থাকে। প্রতিটি হ্যাজের কাভার রয়েছে। পণ্য বোঝাই করার পর হ্যাজের কাভার দিয়ে বন্ধ করে দিলে সেখানে পানি প্রবেশের কোনো সুযোগ থাকে না। ঝড় বাদলের মধ্যে জাহাজের ব্যালেন্স নষ্ট হয় না। কিন্তু গত কিছুদিন ধরে চট্টগ্রাম বন্দরে লাইটারেজ জাহাজের আদলে বড়বড় নৌযান চলাচল শুরু হয়েছে। কোনো ধরনের অনুমোদন ছাড়া জাহাজগুলো
পণ্য পরিবহন করছে। চীনের কয়েকজন নাগরিক চীন থেকে বিভিন্ন প্রকল্পের নামে কয়েকটি লাইটারেজ জাহাজ চট্টগ্রামে আনেন। এগুলো ওই প্রকল্পের ইক্যুইপমেন্ট পরিবহনের জন্যই সাময়িকভাবে চলাচলের অনুমোদনপ্রাপ্ত। এগুলোর কোনো হ্যাজ নেই। নেই কোনো কাভারও। পুরো খোলা এসব জাহাজ বাংলাদেশে অতীতে কোনোদিন চলাচল করেনি। চীনের বিভিন্ন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের হাতে বাস্তবায়নাধীন বিভিন্ন প্রকল্পের নামে আনা এসব জাহাজ ইক্যুইপমেন্ট সরবরাহ দেয়ার পর এখন চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য পরিবহন শুরু করেছে।
ডব্লিউটিসি, পরিবেশ অধিদপ্তর, নৌবাণিজ্য অধিদপ্তরসহ কোনো সংস্থারই কোনো ধরনের অনুমোদন না নিয়ে জাহাজগুলো ব্যক্তিগতভাবে আমদানিকৃত মালামাল পরিবহন করছে। এমভি লুয়া-১ এবং এমভি লুয়া-২ নামের দুটি উন্মুক্ত জাহাজ বিশ্বাস ট্রেডার্স নামের একটি কোম্পানির আমদানিকৃত কয়লা পরিবহন করতে দেখা গেছে। বহির্নোঙরে অবস্থানকারী এমভি রাফেল নামের একটি মাদার ভ্যাসেল থেকে জাহাজগুলো কয়লা বোঝাই করে। বিসমিল্লাহ নেভিগেশন নামের একটি কোম্পানি জাহাজগুলো পরিচালনা করছে বলে সূত্র জানিয়েছে। এগুলো পুরোপুরি উন্মুক্ত হওয়ায় বৃষ্টির পানি কিংবা কোনো ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে বড় ধরনের দুর্ঘটনার কবলে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অতি ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করা এসব জাহাজ ডুবলে চট্টগ্রাম বন্দর বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে।
বিষয়টি নিয়ে গতকাল ডব্লিউটিসির একজন কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এ ধরনের জাহাজ পরিচালনার কোনো সুযোগ নেই। এগুলো বন্দরে সাধারণ আমদানিকারকের পণ্য পরিবহনের কোনো অনুমোদন নেই। অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণভাবে কাউকে পাত্তা না দিয়ে চীনা কোম্পানির মালিকানাধীন জাহাজগুলো পরিচালনা করা হচ্ছে। চীনের একজন নাগরিক দেশিয় কয়েকজন ব্যবসায়ীর সহযোগিতায় অবৈধভাবে জাহাজগুলো পরিচালনা করছে বলে ডব্লিউটিসির ওই কর্মকর্তা জানান। এসব জাহাজ পরিচালনার জন্য ডব্লিউটিসি থেকে কোনো ধরনের অনুমোদন বা বরাদ্দ দেয়া হয়নি বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা জানান।
বার্থ অপারেটরস এন্ড শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরস এসোসিয়েশনের একজন কর্মকর্তা বলেন, এগুলো নির্দিষ্ট প্রজেক্টের নামে আনা হয়েছে। ওই প্রজেক্টেরই ইকুইপমেন্ট পরিবহন করার কথা। কিন্তু তা না করে এগুলো অন্যান্য পণ্য পরিবহন করছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলেন, উন্মুক্তভাবে কয়লা পরিবহন পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। আমরা বিষয়টি জানতাম না। অবশ্যই খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে। নৌবাণিজ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে এগুলোকে পণ্য পরিবহনের জন্য কোনো ধরনের অনুমোদন দেয়া হয়নি। তবে খোলা অবস্থায় পণ্য পরিবহন করার বিষয়টি তাদের অজানা বলে উল্লেখ করে জানায়, খোঁজখবর নিয়ে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

x