খোকা হয়ে ওঠেন বাঙালির জাতির পিতা

সৈয়দা রিফাত আকতার নিশু

রবিবার , ১৭ মার্চ, ২০১৯ at ৭:০০ পূর্বাহ্ণ

ফরিদপুর জেলার মধুমতি আর ঘাগোর নদীর তীরে হাওড় – বাওড়ের মিলনে গড়ে ওঠা প্রকৃতির অপার মহিমায় পরিবেষ্টিত একটি গ্রাম। নাম তার টুঙ্গিপাড়া। এই গ্রামে সারি সারি গাছ, নদীতে বড় বড় পালতোলা পানশি, কোয়া নৌকা, লঞ্চ ও স্টিমারের সমারোহ। বর্ষাকালে দেখলে মনে হত শিল্পীর তুলিতে আঁকা মনোমুগ্ধকর একটি ছবি। এইরকম স্বপ্নময় পরিবেশে পরিবেষ্টিত টুঙ্গিপাড়ারই একটি বনেদী পরিবারের নাম শেখ পরিবার। দিনটি ছিল রবিবার। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ শেখ লুৎফর রহমান ও সায়রা খাতুনের তৃতীয় সন্তান জন্ম নেয়। বাবা মা আদর করে নাম রাখেন খোকা। এই খোকাই ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন বাঙালির অহংকার -জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
টুঙ্গিপাড়া গ্রামেই তিনি ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা শস্য শ্যামলা রূপালী বাংলাকে দেখেছেন। আবহমান বাংলার আলো – বাতাসে লালিত ও বর্ধিত হয়েছেন। দোয়েল ও বাবুই পাখি ছিল তার ভীষণ প্রিয়। বাড়িতে শালিক ও ময়না পুষতেন। বানর ও কুকুর পুষতেন বোনদের নিয়ে। পাখি আর জীবজন্তুর প্রতি ছিল গভীর মমতা। নদীতে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতার কাটতেন। ফুটবল ছিল তার প্রিয় খেলা। শৈশব তার এভাবেই কেটেছে গ্রামের মেঠোপথের ধুলোবালি আর বর্ষার কাদা পানিতে ভিজে।
শৈশব থেকেই তিনি দেখেছেন তৎকালীন সমাজ জীবনে জমিদার, তালুকদার ও মহাজনদের অত্যাচার, শোষণ ও প্রজা পীড়ন। গ্রামের হিন্দু মুসলিমদের সম্মিলিত সামাজিক আবহে তিনি দীক্ষা পান অসাম্প্রদায়িক চেতনার। আর প্রতিবেশী দরিদ্র মানুষদের দু:খ কষ্ট তাকে সারাজীবন সাধারণ দুঃখী মানুষের প্রতি অগাধ ভালবাসায় সিক্ত করে তোলে। সমাজ ও পরিবেশ তাঁকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের সংগ্রাম করতে শিখিয়েছে। তাই পরবর্তী জীবনে তিনি কখনও কোনো অপশক্তির কাছে আত্মসমর্পণ ও মাথা নত করেন নি।
বাড়ির দক্ষিণ দিকেই ছিল কাছারিঘর। এখানেই মাষ্টার, পন্ডিত ও মৌলভী সাহেবদের কাছে ছোট্ট মুজিবের হাতেখড়ি। ৭ বৎসর বয়সে তাঁকে তার পূর্বপুরুষদের গড়া গিমাডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেন তার বাবা। এরপর তিনি তার বাবার কর্মস্থল গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুরের স্কুল মাদারীপুর ইসলামিয়া হাই স্কুল, গোপালগঞ্জ সরকারি পাইলট স্কুল ও গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুলে পড়ালেখা করেন। ১৯৪২ সালে গোপালগঞ্জের মিশনারি স্কুল থেকে মেট্রিক পাস করেন। ১৯৪৪ সালে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজ থেকে আই.এ ও ১৯৪৭ সালে বি.এ পাস করেন একই কলেজ থেকে। ১৯৪৮ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। এই সময় থেকেই শুরু হয় তার রাজনৈতিক জীবনের সংগ্রামী অধ্যায়। শৈশব থেকেই তিনি খুব অধিকার সচেতন ছিলেন। অন্যায়ের প্রতিবাদ করা ছিল তার চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী হামিদ মাষ্টার ছিলেন তার গৃহশিক্ষক। তার এক স্যার তখন গরিব ও মেধাবী ছাত্রদের সাহায্য করার জন্য একটি সংগঠন করেছিলেন। শেখ মুজিব ছিলেন সেই সংগঠনের প্রধান কর্মী। বাড়ি বাড়ি ঘুরে ধান চাল সংগ্রহ করে ছাত্রদের সাহায্য করতেন। অথচ তিনি ছিলেন একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান।
ফাল্‌গুন মাসের এক দুপুরে শীতের শেষে সূর্যের তীব্র তাপদাহ চারিদিকে। এমনই সময় স্কুল থেকে বাড়ি ফিরার কথা খোকার। কিন্তু ফিরতে দেরি হচ্ছে দেখে মা হাতের কাজগুলো সেরে উঠোনের সারি সারি আমগাছের মাঝে একটু ছায়া খুঁজে সেখানে দাঁড়িয়ে খোকার ফেরার পথপানে দৃষ্টি মেলে অপেক্ষা করতে লাগলেন। হঠাৎ মা দেখলেন কে যেন হেটে আসছে। হাঁটার ধাঁচ দেখে মা বুঝতে পারলেন এ তার সবার আদরের দুলাল খোকা। কিন্তু অবাক হয়ে দেখলেন খোকার পুরো শরীর চাদরে মুড়ি দেওয়া। মা তখন এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি হয়েছে বাবা? মা খুব উদ্বিগ্ন। ছেলের ভাবলেশহীন উত্তর, কই কিছু হয়নি তো। তোমার জামা পায়জামা কই? ও এই কথা ? স্কুল থেকে ফেরার সময় দেখলাম একটি ছেলের গায়ে কোনো জামাকাপড় নেই। ছেলেটি আমারই সমান। এই শীতে ওর কাটে কি করে বলোতো মা ? তাই আমার জামাকাপড় খুলে ওকে পরিয়ে দিয়ে এসেছি। ছেলেটা কি যে খুশি হয়েছে”। মা একটু চিন্তিত হয়েছিলেন এই কান্ড দেখে। কিন্তু পরক্ষণেই গর্বে বুক ভরে গেলো মার। কত উদার হয়েছে তার ছেলেটা। এই হল বঙ্গবন্ধু । দশ বছর বয়সেই যিনি নিজের কাপড় খুলে অন্যকে দান করে দিতে পেরেছিলেন। বঙ্গবন্ধু ইতিহাসের বই পড়তে খুব ভালবাসতেন। এই কারণে গোপালগঞ্জ মিশন হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক গিরিশ চন্দ্র সহ সকল শিক্ষকের প্রিয়পাত্র ছিলেন তিনি। মাত্র ১৩ বৎসর বয়সে প্রতিবাদের এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন তিনি। ওই সময়ে গোপালগঞ্জের স্বদেশী আন্দোলনের এক সমাবেশে জনতার উপর পুলিশের নির্বিচারে লাটিচার্জ দেখে বিক্ষুব্ধ হন শিশু মুজিব। ফলে বিক্ষোভকারীরা যখন পুলিশের উপর চড়াও হয় তখন তিনিও বন্ধুদের নিয়ে তাদের সাথে যোগ দেন বিক্ষোভকারীদের দলে। পুলিশ ফাঁড়িতে শত শত ইট পাটকেল নিক্ষেপ করে তারা নাজেহাল করে তোলেন পুলিশ সদস্যদের। তার সাহস দেখে অবাক হন থানার বড় কর্তাও।
১৯৩৯ সালে অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শের এ বাংলা এ কে ফজলুল হক গোপালগঞ্জের মিশনারি স্কুল পরিদর্শনে এলেন। সাথে ছিলেন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ শহীদ সোহরাওয়ার্দী। দুই সপ্তাহ আগে থেকেই ছাত্র ছাত্রীদের বলে দেয়া হয়েছিল নির্ধারিত দিনে যেন সবাই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পোশাক পরে স্কুলে আসে। চারিদিকে সাফ সাফাই নিয়ে তটস্থ ছিলেন হেড মাষ্টার থেকে শুরু করে সবাই। যথাসময়ে মুখ্যমন্ত্রী মহোদয় স্কুল পরিদর্শন শেষ করে ডাক বাংলোর দিকে হেঁটে যাচ্ছিলেন। এমন সময় একদল ছাত্র এসে তাদের পথ আগলে দাঁড়ালো । ছাত্রদের এমন কাণ্ড দেখে হেডমাষ্টার সাহেব রীতিমত ভড়কে গেলেন। চিৎকার দিয়ে বললেন , ‘এই তোমরা কি করছ? রাস্তা ছেড়ে দাও’। এমন সময় হাল্কা পাতলা লম্বা ছিপছিপে মাথায় ঘন কালো চুল ব্যাক ব্রাশ করা খোকা গিয়ে সামনে দাঁড়ালেন একেবারে মুখ্যমন্ত্রীর সামনে। মন্ত্রী মহোদয় জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি চাও’? সাহসে ভরপুর বুক নিয়ে খোকা উত্তর দিলেন, ‘ আমরা এই স্কুলেরই ছাত্র। স্কুলের ছাদে ফাটল ধরেছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই সেখান থেকে বৃষ্টির পানি ছুঁইয়ে পরে আমাদের বই খাতা ভিজে যায়। ক্লাস করতে অসুবিধা হয়। স্কুল কর্তৃপক্ষকে বলা হলেও কোনো ফল হয়নি এ ব্যাপারে। ছাদ সংস্কারের আর্থিক সাহায্য না দিলে রাস্তা মুক্ত করা হবেনা। কিশোর ছাত্রের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব, সৎসাহস আর স্পষ্টবাদিতায় মুগ্ধ হয়ে মন্ত্রী জানতে চাইলেন, ‘ছাদ সংস্কারের জন্য কত টাকা প্রয়োজন’? সাহসী কন্ঠে খোকা জানাল, ‘বারোশত টাকা’। মন্ত্রী তখন বললেন, “ ঠিক আছে তোমরা যাও । আমি তোমাদের ছাদ সংস্কারের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করছি’। তিনি তার তহবিল থেকে উক্ত টাকা মন্‌জুর করে অবিলম্বে ছাদ সংস্কারের জন্য জেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দিলেন। এ সময় বঙ্গবন্ধু মাত্র অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। শৈশবেই তার নেতৃত্ব গুণ আর দাবি আদায়ের দৃঢ়চেতা মনোভাব ছিল। যা সকলের জন্য শিক্ষণীয়।
লেখক : সংগঠক, প্রবন্ধকার

x