খুৎবা ও জানাজা

কলম থেকে অশ্রু ঝরে - ১১

রেফায়েত ইবনে আমিন

মঙ্গলবার , ১৬ জানুয়ারি, ২০১৮ at ৬:০১ পূর্বাহ্ণ
215

ইসলাম ধর্মমতে কুসংস্কার বিশ্বাস করা একদমই উচিৎ না। আজ ১৩ জানুয়ারি, শুক্রবার। অনেক দেশে, অনেক কালচারে কুসংস্কার আছে যে, তেরো সংখ্যাটা এমনিতেই অপয়া; আর মাসের তেরো তারিখ যদি শুক্রবার পড়ে, তাহলে সেই দিনটি আরো খারাপ হবে। সত্যিকারের ঈমানদার ব্যক্তির পক্ষে এটা বা যে কোন কুসংস্কারই মানা উচিৎ না। আল্লাহ্‌ যার জন্য যেই তাকদীর রেখেছেন, তাই হবে এটাই আমাদের ঈমানের অংশ। আজ আমাদের পরিবারের জন্য এক চরম বিপর্যয়ের দিন, আমাদের প্রিয় আম্মাকে আজ আমরা চিরবিদায় জানাবো। তবুও আমি কুসংস্কারে বিশ্বাস করে বলবো না যে, শুক্রবার ও তেরো তারিখের কারণে আমাদের এই মুসিবৎ।

আজ সকালে আমাদের বাসার মহিলারা সকলে মিলে মসজিদ সা’দএ এসে আম্মাকে ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী গোসল করিয়েছে। এরপরে, আম্মার মাহ্‌রাম আত্মীয়দের শেষবারের মত মুখ দেখিয়ে কফিন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ঘড়ি ধরে সব কাজ হয়ে গেছে। আম্মাকে নিয়ে এসে মসজিদের মেইন নামাজ পড়ার হলরুমের এক পাশে রাখা হয়েছে। এটা এককালে একটা চার্চ ছিলো, ২০০৭ সালে টলিডোর মুসলিম কমিউনিটির আমরা সকলে মিলে ফান্ড তুলে চৌদ্দ একরের এই জমিসহ চার্চটা কিনে নিয়ে মসজিদ ও ফুলটাইম স্কুল করা হয়েছে। নামাজের মেইন হলে প্রায় দেড় হাজারেরও বেশি মুসুল্লী জামাতে নামাজ পড়তে পারে। সামনের দিকে পুরুষেরা আর পিছনের সারিতে মহিলারা, এক সাথেই একই হলে নামাজ পড়ে।

দুপুর একটা দশে আযান হলে পরে, মসজিদ সা’দএর ইমাম শেখ ইব্রাহীম (Sheikh Brahim Djema) খুৎবা শুরু করলেন। আলজেরীয় এই ইমামকে আমার খুবই ভালো লাগে। খুব অমায়িকভাবে কথা বলেন। আমরা ছোটবেলায় দেখে এসেছি, বাংলাদেশের প্রায় অধিকাংশ মসজিদেই খুৎবা নির্দ্দিষ্ট করা থাকে। মৌলভীদের কাছে খুৎবার বই থাকে, সেটা থেকে ওনারা আরবিতেই পুরাটা গড় গড় করে পড়ে যান। আগেকার দিনে তো খুৎবার কিছুই বুঝতাম না। গত বিশপঁচিশ বছরে, দেশের কিছু কিছু মসজিদে পরিবর্তন এসেছে। খুৎবা শুরুর আগে, তার বাংলা অনুবাদ বলে দেন, কিন্তু মূল খুৎবা আরবিতেই পড়ে যান। অন্যান্য দেশগুলোতে দেখেছি, খুৎবা, সেখানকার স্থানীয় ভাষায় দেওয়া হয়। খুৎবার কিছু অংশে আল্লাহ্‌র প্রশংসা করতে হয়, মানুষকে ভালমন্দের পার্থক্য বুঝিয়ে ইসলামের দিকে আহ্বান করতে হয়, হযরত মুহাম্মদ (.) এবং খলিফা ও সাহাবী এবং সমস্ত মুসলিমদের জন্য দোয়া করতে হয়। তবে খুৎবার মূল বক্তব্য ইমাম নিজেই নির্ধারণ করে নেন। সেটা ধর্মীয় বিষয়ও হতে পারে, বা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের যে কোন বিষয়ও হতে পারে অথবা সমসাময়িক কোন প্রসঙ্গ নিয়েও বক্তব্য হতে পারে।

যা হোক, আজকে শেখ ইব্রাহীম, পুরোটা খুৎবাই মানুষের জীবন এবং মৃত্যু নিয়ে বললেন। বেশ কয়েকবার আম্মার নাম সুন্দর করে উচ্চারণ করে ওনার জন্য দোয়া করলেন। আমাদের জীবনের মানেটা কী, কেন আল্লাহ্‌ আমাদের এই দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন, এই জীবন কত ক্ষুদ্র, কত ক্ষণস্থায়ীআধা ঘণ্টার খুৎবা শুনে শুনে মাঝে মাঝে শিউরে উঠছিলাম। একদিন তো আমাকেও যেতে হবে। ইমাম সাহেব সম্মানের সঙ্গে আমাদের আম্মাকে এমনভাবে “Our Mother” বলছিলেন, যেন ওনার অতি পরিচিত একজন পরম আত্মীয়কে হারিয়েছেন, যেন ওনার আম্মারই জানাজা আজকে, এতটাই আন্তরিকতায় ভরা সেই খুৎবা। এদিনের খুৎবাটা ইন্টারনেটে আছে, আপনারা সকলেই দেখতে পারেন এই লিঙ্কে

https://www.facebook.com/MSFToledo/videos/998392586931231খুৎবা শেষে জুম্মা নামাজ হলো, এবং তারপরে সঙ্গে সঙ্গেই জানাজার নামাজ হলো সেখানেই। আমার আন্দাজমতে সেদিন জুম্মা আর জানাজাতে প্রায় চার থেকে পাঁচশ’ জন হয়েছিলো। অনেক বাংলাদেশিই সেদিন অফিস থেকে ছুটি নিয়েছিলেন বা অর্ধেক দিন কাজ করে আম্মার জানাজায় অংশ নিতে চলে এসেছিলেন। ইউনিভার্সিটি অফ টলিডোর অনেক স্টুডেন্ট চলে এসেছে। মিশিগান থেকেও আমাদের চেনা অনেকেই চলে এসেছিলো। জানাজার জন্য, ফ্যুনারেল হোমের চাকাওয়ালা গার্নীর উপরে আম্মার কফিন নিয়ে আসা হলো সকলের সামনে। ইমাম ইব্রাহীম জানাজার নামাজ পড়ালেন মহিলাপুরুষ সকলেই অংশ নিলো। এরপরে গার্নী ঠেলে নিয়ে বাইরে অপেক্ষারত হার্সে খুবই যত্ন সহকারে তোলা হলো। চেনাঅচেনা সকলেই হাত লাগিয়ে সাহায্য করলো। অনেকেই এসে আমাদের পুরো পরিবারের সঙ্গে কথা বলে তাদের সমবেদনা জানালো। সকলের আন্তরিকতায় আমরা অভিভূত।

মসজিদের পার্কিংএ বের হয়ে আমরা যারা যারা কবরস্থানে যাবো, সেই গাড়িগুলো সব লাইন ধরে দাঁড়ালো। প্রায় তিরিশচল্লিশটার মত গাড়ি হবে। ফ্যুনারেল হোমের লোকেরা সবসময়ই আছে। তাদের প্রফেশানালিজম প্রশংসার যোগ্য। হ্যাঁ, আমরা টাকা দিয়েছি তাদের; টাকাপয়সার বিনিময়েই তারা এই সার্ভিস প্রদান করছে। কিন্তু অনেক অনেক সংবেদনশীল এই কাজ। তারা অত্যন্ত ধৈর্য্য সহকারে, সহানুভূতিসহ সব কাজ করেছে। আর বর্তমানে টলিডোর তাপমাত্রা শূণ্যের দশ ডিগ্রি নিচে, এরা তার মধ্যেই পার্কিংএ থেকে সকল কিছুর ব্যবস্থা করছে। লাইনের প্রথমেই ফ্যুনারেল হোমের লম্বা গাড়ি হার্স (hearse)-এ যত্ন করে আম্মাকে তোলা হয়েছে। রাস্তার অন্যান্য গাড়িদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য হার্সের উপরে একটা হলুদ বাতি ক্রমাগত ঘুরে ঘুরে জ্বলছে। কিছুটা পুলিশফায়ারট্রকের মত হলেও, এই বাতির রঙ হলুদ। পরিবারের একজনকে বললো হার্সে উঠতে, আমি প্রিন্স ভাইকে সেটায় তুলে দিলাম। ফ্যুনারেল হোমের লোকেরা এবারে আমাদের সকলের গাড়ির ছাদের উপরে একটা করে “Funeral” লিখা ফ্ল্যাগ লাগিয়ে দিলো। সকলে তৈরি হলে পরে, রাস্তায় আমাদের গাড়ির এই মিছিল বের হলো। অন্য সব গাড়ি সঙ্গে সঙ্গে সম্মান দেখিয়ে, থেমে, এক পাশে সরে গিয়ে আমাদের জায়গা করে দিলো। রাস্তায় পুলিশ থাকলে, তারা স্যালুট করে। এই দেশে ফুনারেল প্রসেশানকে এইভাবেই সম্মান দেখানো হয়। কার ফুনারেল? বড়লোক? না গরিব? বিখ্যাত? কোন্‌ ধর্মের মানুষ? সেগুলো কেউ চিন্তা করে না।

এভাবেই অ্যামেরিকার ওহাইহো স্টেটের, টলিডো শহরের মসজিদ সা’দ হতে শুরু হলো, বাংলাদেশের খুলনায় জন্ম নেওয়া দোরখ্‌শা আখতার ফাহ্‌মিদা খাতুনের শেষ যাত্রা। আমাদের অতি প্রিয় আম্মা, যিনি সকলের মাঝে ফাহ্‌মিদা আমিন নামেই পরিচিত।

টলিডো, ওহাইও, ২০১৭

x