‘খুনির ভাই’কে বিয়ে করতে রাজী না হওয়ায় প্রেমিকের হাতেই খুন

পেকুয়ায় বস্তাবন্দী মাদ্রাসা ছাত্রীর লাশ উদ্ধারের ঘটনায় আটক ২

পেকুয়া প্রতিনিধি

শনিবার , ২৩ নভেম্বর, ২০১৯ at ৯:৫৫ অপরাহ্ণ

‘খুনির ভাই’কে বিয়ে করতে রাজী না হওয়ায় প্রেমিকের হাতেই খুন হন পেকুয়ায় বস্তাবন্দী অবস্থায় মৃত উদ্ধার হওয়া মাদ্রাসা ছাত্রী আয়েশা বেগম।

এলাকার লোকজন, নিহতের পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য, আটককৃতদের দেয়া জবানবন্দির তথ্যমতে এমনটাই ধারণা করছে পুলিশ।

ইতিমধ্যে এ ঘটনায় পেকুয়া থানায় কথিত প্রেমিক ফারুক সহ চারজনকে আসামি করে একটি মামলা রুজু করা হয়েছে।

মামলার ২ আসামিকে আটক করা হয়েছে বলেও নিশ্চিত করেছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা।

জানা যায়, গত শুক্রবার (২২ নভেম্বর) ভোররাতে পেকুয়া উপজেলার মগনামা ইউনিয়নের ফতেহআলী মায়ের পাড়া এলাকার জামাল হোসেনের মাদ্রাসা পড়ুয়া কন্যা আয়েশা বেগমের (১৪) বস্তাবন্দী লাশ একই এলাকার বিসমিল্লাহ সড়কের পাশ থেকে উদ্ধার করে পুলিশ।

এসময় তার পরিবারের লোকজন অভিযোগ করেন, আগের দিন (২১ নভেম্বর) সকালে বইপত্র নিয়ে মাদ্রাসায় যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়ে আর ফিরে আসেনি আয়েশা। পরিবারের অভিযোগের তীরও ছিল কথিত প্রেমিক ওমর ফারুকের দিকেই।

এ সূত্র ধরে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে পেকুয়া থানা পুলিশ।

নিহত আয়েশা মগনামা মাঝিরপাড়া শাহ রশিদিয়া আলিম মাদ্রাসার ৯ম শ্রেণীর ছাত্রী ছিল।

এরপর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও কথিত প্রেমিক ফারুকের ছবি পোস্ট করে তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন অনেকেই।

পুলিশ জানায়, গত ১ বছর ধরে মেয়েটির সাথে মিয়াজি পাড়া এলাকার আনোয়ার হোসেনের পুত্র ওমর ফারুকের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক চলে আসছিল। তাদের দুই পরিবারের মৌন সম্মতিও ছিল এ বিয়েতে কিন্তু চলতি বছরের ১৭ অক্টোবরে সংঘঠিত চাঞ্চল্যকর শিশু আরাফাত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অভিযুক্ত হয়ে কথিত প্রেমিক ওমর ফারুকের সহোদর মানিক (১৯) পুলিশের হাতে আটক হয়ে জেলে গেলে তাদের প্রেমের সম্পর্কে টানাপড়েন শুরু হয়।

গত ১৮ অক্টোবর উপজেলার বারবাকিয়া ইউনিয়নের কাদিমাকাটা এলাকা থেকে ৮ বছরের শিশু আরাফাতকে অপহরণ করে মগনামায় নিয়ে আসে তার আপন খালাত ভাই রায়হান (১৫) ও তার বন্ধু মানিক (১৯)।

এরপর টেলিফোনে চাঁদা দাবি করে না পেয়ে শিশু আরাফাতকে জবাই করে হত্যা করে তারা।

পরে পুলিশ তাদের দু’জনকে আটক করে তাদের স্বীকারোক্তিমতে ওই ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের জনৈক মহিউদ্দিন মাঝির ধানক্ষেত থেকে শিশু আরাফাতের লাশ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় আসামি হয়ে মানিক বর্তমানে জেলহাজতে রয়েছে। এই আত্মস্বীকৃত খুনি মানিকের আপন ভাই বর্তমান আয়েশা খুনের অভিযুক্ত ‘কথিত প্রেমিক’ ওমর ফারুক।

এ ঘটনার পর আয়েশার পরিবার ‘খুনির ভাই’-্এর সাথে মেয়ের বিয়ে দিবেন না বলে সাফ জানিয়ে দেয় ফারুকের পরিবারকে। এতে ক্ষিপ্ত হয়েই প্রতিশোধ নিতে মরিয়া হয়ে উঠে ফারুক।

ঘটনার দিন আয়েশাকে ফুসলিয়ে চাচার বাড়িতে নিয়ে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে কান কেটে, চোখ উপড়ে খুন করে গভীর রাতে বস্তাবন্দী করে রাস্তার পাশে লাশ ফেলে যায় ফারুক।

পুলিশের ধারণা, খুনী এ ‘হত্যাকাণ্ড’ সহযোগীদের সহায়তায় সংঘঠিত করে দীর্ঘসময় ধরে।

এদিকে আটককৃতরা ‘আয়েশা আত্মহত্যা করেছে’ বলেও তথ্য দিয়েছে পুলিশের কাছে।

পুলিশ সে বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত কাজ চালাচ্ছে বলে জানায়।

এটি ‘হত্যা’ না ‘আত্মহত্যা’ সেই বিষয়টি আয়েশার পোস্টমর্টেম রিপোর্টে নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানায় পুলিশ।

তবে পুলিশ বলছে, ‘প্রেমঘটিত কারণেই’ এ হত্যাকাণ্ড সংঘঠিত হয়েছে এটি মোটামুটি নিশ্চিত।

মামলার বাদী নিহত আয়েশার পিতা জামাল হোসেন বলেন, ‘মিয়াজি পাড়ার আনোয়ারের ছেলে ফারুকের সাথে আমার মেয়ের সম্পর্ক ছিল। তারাও বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল। এ ব্যাপারে আমাদের মৌন সম্মতিও ছিল কিন্তু গত মাসে এই ফারুকের ভাই মানিক বারবাকিয়ার এক শিশুকে মগনামায় এনে জবাই করে হত্যা করে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। সেই সময় আমি তাদের পরিবারে আর মেয়ে বিয়ে দেব না বলে জানিয়ে দেই। এ ঘটনার পর মেয়েও এ বিয়েতে নারাজ ছিল। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে আমার মেয়েকে মাদ্রাসা যাওয়ার পথে ফাঁকা রাস্তা থেকে অপহরণ করে অজ্ঞাত স্থানে আটকে রেখে পাশবিক নির্যাতনের পর হত্যা করে। এসময় তারা লাশের কান কেটে, চোখ উপড়ে চেহারা বিকৃত করে দেয়ার চেষ্টা করে। পরে তার লাশ গুমের চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে বস্তাবন্দী করে লাশটি রাস্তার পাশে ফেলে যায়। আমি আমার মেয়ের খুনি ফারুক ও তার সহযোগীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।’

এ ব্যাপারে মাদ্রাসা ছাত্রী আয়েশা হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই কাজী আব্দুল মালেকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘গত শুক্রবার (২২ নভেম্বর) ভোরে খবর পেয়ে উপজেলার মগনামা ইউনিয়নের বিসমিল্লাহ সড়কের পাশ থেকে বস্তাবন্দী অবস্থায় একটি লাশ উদ্ধার করি। এলাকাবাসী শনাক্ত করে লাশটি মাদ্রাসাছাত্রী আয়েশার। সুরতহাল রিপোর্টে দেখা যায়, তার চোখ দু’টি উপড়ে ফেলা হয়েছে। বাম কান কেটে ফেলেছে। বুকেও ধারালো অস্ত্রের জখম রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘এ ঘটনায় নিহতের পিতা বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলা নং ০৮ তারিখ: ২২-১১-২০১৯ ইং। মামলায় কথিত প্রেমিক ওমর ফারুক, তার চাচী হালিমা বেগম, রোকেয়া বেগম ও চাচা কামাল হোসেন সহ মোট ৪ জনকে আসামি করা হয়। তাদের মধ্যে আসামি হালিমা বেগম ও রোকেয়া বেগমকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।’

এ বিষয়ে পেকুয়া থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মিজানুর রহমান বলেন, ‘আয়েশা খুনের ঘটনায় অভিযুক্ত কথিত প্রেমিক ওমর ফারুক ও তার পরিবারের সদস্যরা পলাতক রয়েছে। মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে। আমরা হত্যারহস্য উদঘাটনে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’

x