খাগড়াছড়িতে ধস রোধে টেকসই ব্যবস্থাপনা নেই

সমির মল্লিক, খাগড়াছড়ি

মঙ্গলবার , ৩০ জুলাই, ২০১৯ at ১১:০৭ পূর্বাহ্ণ

প্রতি বছর বর্ষা আসলে পাহাড়ে বসবাসরতদের মাঝে আতংক বাড়ে। এসময় পাহাড় ধস রোধে প্রশাসনও তৎপর হয়ে উঠে। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে পাহাড় ধসের মোকাবেলায় প্রশাসনের ব্যাপক প্রস্তুতি নিলেও তা মূলত সাময়িক । পাহাড় ধস রোধে নেই কোন স্থায়ী টেকসই ব্যবস্থাপনা বা পরিকল্পনা। ফলে প্রতিবছরই পাহাড় ধস বা পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে। পাহাড় কর্তন করে পাদদেশে কিংবা পাহাড়ের উপর বসবাসরতদের বেশী ভাগই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ। বিকল্প উপায় না পেয়ে বছরের পর বছর তারা এখানে বসবাস করছে। অনেকটা মৃত্যু ঝুঁকি জেনেও বাধ্য হয়ে এখানে তারা বসবাস করছে।
সূত্রে জানা যায়, পাহাড়ে অপরিকল্পিত চাষাবাদ,অবৈধ বসতি স্থাপন ও অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের কারণে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটছে। এছাড়া বিভিন্ন উন্নয়ন কাজে পাহাড় কাটা হলেও তাতে মানা হচ্ছে না উন্নত প্রযুক্তি ও প্রকৌশল। এছাড়া অবৈধভাবে পাহাড় কাটা রোধে প্রশাসনের নির্বিকার ভূমিকার কারণে ভূমি দস্যুরা পাহাড় কেটে সাবাড় করে দিচ্ছে। বাণিজ্যিক কারণে নির্বিচারে গাছ কাটার ফলে পাহাড় প্রাকৃতিকভাবে ধস প্রতিরোধের সক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। এছাড়া অতি বৃষ্টিপাতের কারণে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটছে। ২০১৭ সালে পার্বত্য তিন জেলায় প্রায় ৯০০ মিমি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। যা সারাদেশের দুই মাসের বৃষ্টিপাতের সমান। এছাড়া প্রতিবছরই মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে পাহাড়ে ব্যাপক বৃষ্টিপাত হয়। ইতোমধ্যে খাগড়াছড়ি দীঘিনালায় পাহাড় ধসে যোগেন্দ্র চাকমা (৪০) নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে।
তবে বসতবাড়ি স্থাপন ছাড়াও বিভিন্ন অজুহাতে পার্বত্য এলাকায় পাহাড় কর্তন করা হয়। গত দুই দশকে বন বৃক্ষ কাটার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে পাহাড় কর্তন। সড়ক নির্মাণ বা স্থাপনা নির্মাণের জন্য ব্যাপকহারে পাহাড় কর্তন করা হয়। পাহাড় কেটে রাস্তা বানানো কারণে পাহাড়ে ধস নামছে। পাহাড় কর্তনের পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ ছাড়া দেদারছে পাহাড় কেটে যাচ্ছে উন্নয়ন সংস্থাগুলো। এসব কারণে মূলত পাহাড় ধস রোধ করা যাচ্ছে না। ২০১৭ সালে খাগড়াছড়ি ,রাঙামাটিসহ পার্বত্য এলাকায় পাহাড় ধরে প্রায় ১৬৬ জনের প্রাণহানি হয়েছে। এ ঘটনার পর পর পাহাড় ধসের কারণ ও ধস রোধে বেশ কিছু প্রস্তাবনা দেয়া হয়। কিন্তু এসব প্রস্তাবনা বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে প্রশাসন। ফলে ফি বছর বাড়ছে ক্ষয়ক্ষতি পরিমাণ।
সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, খাগড়াছড়ির জেলা সদরের শালবাগান, কুমিল্লা,মোল্লাপাড়া,সবুজবাগসহ বেশ কিছু এলাকায় স্থানীয়রা পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে। এছাড়া জেলার মাটিরাঙা, দীঘিনালা, রামগড়, লক্ষীছড়ি এবং মহালছড়ি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করছে স্থানীয়রা। মৃত্যু ঝুঁিক নিয়ে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরত বেশ কয়েকজন বাসিন্দা জানান,‘ এখানে আমরা বছরের পর বছর বসবাস করছি। অন্য কোথাও আমাদের থাকার জায়গা নেই। ’এসব জায়গায় বসবাসরতরা ভূ সম্পত্তি ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে চাই না। এমনকি ভারী বর্ষণেও প্রশাসনেরর সতর্করা পরও তারা আশ্রয় কেন্দ্রে যেতে অনীহা প্রকাশ করে। পাহাড়ে পাদদেশে জীবনের ঝুঁকিরোধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর টেকসই কোন ব্যবস্থা নেই। মূলত পাহাড় ধসে ক্ষয়ক্ষতি জানতে কাজ করে প্রশাসন। ফলে ঠেকানো যাচ্ছে না পাহাড় ধস।
খাগড়াছড়ি পরিবেশ সুরক্ষা আন্দোলনের সভাপতি প্রদীপ চৌধুরী জানান,‘ খাগড়াছড়িতে সরকারিভাবে পাহাড় কেটে উন্নয়নের প্রবণতা বেশি। পাহাড় কাটা আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ না থাকার কারণে এই প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। যারা আইনে প্রয়োগ করবে তারাই পাহাড় কাটছে! পাহাড় কাটার আগে পরিবেশগত কোন প্রভাব নিরূপন করা হয় না। প্রশাসনের উচিত সব ধরনের পাহাড় কাটা বন্ধ করা। এছাড়া পাহাড়ে নতুন করে বনায়ন করা না হলে কখনোই পাহাড় ধস থামানো যাবে না। পাহাড় কর্তনের কারণে পাহাড়ি ছড়া,নদী ভরাট হয়ে যাচ্‌েছ । এতে স্বল্প বৃষ্টিপাতে বন্যার সৃষ্টি হচ্ছে।
খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো.শহিদুল ইসলাম জানান,‘ পাহাড় ধস মোকাবেলায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানা প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। বর্ষায় পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসরতদের আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়েছে। পাহাড় ধস রোধে টেকসই ব্যবস্থাপনা বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন,‘ পাহাড় ধস একটি প্রাকৃতিক বিষয়। পাহাড় ধস রোধে পাহাড় কাটা বন্ধসহ একাধিক পদক্ষেপ নেয়া হবে। জেলার কোথায় পাহাড় কাটা হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

x