ক্ষোভ, হতাশা আর অনুশোচনায় পুড়ছে এক পক্ষ

ক্রীড়া প্রতিবেদক

শুক্রবার , ৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৬:২৪ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থার নির্বাচনের উত্তাপটা এক রকম শেষ হয়ে গেছে। গত বুধবার বিকেলে বর্তমান সাধারন সম্পাদক আ.জ.ম. নাছির উদ্দীনের নেতৃত্বে একটি প্যানেল জমা দেওয়ার মধ্য দিয়ে বলতে গেলে শেষ সব উত্তাপ। কিন্তু গতকাল ছিল এই প্যানেল নিয়ে আলোচনা এবং সমালোচনা। তবে আফসোস, হতাশা আর আত্নসমালোচনায় যেন পুড়ছিল নির্বাচন প্রত্যাশিরা। তাদের কথা এমন হবে জানতে পারলে নির্বাচনের পথেই হাঁটতাম। এভাবে হতাশ হতে হবে জানলে নির্বাচন করে হারলেও ভাল ছিল। প্রয়োজনে স্রোতের বিপরীতে নির্বাচন করাটাও এখন ভাল ছিল বলে মনে করছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। গত বুধবার জমা দেওয়া প্যানেলে নেই গত কমিটির দুই সহ সভাপতি। নেই একজন যুগ্ম সম্পাদক, নেই দুইজন নির্বাহী সদস্য। কিন্তু কোন অযোগ্যতায় তারা নেই বা কোন যোগ্যতায় নতুনরা এসেছে সে ব্যাখ্যাও যেন খুঁজে পাচ্ছে না কেউই। তবে কারো কারো মতে এই কমিটি যেন বানরের পিঠা ভাগের মত অবস্থা। যেখানে গত কমিটির সহ সভাপতি এবং এই কমিটিতেও যিনি থাকছেন সহ সভাপতি হিসেবে থাকছেন সেই হাফিজুর রহমানের উপর ক্ষোভের আগুনটা বেশি ঝরছে। গতকাল একাধিক মনোনয়নপত্র সংগ্রহকারী ক্ষোভের সাথে বলেছেন হাফিজ সাহেব এতবড় গেম খেলবেন সেটা তারা ভাবতেও পারেননি।
গতকাল একজন সহ সভাপতি প্রত্যাশী প্রার্থী বললেন হাফিজ সাহেব কায়দা করে নিজের সবকিছু আদায় করে নিলেন। তার আত্নীয় স্বজনদের তিনি ঠিকই কমিটিতে নিয়ে নিলেন। অথচ যারা তার উপর ভরসা রেখেছিল তাদের কথা একটিবারের জন্যও ভাবলেন না। যদিও হাফিজুর রহমান এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন তিনি শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করেছেন নির্বাচন করাতে। কিন্তু প্রথমে অনেকেই রাজি হলেও পরে সবাই পিছিয়ে যায়। আরেক সহ সভাপতি পদ প্রত্যাশী বললেন হাফিজ সাহেবের সাথে কথা হয়েছিল তিনি সহ সভাপতি এবং সদস্য পদে ফরম নেবেন। কিন্তু পরে তিনি সাধারন সম্পাদক পদের একটি ফরম কিনে সবাইকে বোকা বানালেন। যাতে তিনি ভাল একটি গেম খেলতে পারেন। তিনি বলেন গত নির্বাচনে আমরা ৮১ জন কাউন্সিলরকে একত্রিত করে নির্বাচন না করে একটি সুন্দর কমিটি করার জন্য অগ্রনী ভূমিকা রেখেছিলাম। এবারেও চেষ্টা করেছি ভাল একটি কমিটি করতে। কিন্তু সেখানে আমাদের নিয়ে এভাবে গেম খেলা হবে সেটা ভাবতেও পারিনি।
এবারের নির্বাচনের প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই সিটি মেয়র বলে আসছিলেন তিনি নির্বাচনের মাধ্যমে একটি কমিটি গঠন করতে চান। এমনকি তিনি নিজেও নির্বাচনের মাধ্যমে জিতে আসতে চেয়েছিলেন। গত বুধবার প্যানেল জমা দেওয়ার পর তিনি বলেছিলেন আগের রাতের সভায় তিনি একেবারে শেষ মুহূর্তে যার যার ফরম তার তার কাছে ফেরত দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কেউ নিল না। তিনি বলেন সমঝোতার মাধ্যমে প্যানেল করতে গেলে অনেক কিছু সঠিকভাবে করা যায় না। যেমনটি করা যায়নি এবারেও। তবে মেয়রের ঘনিষ্ট একজন বললেন আসলে আমরাতো কোন কিছু বলতে পারি না। যাদেরকে প্রমোশন দেওয়া হলো তারা কোন যোগ্যতায় প্রমোশন পেল সেটা তাদের বুঝে আসছে না। আর যারা বাদ পড়লেন তাদের অযোগ্যতাটাই বা কি সেটাও বুুঝে উঠতে পারছেন না। তিনি বলেন যারা সিটি মেয়রকে রাত দিন গাল মন্দ করেছেন তারা ঠিকই নানা ফন্দি ফিকির করে নিজেদের পদটা ভাগিয়ে নিয়েছেন। কেউ কেউ আবার অপ্রত্যাশিতভাবে প্রমোশনও পেয়ে গেছেন। তাই তারা এখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন। তারা এখণ সিটি মেয়রের বন্দনায় মুখে ফেনা তুলছেন। অথচ প্যানেল জমা দেওয়া আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তারা সিটি মেয়রের গত আট বছরের সাধারন সম্পাদকের সময়কালে ভাল কিছু দেখতে পাননি। কিন্তু তারা ঠিকই সবকিছু পেয়ে গেছেন।
সাবেক এক ফুটবলার বললেন আসলে এবারের কমিটিটা করা হয়েছে সিটি মেয়র নিজেকে সেইফ সাইডে রাখতে। যেমন সহ সভাপতি পদে পদোন্নতি পাওয়া দিদারুল আলম চৌধুরীর ব্যাপারে সিটি মেয়র নিজেই বলেছেন তাকে এই পদটা না দিলে তিনি সিটি মেয়রকে ঘুমাতে দিতেন না। ঐ ফুটবলার বলেন তিনি যেহেতু এসে গেছেন কমিটিতে, তাই তাকে মোকাবেলা করতে আনা হয়েছে এহেছানুল হায়দর চৌধুরী বাবুলকে। যাতে টক্করটা ভাল মত লাগে। যেটা করা হয়েছিল গত কমিটিতে দুজনকেই নির্বাহি সদস্য পদে রেখে। মিটিংয়ে এ দুজনের বাক বিতন্ডার কথাও স্মরণ করিয়ে দিলেন ঐ ফুটবলার।
জেলা ক্রীড়া সংস্থার এবারের কমিটিতে থাকতে চেয়েছিলেন অথচ তাদের জয়গা হয়নি এমন অনেকেই বলেছেন আমরা না হয় যোগ্য ছিলাম না। কিন্তু এবারের নির্বাচনে মনোনয়ন পত্র কিনেছিলেন এমন অনেকেই যারা দীর্ঘ দিন যাবত এই ক্রীড়াঙ্গনে কেবল দিয়েই যাচ্ছেন। চট্টগ্রামের ক্রীড়াঙ্গনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়িয়েছিলেন তারা। এফএমসি স্পোর্টসের ইয়াছিন চৌধুরী, কোয়ালিটি স্পোর্টসের জাহেদুল ইসলাম, ক্রিসেন্ট ক্লাবের মোজাম্মেল হক, আবাহনীর প্রতিনিধি তাহের উল আলম চৌধুরী স্বপন, প্রথমবারের মত কাউন্সিলর হয়ে এলেও শতদল ক্লাব জুনিয়রের সুমন দে, (যিনি কিনা দেশের তায়কোয়ান্ডোকে অনেক দুর এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে রেখেছেন বড় অবদান), দীর্ঘ দিন ধরে নিরলসভাবে চট্টগ্রামের ক্রীড়াঙ্গনে সেবা দিয়ে যাওয়া লোকমান হাকিম ইব্রাহিম, কিংবা তরুনদের মধ্যে যারা স্ব স্ব ইভেন্ট গুলোর মাধ্যমে চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থার সুনাম বৃদ্ধি করেছেন সেই দিদারুল আলম কিংবা তনিমা পারভীন, দীর্ঘ দিন ধরে ক্রীড়াঙ্গনের সাথে আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে থাকা মফিজুর রহমান কিংবা এস এম শহীদুল ইসলামদের চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে ক্রীড়াঙ্গনকে ভুলতে বসা জমির উদ্দিন ভুলু কিংবা আবদুল বাসেতদের।
এবারের নির্বাচনে প্রত্যাশিত পদ পাননি। তারপরও কমিটিতে আছেন নির্বাহি সদস্য হিসেবে। তেমন একজন বললেন এবারের নির্বাচন অনেক কিছুই শিখিয়েছে তাকে। এখন আর ক্লাবের জন্য টাকা খরচ করার কোন দরকার নেই। কোটি টাকা খরচ করে ফুটবল কিংবা ক্রিকেট দল না গড়ে হাজার পাঁচেক টাকা খরচ করে কাবাডি কিংবা দাড়িয়া বান্ধা খেললে বেশি কাউন্সিলর যেমন পাওয়া যাবে তেমনি নির্বাচনেও প্রমোশন পাওয়া যাবে। আর সে সাথে কেবল সালাম নমষ্কার দিয়ে চললে সেটা হবে পদোন্নতির বাড়তি যোগ্যতা। কাজেই এখন আর ক্রীড়াঙ্গনে টাকা খরচ করার কোন দরকার নাই। কেবল তেলেসমাতিতে থাকতে পারলেই কেল্লা ফতে। নির্বাচের উত্তাপ শেষ। আগামী চার বছরের জন্য কমিটি নিশ্চিত হয়ে গেছে। কিন্ত ভুল আর অনুসুচনায় পুড়ছেন একদল। যারা নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি করেছেন বলে মনে করছেন নির্বাচন করতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে কিংবা সে সিদ্ধান্তে সায় দিয়ে।

x