ক্যাপটিভ পাওয়ারেই চলছে চট্টগ্রামের দেড়শ শিল্প

নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ব্যয় সাশ্রয়ী ঝু্ঁকছেন নতুন বিনিয়োগকারীও

ইকবাল হোসেন

বুধবার , ১১ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৪:৫৪ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রামে সরকারি বিদ্যুতের সহযোগিতা ছাড়াই চলছে দেড়শ শিল্প কারখানা। লোহা, সিমেন্ট, গ্লাস, পেপার, টেক্সটাইলের মতো এসব ভারী শিল্প চলছে ‘ক্যাপটিভ পাওয়ার’ নামের ননগ্রিড বিদ্যুতে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, পিডিবির বিদ্যুতের চেয়ে গ্যাসনির্ভর ক্যাপটিভ পাওয়ার ব্যয় সাশ্রয়ী। আবার নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের জন্য বর্তমানে ক্যাপটিভ পাওয়ারের বিকল্প নেই। নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবহারের কারণে নিরবচ্ছিন্ন সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে। এতে করে যান্ত্রিক ক্ষতি থেকে রক্ষা পাচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকার শিল্প কারখানা।

জানা যায়, শিল্প কারখানায় ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় নির্দিষ্ট পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নিজস্ব বিনিয়োগে নির্মিত প্ল্যান্টই হচ্ছে ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট। বর্তমানে চট্টগ্রামের বড় বড় শিল্প কারখানা চলছে নিজেদের উৎপাদিত বিদ্যুৎ দিয়ে। এসব পাওয়ার প্ল্যান্টের জন্য গ্যাসের যোগান দেয় কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লি. (কেজিডিসিএল)। কেজিডিসিএলের জেনারেল ম্যানেজার (ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিস) প্রকৌশলী সরওয়ার হোসেন দৈনিক আজাদীকে বলেন, বর্তমানে অসংখ্য শিল্প কারখানা ক্যাপটিভ পাওয়ারের মাধ্যমে উৎপাদন করছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধার কারণে শিল্পে নতুন বিনিয়োগকারীরাও ক্যাপটিভ পাওয়ারে ঝুঁকছেন। ক্যাপটিভ পাওয়ারগুলোতে শিল্পগুলোর চাহিদা মোতাবেক গ্যাস সরবরাহ করে আসছে কর্ণফুলী গ্যাস।

সূত্রে জানা গেছে, বড় বড় শিল্প কারখানাগুলো নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিদ্যুৎকেন্দ্র (ক্যাপটিভ পাওয়ার) নির্মাণ করেছে। ১ মেগাওয়াট থেকে ৭৫ মেগাওয়াট সক্ষমতার ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট রয়েছে চট্টগ্রামে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ৭৫ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে কমপক্ষে ৫০০৫৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। ক্যাপটিভে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ইস্পাত শিল্পে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। তাছাড়া সিমেন্ট, গ্লাস, টেঙটাইল, অ্যালুমিনিয়াম, জুতো, কাগজ, ভোজ্যতেল, কেমিক্যাল কারখানায়ও রয়েছে ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট।

কেজিডিসিএল সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামে গ্যাস রিফুয়েলিং স্টেশনসহ ১৫০টি ক্যাপটিভ পাওয়ার ইউনিট রয়েছে। এর মধ্যে গ্যাসচালিত জেনারেশন দ্বারা উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করে রিফুয়েলিং স্টেশনগুলো। চট্টগ্রামের বড় বড় শিল্প গ্রুপ ক্যাপটিভ পাওয়ারের মাধ্যমে নিজেদের কারখানাগুলো চালাচ্ছে। এসব ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টে প্রতি মাসে গ্যাসের চাহিদা রয়েছে ৫ কোটি ঘনমিটার। বর্তমানে মাসে সাড়ে তিন কোটি ঘনমিটার গ্যাস ব্যবহার করছে এসব ক্যাপটিভ পাওয়ার।

পিএইচপি ফ্যামিলির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মহসিন দৈনিক আজাদীকে বলেন, পিডিবি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা দিতে পারছে না। আমাদের স্টিল প্ল্যান্টে একবার এক সেকেন্ডের জন্য পাওয়ার ট্রিপ করলেই ১৬২০ লাখ টাকা ক্ষতি হয়। স্টিল প্ল্যান্টের একটি রোলারের দাম অনেক। এসব যন্ত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যই আমরা নিজস্ব পাওয়ার প্ল্যান্ট বসিয়েছি।

তিনি বলেন, আমাদের গ্লাস ও স্পিনিংয়ের জন্যও ক্যাপটিভ রয়েছে। গ্লাসের প্ল্যান্ট চালাতেও বিরতিহীন বিদ্যুতের প্রয়োজন পড়ে। গ্লাস প্ল্যান্টে ১০ মেগাওয়াটের মধ্যে আমাদের নিয়মিতভাবে মেশিন চালু অবস্থায় ৪ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। শুধু নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের জন্য গ্যাসের পাশাপাশি দুই মেগাওয়াট কয়লা ও দুই মেগাওয়াট ফার্নেস অয়েলে চালানোর সুবিধা রেখেছি। ট্রিপ জটিলতার কারণেই আমাদের বেশি বিনিয়োগ করতে হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, পিএইচপি স্টিলে যে প্ল্যান্টটি রয়েছে সেটি ১৫ মেগাওয়াট সক্ষমতার। প্রথমে মেশিন চালু করতেই ১৫ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোড প্রয়োজন হয়। কিন্তু মেশিল চালু হওয়ার পর ৭ থেকে ৮ মেগাওয়াটে নেমে আসে। এতে করে ৭৮ মেগাওয়াট অব্যবহৃত রয়ে যায়। এই অব্যহৃত বিদ্যুৎ যদি পিডিবি আমাদের কাছ থেকে কিনে নিত, তাহলে পিডিবি কোনো বিনিয়োগ ছাড়াই ক্যাপটিভ থেকে অনেক বিদ্যুৎ নিতে পারত। আবার উদ্যোক্তা হিসেবে আমাদেরও ব্যয় সাশ্রয় হতো।

মডার্ন পলি ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু সুফিয়ান চৌধুরী দৈনিক আজাদীকে বলেন, আমাদের ১২ মেগাওয়াট ইনস্টলেশন ক্যাপাসিটির একটি ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট রয়েছে। পলি প্ল্যান্টটিতে যদি একবার ট্রিপ করে তাহলে প্রায় ৭৮ লাখ টাকার ক্ষতি হয়। কারণ বিদ্যুৎ ট্রিপ করলে মেশিন বন্ধ হয়ে গেলে ওয়েস্টেজ (বাতিল পণ্য) বেড়ে যায়। বিদ্যুৎ যাওয়াআসা করার কারণে যন্ত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতায় ঠিকে থাকতে গেলে পণ্যের উৎপাদন ব্যয় কমাতে হবে। পিডিবির চেয়ে ক্যাপটিভের বিদ্যুৎ অনেক ব্যয় সাশ্রয়ী। ক্যাপটিভ পাওয়ারের কারণে আমাদের উৎপাদন খরচ কমেছে। তাছাড়া পিডিবি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিত করতে পারছে না।

চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলম দৈনিক আজাদীকে বলেন, পিডিবি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিত করতে পারলে ক্যাপটিভ পাওয়ারের প্রয়োজন পড়বে না। সেজন্য সরবরাহ লাইনগুলোর আরো আধুনিকায়ন করতে হবে। তবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না হলে শিল্প কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

x