কোরবানির আদর্শগত শিক্ষা ও প্রাসঙ্গিক বিষয়

আয়েশা পারভীন চৌধুরী

রবিবার , ১১ আগস্ট, ২০১৯ at ৮:০৫ পূর্বাহ্ণ
124

পবিত্র ঈদুল আযহার আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে সমাজ, দেশ ও এই বিশ্বকে একটি সুন্দর, সহনীয় ও বসবাসযোগ্য স্থানে পরিণত করার অঙ্গীকার নিয়ে সকলকে একত্রিত হতে হবে। সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের আদর্শ নিয়ে ঈদুল আযহা প্রতি বছরই আসে। কিন্তু আসল উদ্দেশ্য থেকে সরে গিয়ে অনেকেই লৌকিকতার আশ্রয় নেয়। প্রতিবছর মুসলমানদের বৃহত্তম ধর্মীয় অনুষ্ঠান পবিত্র হজ্বের পরই পশু কোরবানি দিয়ে ঈদুল আযহা উদযাপন করা হয়। বিশ্বের মুসলমানদের জন্য জিলহজ্ব মাসের ১০ তারিখে পবিত্র ঈদুল আযহার দিনে হালাল পশু কোরবানি করার রেওয়াজ আছে। এই কোরবানি শুধুু পাপ বিসর্জন নয়, মনের ভিতরের পশুত্ব, হিংসা, ক্ষুদ্রতা, স্বার্থপরতা, হীনতা, দীনতা, আমিত্ব ও অহংকার ত্যাগের মাধ্যমে নিজেকে শুদ্ধ করে তোলার শিক্ষা দেয়। মুসলিম উম্মাহর জন্য ইসলামের দুইটি উৎসব বা আনন্দের দিন রয়েছে। একটি হচ্ছে ঈদুল ফিতর এবং অন্যটি ঈদুল আযহা। দুই ঈদের আনুষ্ঠানিকতা ভিন্ন রকম হলেও মূল তাৎপর্য একই। ত্যাগের আনন্দে এই দুই উৎসবের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধে সকলে মিলিত হয়। ঈদ উপলক্ষে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আলোকসজ্জা শোভা পায়। ঈদ মোবারক খচিত প্লেকার্ড বিতরণ করা হয়। হাসপাতাল, কারাগার, এতিমখানা, ভবঘুরে কেন্দ্র, শিশু-সদন ও বৃদ্ধাশ্রমে উন্নত খাবার পরিবেশন করা হয়। ঘরে ঘরে দেখা যায় নতুন নতুন জিনিস ক্রয়ের আনন্দ। ঈদুল ফিতরের মত নতুন জামা-কাপড় ক্রয় না করলেও ঈদুল আযহায় রান্না ঘরের আনুষাঙ্গিক জিনিসগুলো ক্রয় করা হয়। যারা সামর্থ্যবান তারা নতুন কাপড়-চোপড় ক্রয় করেন। তবে সবাই তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী কোরবানির পশু ক্রয়ের জন্য হালাল টাকার ব্যবস্থা করতে চায়। কারণ হালাল টাকায় কোরবানির যে আনন্দ কালো টাকায় তা সম্ভব নয়। যদিও পশুর হাটে সাদা-কালো, আসল-নকল টাকা চেনা বেশ কষ্টকর। পবিত্র এই দুই ঈদে অনেকেই কবরস্থানে স্বজনের কবর জিয়ারত করতে চান। আনন্দের দিনে অশ্রুসিক্ত হয়ে চিরদিনের জন্য চলে যাওয়া স্বজনের আত্নার মাগফিরাত কামনা করে আল্লাহর দরবারে কর-জোড়ে মোনাজাত করেন। আবার অনেকেই মৃত মা-বাবা ও নিকটতম আত্মীয়-স্বজনের নামে কোরবানি দিয়ে থাকেন। যাদের সামর্থ্য আছে তারা আবার সংসারের অন্যান্য সদস্যদের নামেও কোরবানি দেন। যারা ভাগে কোরবানি দেন তারা নিজেদের ফরজ আদায়ের দিকে বেশী লক্ষ্য রাখেন। পাড়া মহল্লার অলি-গলিতে গবাদি পশুর ডাক শোনা যায়। চলার পথে রঙিন কাগজ ও জরির মালা হাটে বাজারে, রাস্তার ধারে বিক্রয় করতে দেখা যায়। কাঠাল পাতা, খড়-বিচালি ভুষি ইত্যাদি কোরবানির আনুষাঙ্গিক জিনিষও চোখে পড়ে, কোরবানির পশু কেনা ও তার সঠিক পরিচর্যাতেই ঈদুল-আযহার মুল প্রস্তুতি ও আনন্দ। রাস্তার পাশে ও বিল্ডিংয়ের নিচে রাখা হয় কোরবানির পশু। বিশেষ করে ফ্য্লাট বাড়ির নিচে সামিয়ানা টাঙিয়ে সারিবদ্ধভাবে কোরবানির পশু রাখা হয়। আবাল বৃদ্ধ বনিতা সবাই ক্রয়কৃত কোরবানির পশু দেখে আনন্দিত হয়। গরু উঁচু কত, বড় কত, মোটা, দাম, ইত্যাদি ইত্যাদি নিয়ে এক ধরনের প্রতিযোগীতামূলক মনোভাব মাঝে মধ্যে কোরবানির আসল মাহাত্মের বিঘ্ন ঘটায়।
মানুষের জীবনে দুটো প্রবৃত্তি রয়েছে- একটি পশুবৃত্তি ও অন্যটি বুদ্ধিবৃত্তি। পশুবৃত্তিকে দমন করে বুদ্ধিবৃত্তি প্রয়োগের মাধ্যমে মানুষ যখন জীবনকে সুন্দর, সুষ্ঠু ও সুপথে পরিচালিত করে তখনই মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয়। আদর্শ ও ন্যায় জীবন প্রতিষ্ঠায় মানুষকে লোভনীয় অনেক কিছু ত্যাগ ও বিসর্জন দিতে হয়। এই ত্যাগ, উৎসর্গ ও কোরবানি হচ্ছে পশুবৃত্তির বিসর্জন। কুরবানির মাধ্যমে নৈতিকতা, সহমর্মিতা ও আন্তরিকতার উম্মেষ ঘটবে। বিলুপ্ত হবে সব ধরণের হিংসা, বিদ্বেষ, লোভ, ক্রোধ। কুরবানির মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জন সম্ভব হয়। কুরবানির মধ্যে দিয়ে মহান আল্লাহর প্রতি দ্বিধাহীন আনুগত্য প্রকাশের মাধ্যমে নিজেকে পরিশুদ্ধ করা হয়। জীবনের সর্বক্ষেত্রে পবিত্রতা অর্জন ও চারিত্রিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়। ঈদুল আযহা একদিকে যেমন সৃষ্টিকর্তার কাছে নিজেকে সম্পূর্ণ আত্নসমর্পণ করা হয়, অন্যদিকে কোরবানির মাংস বন্টনের মাধ্যমে ধনী-গরিবের আত্মিক মিলনও ঘটায়। আবার আত্নীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের মাঝে রান্না ও কাঁচা মাংস বিতরণের মাধ্যমে সুখ-দু:খ ভাগাভাগি করে নেয়ার মতো মনোভাব ও সহিষ্ণুতার শিক্ষা লাভ করে। মানুষের মধ্যে বিদ্যমান পশু প্রবৃত্তি, কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, পরনিন্দা জাতীয় নেতিবাচক প্রবৃত্তিকে পরিহার করে উন্নত মানসিকতায় মানবিক গুণাবলীকে আয়ত্ত করতে হবে। কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন, ‘‘মনের পশুকে কর জবাই, পশুও বাঁচে, বাঁচে সবাই।’’ ঈদুল আযহার কোরবানী পশু ক্রয় থেকে শুরু করে জবেহ পর্যন্ত কোন ধরণের লৌকিকতা কাম্য নয়। পশুর দাম ও আকার নিয়ে পাড়া-প্রতিবেশীদের মাঝে চলে প্রতিযোগিতা। আবার বর্তমান প্রযুক্তির যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পশুর ছবি প্রদর্শনে চলে এক ধরণের লোক দেখানো সংস্কৃতি। আবার দাম জানার জন্য নানা ধরণের মন্তব্য। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোরবানির পশুর দাম জানানোর মাধ্যমে চলে মর্যাদার লড়াই। যে যত দামি পশু ক্রয় করতে পারে সে ততই অহংকার বোধ করে। বর্তমানে প্রায়ই দেখা যায়, হাটে যাওয়া থেকে শুরু করে, দর-দাম করে কেনা, নিয়ে আসা, ঘাস খাওয়ানো, জবাই করা, মাংস ছেড়ানো, মাংস বিতরণ, ভাগ-বাটোয়ারা, রান্না-বান্না, শেষ পর্যন্ত খাওয়ার টেবিলের ছবিও পোষ্ট করা হয়। তাছাড়া কারা আগে রান্না মাংস খেয়ে তৃপ্তি মিটিয়েছে, তার ছবি পোস্ট করে নিজেদের তৎপরতার পরিচয় প্রকাশ করে। নিজের অবস্থান দেখানোর মাধ্যমে ঈদুল আযহার মাহাত্ম্য অনেকাংশে কমে যায়। এতে কোন বীরত্ব ও বিশেষত্ব নেয়। ইসলামে কোন লৌকিকতার স্থান দেওয়া হয় না। এতে বরং ইবাদতের গুরুত্ব নষ্ট হয়। কোরবানির আনন্দ ঘরে বাহিরে সকলের মধ্যে বিরাজ করে। তাইতো পশু ক্রয়ের অনেক আগে থেকে ঘরের গৃহকর্মীর ব্যস্ততা থাকে। মরিচ, মসলা কেনা তা শুকানো, ভাঙানো, দা-বটিতে শান দেওয়া, চাউল ধুয়ে শুকানো, চাউল গুড়া করা, রুটি বানানোর জন্য মানুষ ঠিক করা, আবার মাঝে মাঝে বাকরখানি ও পরটার অর্ডার দেওয়া, নতুন নতুন বড় ঢেকচি-পাতিল ক্রয় করা ইত্যাদি আনুষাঙ্গিক জিনিস নিয়ে ব্যস্ত থাকে। কিন্তু বর্তমানে কোরবানীর এই ঘরোয়া আনন্দ অনেকটা বিলীন হয়ে গেছে। যান্ত্রিক যুগে সবাই প্রযুক্তির সেবা নিতে গিয়ে ঘরোয়া আনন্দ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে । মাংস ভাগ-বাটোয়ারা ও বিতরণের পর যে যার মাংস ফ্রীজে সংরক্ষণ করতে ব্যস্ত থাকে। প্রয়োজনমত ফাতেহার মাংস রান্নার পর তেমন আয়োজন থাকে না। তাই কোরবানির আনন্দটাও দুপুরের পর পর শেষ হয়ে যায়।
কোরবানির পশু ক্রয়ের সাথে দেশের অর্থনীতির চাকা সম্পৃক্ত থাকে। আমাদের দেশের চামড়া শিল্প মূলত কোরবানির পশুর চামড়া উপর নির্ভর করে। পশুর হাটে নকল টাকা চিহ্নিত করার জন্য মেশিন বসানো হয়। পশুর হাটে আনা অবদি মাঠে-ঘাটে চাঁদাবাজি চলে। সকল ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করলেও প্রতি বছর একই চিত্র ঘটতে থাকে। তাছাড়া ক্ষতিকর ওষুধ খাওয়ানোর ফলে অনেক পশুর মৃত্যুর খবর শুনা যায়। মোটা তাজা করার জন্য পশুকে ওষুধ খাওয়ানোর ফলে পশুগুলো আকারে বড় হলেও প্রকৃত পক্ষে স্বাস্থ্য সম্মত থাকে না। অতিরিক্ত মুনাফা লাভের আশায় নিরীহ পশুগুলোর উপর অত্যাচার করা হয়। পার্শ্ববর্তী দেশগুলো হতে পশু পাচার একটি সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। পাচারকালীন নিরীহ পশুদের উপর চলে অমানবিক অত্যাচার। কোরবানির হাটের অনিয়ম কারোর কাম্য নয়। পশুর চামড়ার সঠিক সংরক্ষণ ও বিক্রয় দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখে।
বর্তমান বাংলাদেশে যে হারে নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে ও প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া নানান ঘটনা-অঘটনা মানুষের মাঝে উপনিহিত পশুবৃত্তির বহি:প্রকাশ। তাই কোরবানির আদর্শগত শিক্ষা গ্রহণ করে পশুত্বকে বিসর্জন দিয়ে একটি সুন্দর সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। শুধু ‘‘আমি ও আমার মঙ্গল নয়, বরং আমাদের সকলের মঙ্গল’’ এমন ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ঈদুল আযহার কোরবানির আসল উদ্দেশ্য ।
লেখক : কলামিস্ট; অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ডাঃ ফজলুল-হাজেরা ডিগ্রি কলেজ

x