কে এই পলাশ

হাসান আকবর

মঙ্গলবার , ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৬:৫০ পূর্বাহ্ণ
614

১৪৮জন আরোহীসহ বাংলাদেশ বিমানের বোয়িং ‘ময়ুরপঙ্খী’ ছিনতাই করতে গিয়ে কমান্ডো অভিযানে নিহত পলাশ আহমেদকে নিয়ে সারাদেশে আলোচনা তুঙ্গে। নানা নামে পরিচিত এই যুবক আসলে কে ছিলেন, তিনি আসলে কি করতেন এসব বিষয় নিয়ে চলছে নানামুখী বিশ্লেষণ। নেট দুনিয়াসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাকে পলাশ মাহমুদ, পলাশ আহমেদ কিংবা মাহাদি বা মাহিবি কিংবা মাহবি জাহান ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে পিতা মাতা থেকে পাড়া পড়শি সকলেই কমবেশি বিরক্ত ছিল তার ওপর। অবশ্য থানায় কোন মামলা নেই বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে র‌্যাব বলেছে, র‌্যাবের ডাটাবেইজে অপরাধী হিসেবে পলাশের প্রিঙ্গারপ্রিন্ট রয়েছে। অপহরণ করতে গিয়ে একবার ধরা পড়েছিল সে।
কে এই পলাশ তা বিশদভাবে জানার জন্য দৈনিক আজাদীর পক্ষ থেকে র‌্যাব সদর দফতর, নারায়নগঞ্জ জেলা পুলিশ, সোনারগাঁও থানা পুলিশ এবং স্থানীয় সাংবাদিকদের সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে। কিছু তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে বিভিন্ন বার্তা সংস্থা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে। আর সবকিছু মিলে পলাশ মাহমুদ কিংবা পলাশ আহমেদ কে ছিল নিচে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ বিমানের বিজি ১৪৭ ফ্লাইটের ১৭-এ সিটের যাত্রী হিসেবে পলাশ ময়ুরপঙ্খীতে উঠেছিলেন। তিনি অভ্যন্তরীণ রুটের যাত্রী ছিলেন। নাম লিখেছিলেন পলাশ আহমেদ। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম আসার কথা ছিল তার। কিন্তু পথিমধ্যে তিনি বিমানটি ছিনতাইয়ের চেষ্টা করে নানা নাটকীয়তার জন্ম দেন। নিজের নাম মাহাদি পরিচয় দিয়ে তিনি বিমানের ক্রু এবং পাইলটের সাথে কথা বলেন। বিমানবাহিনীর চট্টগ্রামের প্রধানকেও তিনি নিজের নাম মাহাদি বলে পরিচয় দেন এবং প্রধানমন্ত্রী ও নিজের স্ত্রীর সাথে কথা বলার সুযোগ দাবি করেন। তবে কেন তিনি প্রধানমন্ত্রী বা নিজের স্ত্রীর সাথে কথা বলতে চান সেই সম্পর্কে কাউকে কিছু বলেননি। নিজের স্ত্রীর কোন টেলিফোন নম্বরও তিনি যৌথবাহিনীকে দিতে পারেননি। ঘটনার ধারাবাহিকতায় কমান্ডো অভিযানে নিহত হন তিনি।
র‌্যাব তার প্রিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ করে ক্রিমিনাল ডাটাবেজে মিল পাওয়ার কথা উল্লেখ করেন। র‌্যাবের ডেটাবেইজে তার নাম মোহাম্মদ পলাশ আহমেদ হিসেবে রয়েছে। ২০১২ সালে একটি অপহরণ মামলায় র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তিনি। তখন তার বয়স মাত্র ১৮ বছর ১৫ দিন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে র‌্যাবের লিগ্যাল এন্ড মিডিয়া উইং এর পরিচালক কমান্ডার মোহাম্মদ মুফতি মাহমুদ খান গতকাল আজাদীকে বলেন, র‌্যাবের ক্রিমিনাল ডাটাবেজে পলাশের নাম রয়েছে। ২০১২ সালে সোনারগাঁও এলাকায় এক নারীকে অপহরণ করে মুক্তিপন আদায়ের ঘটনায় র‌্যাব তাকে গ্রেপ্তার করেছিল বলে জানান র‌্যাবের এ কর্মকর্তা। এ অপরাধের বাইরে অন্য কোন অপরাধের সাথে তার সংশ্লিষ্টতা থাকার কোন খবর র‌্যাবের কাছে নেই বলে জানান মুফতি মাহমুদ।
এদিকে নারায়ানগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন আজাদীকে বলেন, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও থানার পিরোজপুর ইউনিয়নের দুধঘাটা এলাকার পিয়ার জাহান সরদারের ছেলে পলাশ মাহমুদ। তার নামে থানায় কোন মামলা বা অভিযোগ নেই। সে বেশিরভাগ সময়ই বাইরে থাকে। বাইরে হয়ত বিভিন্ন অপকর্মের সাথে জড়িত থাকতে পারে। স্থানীয়রা তাকে ততটা ভালো জানে না।
পিতা পিয়ার জাহান সরদারকে উদ্বৃতি দিয়ে পুলিশ জানায়, তার একমাত্র ছেলে পলাশ মাহমুদ তাহেরপুর ইসলামিয়া আলিম মাদরাসা থেকে ২০১২ সালে দাখিল পরীক্ষা দিয়ে পাস করে। দাখিল পাস করে সে সোনারগাঁ ডিগ্রি কলেজে ভর্তি হয়। সেখানে পড়া অবস্থায় সে ঢাকায় চলে যায়। তারপর থেকে তার আচরণে পরিবর্তন দেখা দেয়। শুনেছি পলাশ নাকি ঢাকায় চলচ্চিত্রে কাজ করার চেষ্টা করছিল। তখন বাড়ির সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল না। মাঝে মাঝে বাড়িতে এলেও এলাকার মানুষের সঙ্গে মিশত না, কথা বলত না।
পলাশ ‘কবর’ নামের একটি সিনেমায় পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয় করেছেন। ২৪ বছর বয়সী এই তরুণ ইতোমধ্যে দুই দফা বিয়ে করেছেন। তার দ্বিতীয় স্ত্রী ছিলেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী অভিনেত্রী শামসুর নাহার শিমলা। ২০১৮ সালের শুরুতে সিমলাকে বিয়ে করেন পলাশ। দেড় বছর সংসার করার পর মাস চারেক আগে সিমলার সাথে সম্পর্ক শেষ হয়ে যায় পলাশের। ধারণা করা হচ্ছে, সিমলার সাথে কথা বলার দাবি করেছিলেন তিনি বিমান ছিনতাইকালে।
পলাশের পিতার বক্তব্য হচ্ছে, ১৯৯০ সালে তিনি ইরাক গিয়েছিলেন। তিন বছর ইরাক থেকে তিনি দেশে ফিরে আসেন। পরবর্তীতে সৌদি আরব চলে যান। বিদেশে যা টাকা পয়সা কামাই করেছেন তার বেশির ভাগই একমাত্র পুত্র পলাশই উড়িয়েছেন। তিন কন্যার মধ্যে দুটির বিয়ে হয়েছে এবং চার বছর বয়সী অপর একটি কন্যা রয়েছে পিয়ার জাহানের। তিনি বর্তমানে মুদী দোকানের ব্যবসা করেন।
পিয়ার জাহান একমাত্র পুত্রকে মানুষ করতে একবার মালয়েশিয়া এবং একবার দুবাই পাঠিয়েছিলেন। দুইবারই টাকা পয়সা নষ্ট করে ফিরে আসেন। পলাশ যখন নিজের ইচ্ছেতে চিত্রনায়িকাকে বিয়ে করেন তখন পরিবারে কিছুটা আশার সঞ্চার হয়েছিল বলেও জানিয়েছেন তার বাবা। আশা করেছিলেন, ছেলে এবার ভালো হয়ে যাবে। কিন্তু কিছুই হয়নি। কিছুদিন আগে বাড়িতে এসে বসবাস করতে থাকেন পলাশ। কিন্তু দিন কয়েক আগে আবারো দুবাই যাবেন বলে পিতার কাছ থেকে এগার হাজার টাকা নিয়ে তিনি বাড়ি ছাড়েন। বিদেশে পাঠানোর কথা বলে এলাকার মানুষের কাছ থেকে টাকা নেওয়া, এমনকি ‘অপহৃত হওয়ার নাটক করে’ নিজের বাবার কাছ থেকে টাকা আদায়ের মত ঘটনাও আগে ঘটিয়েছিলেন পলাশ।
পলাশ ঢাকার সিনে জগতে তিনি মাহিবি জাহান নামেও পরিচিত। এই নামে তার একটি ফেসবুক একাউন্টও রয়েছে। জাতীয় চলচিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত শিল্পী শিমলা নিজের থেকে ২০ বছরের ছোট এক যুবককে বিয়ে করছেন বলে গতবছর পত্রপত্রিকায় ব্যাপক খবর রটে। তখন মাহিবি বেশ আলোচিত হয়ে উঠেন। গতকাল মাহিবি জাহানের ফেসবুক আইডিতে ঢুকে নায়িকা শিমলার সঙ্গে প্রচুর ঘনিষ্ঠ ছবি পাওয়া গেছে। প্রোফাইলে লেখা হয়েছে, মাহিবি একজন আইটি বিজনেস অ্যানালিস্ট, কাজ করেছেন ব্রিটিশ এয়ারওয়েজে। তার বাড়ি ঢাকায়, পড়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগে, থাকেন যুক্তরাজ্যে। অবশ্য পুলিশী অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ফেইসবুক আইডি মাহিবি জাহানই পলাশ। তবে তার প্রোফাইলের তথ্যগুলো সঠিক নয়। শিমলার সাথে তার বিয়ে হলেও ইতোমধ্যে সব চুকেবুকে গেছে বলেও পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে।
ফেসবুকের ওই পেইজে ২০১৭ সালের ১৩ ডিসেম্বর পিস্তলসহ একটি একটি ছবি পোস্ট দিয়েছিলেন পলাশ ওরফে মাহিবি। রোববার বিমানে চড়ার আগে বেলা ১টা ৩ মিনিটে তার সর্বশেষ পোস্টে শুধু লেখা ছিল ‘ঘৃণা নিঃশ্বাসে প্রশ্বাসে’। এর কয়েক ঘণ্টা কয়েক পরই বিমানের ফ্লাইটটি চট্টগ্রামের উদ্দেশে উড়াল দেয়।

x