কেন লোভ-দুর্নীতির ভয়াল ভাইরাস!

মোস্তফা কামাল পাশা

মঙ্গলবার , ১০ মার্চ, ২০২০ at ১১:২৫ পূর্বাহ্ণ
56

ক্ষণ গণনা শেষ পর্ষায়ে। ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ‘মুজিববর্ষ’ উদযাপনের আনুষ্ঠানিক পর্দা উঠবে। এরমাঝে জাতীয় ও দলীয় প্রস্তুতির শেষ পর্যায়ের গোছগাছ চলছে। কিন্তু ভারতের প্রধানমন্ত্রী কট্টর হিন্দুত্ববাদী মোদির মুজিববর্ষের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আগমনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে কিছুটা অস্থিরতার মেঘ জমছে। ধর্মীয় দল ও গ্রুপগুলোর পাশাপাশি দেশের সবখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য পীর, খানকার অনুসারী ও হেফাজতে ইসলামও মোদি বিরোধী বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন শুরু করেছে। কর্মসূচিগুলো সহিংস না হলেও সাধারণ মানুষ কিছুটা আতঙ্কে আছে। রাজধানী দিল্লিতে সামপ্রতিক এনআরসি বিরোধী বিক্ষোভকে ঘিরে রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা, প্রচুর হতাহত, সম্পদ ধংসের ঘটনা ও পুলিশী নিস্ক্রিয়তায় পৃথিবীর প্রায় সবখানেই সমালোচনার মুখে মোদি সরকার। মুসলিম প্রধান রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশে এর অভিঘাত পড়া স্বাভাবিক। আবার সোশাল মিডিয়ার কিছু কট্টর উগ্রবাদী গ্রুপ ও পেজ এবং মশা-মাছির চেয়েও বেশি যত্রতত্র গজিয়ে উঠা অসংখ্য পোর্টাল বা অনলাইন টিভির বড় একটি অংশ ধর্মীয় উস্কানির তাপে বাতাস দিচ্ছে। বাংলাদেশের মত সামপ্রদায়িক সমপ্রীতির দেশে ভূয়া প্রচারণা ধর্মীয়ভাবে কম সংখ্যার জনগোষ্ঠীর মাঝেও আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। এদের ভীতি উস্কে দিতে দেশে বহু হিন্দু হত্যাকান্ড ও মন্দির ধ্বংসের গুজব আর এডিট করা ছবিও ছড়াচ্ছে আরেকটি কট্টর গোষ্ঠী। উস্কানিমূলক গুজব, হুজুগ দূর করার দায়, সরকার ও সচেতন জনগোষ্ঠী দু’পক্ষকেই নিতে হবে। অতি অবশ্যই যত দ্রুত সম্ভব।
অস্বীকার করার উপায় নেই, ‘৭১এ পাকি হানাদারদের ভয়াল বর্বরতা ও নৃশংস বাঙালি নির্মূল অভিযানে ভারতই ছিল বাংলাদেশের সবচে’ বড় সহায়। তদানীন্তন কংগ্রেসের ইন্দিরা গান্ধীর সরকার সীমান্ত খুলে দেয়াসহ কোটি বঙালিকে আশ্রয়, খাদ্য এবং মুক্তিযুদ্ধে সর্বাত্মক সহায়তার হাত বড়িয়ে না দিলে দেশের ইতিহাস আজ হয়তো অন্যভাবে লিখতে হতো। শব্দ তৈরির জন্য আমাদের বেঁচে থাকার কথাও না। এটা ঠিক, মোদির তখনকার ভূমিকা আমাদের অজানা। কারণ তখন বিজেপি নামের দলটির জন্মই হয়নি। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে ভারতের বিশাল অবদানতো ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা সম্ভব না। সম্ভব নয় বলেই মুজিববর্ষে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, ব্যাক্তি মোদিকে নয়। বিষয়টা সব পক্ষকেই বুঝতে হবে-বোঝাতে হবে। প্রতিক্রিয়াও সেভাবে করা উচিত।
কিন্তু ‘মুজিববর্ষ’ ঘিরেও অবিশ্বাস্য দুর্নীতি, অনিয়মের খবরে মানুষের স্বাভাবিক স্বস্তি ফিকে হয়ে যাচ্ছে। পাপিয়া-সুমন কান্ডে যাদের নাম ভাসছে, তারা সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের আমলা, কর্তা ও শীর্ষ ব্যবসায়ী। এদের কী শাস্তি হয়, দেখার অপেক্ষায় দেশবাসী। এরকম ছোটবড় বহু অস্বস্তিকর কান্ড দেশে টানা ঘটেই চলেছে। ধরা পড়ার পর মিডিয়ায় আসে, নাহলে ডুবে থাকে। পাপিয়াকান্ড অপরাধের ডুবন্ত বিশাল বরফ চাইয়ের ভাসমান অংশ মাত্র। এদিকে সম্ভাবনাময় উদ্যোগে সহায়তা দিতে তৈরি সরকারি তহবিল ইইএফএ দুর্নীতির কারনে বন্ধ করে ইএসএফ সাজানো হয় নতুন করে। অদ্ভুত নাকি ভুতুড়ে কান্ড, বলা মুস্কিল। ইএসএফ এক টাকাও অর্থ ছাড়ের আগে দেড় বছরে গায়েব করে দিয়েছে ২২ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। ৫ মার্চ দৈনিক সমকাল লিড আইটেম হিসাবে অনুসন্ধানী খবরটি প্রকাশ করে। পুরো খবরটি পড়লে যে কারো গায়ের লোম খাড়া হয়ে যাবে। এমন অবিশ্বাস্য দুর্নীতি-অনিয়ম দেশে আদৌ কী সম্ভব! আর বাংলাদেশ ব্যাঙ্কও উদ্যোক্তা তৈরির লুটপাটে তিন মাস পর পর কোন প্রশ্ন ছাড়াই ইএসএফ উইংএর খরচের অর্থ ছাড় করে গেছে। অন্য সব সেক্টরের মত উদ্যোক্তা তৈরির স্পর্শকাতর উইংও যদি এভাবে পচে, তাহলে প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর শোষণ,বঞ্চনামুক্ত স্বপ্নের সুখী সোনার বাংলা কীভাবে উপহার দেবেন? তাঁর চারপাশে নিরাপদ অবস্থান নিয়ে বঙ্গবন্ধুর ঝকমকে মাদুলি ঝোলানো সর্বভুক রাক্ষস-খোক্কসের ঝাঁক উইপোকার মত পুরো মানচিত্রটাই যে গিলে খাবে! এভাবেতো চলতে দেয়া যায়না, বিশেষ করে মুজিববষের্র পবিত্রতা রক্ষায় নেত্রী যদি কঠোর ও কঠিন অবস্থান না নেন, এরাতো আমাজান পিরানহার চে’ও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে।
রাজনীতির পুরানা ঝুলিঃ রাজনীতিতে নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বদ্ধ ঝুলির মুখ খুলছি এবার। পুরো বিশ্বকে নাড়িয়ে দেয়া ঐতিহাসিক ৭ মার্চ উদযাপিত হলো, কদিন আগে। ৭৫-এর ১৫ আগস্টের ইতিহাস ধিকৃত প্রেতাত্মারা বঙ্গবন্ধুর দুনিয়া কাঁপানো ভাষণ মানচিত্র থেকে মুছে দিতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল। নির্যাতন- নিপীড়নের বুলডোজার চালিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে হাজারো বঙ্গবন্ধু ভক্তের জীবন। কিন্তু অদম্য বঙ্গবন্ধুপ্রেমিরা বুলেট-বেয়নেট উপেক্ষা করে ৭ মার্চের পবিত্রতা বুক পেতে রক্ষা করে।
শুনে চমকে যাবেন, সামরিক স্বৈরাচার জিয়ার নির্যাতন, সামরিক ফরমান উপেক্ষা করে ‘৭৬এর ১৫ আগস্ট ঘটে অবিশ্বাস্য ও দুঃসাহসিক এক ঘটনা। চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানার ধলই ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম মাইকের হুংকারে মাঝরাতে জেগে উঠে। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের ধ্বনি- প্রতিধ্বনির অনুরননে গ্রামের সবুজ প্রকৃতি কেঁপে কেঁপে উঠে, ঘুমন্ত মানুুুষ হঠাৎ জেগে উঠে চোখ রগড়ায় । ভোররাত পর্যন্ত এদিন বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুঞ্জয়ী ভাষণ সচকিত করে রাখে গ্রামবাসীকে।
আশংকা ছিল, আতঙ্ক ছিল, ছিল মৃত্যুভীতি। কিন্তু কিছুই আমাদের থামাতে পারেনি। ভোররাতে স্বৈরাচারী জান্তার পেটোয়া বাহিনী মাইক খুলে গুঁড়িয়ে দেয়। নির্মম অত্যাচার- নির্যাতন চালায় গ্রামবাসীর উপর। কিন্তু কেউ মুখ খোলেনি। জানি, ইতিহাসে এ’সব ভয়াল দিনরাতের কীর্তি ঠাঁই পাবেনা। যেমন পায়নি, লাখো লাখো শহীদের নাম। সে’রাতের অসম সাহসী কাজে আমাদের সাহস যোগান নিবেদিত বঙ্গবন্ধুু ভক্ত আওয়ামী লীগের তদানিন্তন ইউনিয়ন সভাপতি মরহুম এডভোকেট আবুল বশর চৌধুরী। সাথে ছিলেন তদানীন্তন ছাত্রলীগ নেতা শাহনেওয়াজ চৌধুরী, নাজির হাট কলেজ ছাত্রসংসদ ভিপি শহীদ আমিনুল করিম জাহাঙ্গির, শহীদ জসীম, শরীফ বাবু, সেকান্দর, মালেক, আওয়ামী লীগ নেতা মরহুম গিয়াস উদ্দিনসহ আরো ক’জন দুঃসাহসী অভিযাত্রী।
এরপর প্রতিবছর ৭ মার্চ বিপদ- আপদকে পায়ের ভৃত্য বানিয়ে এই মহান জাতীয় দায়িত্ব আমরা পালন করেছি। স্বাক্ষী ইউনিয়নের অনেক বয়োজেষ্ঠ মানুষ।
৭ মার্চের ভাষণ এখন জাতিসঙ্ঘের বিশ্ব দলিল। উচ্চ আদালত দিনটিকে ঐতিহাসিক দিবস ঘোষণার আদেশ দিয়েছে সমপ্রতি। এটাই আমাদের পরম প্রাপ্তি। আর কিছু চাওয়া বা পাওয়ার নেই।