(কেন লিখি)

গোফরান উদ্দীন টিটু

শনিবার , ৬ জুলাই, ২০১৯ at ১০:৩৬ পূর্বাহ্ণ

খুব ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছি। তার স্মৃতি খুবই অল্প। একটাই মাত্র সাদাকালো ছবি। বাবা না থাকার কষ্ট কুরে কুরে খেয়েছে আমাকে। ১৯৭৮ সালে বাবার মৃত্যুর পর থেকেই যেন আমার সচেতন যাত্রা। রাগে, দুঃখে, ক্ষোভে আমি আর স্কুলে যাইনি অনেক বছর। ১৯৮৩ সালে চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি হই পশ্চিম মাদার বাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। দু’বছর ওখানেই পড়ি। আমার ছাত্রজীবনের শুভ সূচনা ঘটে। আমার লেখালেখির বীজও উৎপত্তি হয়েছিল ওখানেই। দৈনিক আজাদীর আগামীদের আসরও প্রথম দেখি সেই সময়। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির মাসিক শিশুর তখন দাম ছিল মাত্র এক টাকা। অকালপ্রয়াত বন্ধু ছাত্রনেতা আরিফ আনোয়ার মাহমুদ চৌধুরীই এনেছিল। সেখানেই কচিহাত নামটি প্রথম পাই। দোতলার পশ্চিমের শেষ প্রান্তে ছিল আমাদের ক্লাস। ক্লাস টিচার এরশাদ স্যার কবি আহসান হাবীবের লোকটি নামক ছড়াটি পড়াতেন-বাস থেকে নামলেন / খানিকটা থামলেন/ তারপর থেমে থেমে/ চললেন তিনি…আমিই আহসান হাবীব।মনে দাগ কেটেছিল। বন্ধুদের নিয়ে দুবছর আনেক কাণ্ড করেছি।স্কুল পালিয়ে কর্ণফুলি গেছি,মারামারি করেছি। আমার অকাল প্রয়াত ছোটভাই বোরহানও একই স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল। আমার প্রথম ছড়া-বাংলাদেশ/প্রাকৃতিক বেশ / এমন সুন্দর/ আর কোন দেশ? এদেশের ফলমূল / খেতে বড় তুলতুল। আজও ছাপা হয়নি কোথাও।মনে মনে লিখেছিলাম এই স্কুলেই। সে কি ভোলা যায়। প্রথম সৃষ্টি যে। সংবাদপত্রে প্রথম প্রকাশিত ছড়া ঘুড়ি। ছাপা হয় দৈনিক পূর্বকোণে,১০ অক্টোবর ১৯৮৭ তে। যেন আমার বিশ্বজয়।সেই সময়, ১৯৮৩/৮৪ সনে চয়নিকা নামে একটা বাংলা সহপাঠ বই ছিল আমাদের ভীষণ প্রিয়।পুরো বইটি যেন আজও ভাস্কর আমার চোখে। কোথায় হারিয়ে গেল? অসাধারণ সব ছড়া ও কিশোর কবিতা জীবনে প্রথম পড়ি আমি।আমার সাহিত্যের মানসগঠনে চয়নিকাই ছিল প্রথম ভিত্তি। ১৯৮৭ সালে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে পড়াকালে কচিহাত নামে একটা ছোটদের পত্রিকা বের করি আমরা। স্কুল ম্যাগাজিন প্রকাশ না হওয়ার প্রতিবাদে। পরে কচিহাত নামে একটি সাহিত্য সংগঠনও গড়ে তোলেন আমার সদ্যপ্রয়াত মেজদা জয়নাল আবেদীন জনি। আমার নিরলস ছড়া চর্চার সেই শুরু। আজও যা- প্রিয়তমার অধিক যেন / এক রূপসী এলোকেশ। বাবার মৃত্যুর দীর্ঘ সতের বছর পর আমি বাবা ছড়াটি লিখি যা কাদিয়েছে প্রিয় অনেককেই।আমার ৩৩ বছরের লেখালেখি জীবনে শুধু ছড়া নিয়েই আমি থাকতে চেয়েছি। আমি অকালে বাবা হারানোর ব্যথা যেমন ছড়ায় লিখেছি তেমনি ভাইদের বিয়োগবেদনাও মন ছুয়ে গেছে অনেকের। আমার দুটি গল্পবই এবং দুটি কাব্যগ্রন্থ থাকলেও ছড়াই আমার সুখ। সুকুমার রায় হতে না পারি সুকুমার বড়ুয়া তো হই। বাংলায় এম. এ পড়ে এবং সাহিত্যের অধ্যাপক হয়েও আজও তাই ছড়াই আমার শ্রেষ্ঠ অবলম্বন। মনের মতো একটি কালজয়ী ছড়ার স্বপ্ন আজও আমায় তাড়িয়ে বেড়ায়।

x