কেন এমন ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড

শ্রীলঙ্কায় হামলায় আইএসের দায় স্বীকার ।। নিহত বেড়ে ৩২১

আজাদী ডেস্ক

বুধবার , ২৪ এপ্রিল, ২০১৯ at ৬:৫৬ পূর্বাহ্ণ
261

শোক আর দ্বিধার মধ্যে রয়েছে শ্রীলঙ্কা। বোঝার চেষ্টা করছে কীভাবে একটি স্বল্প পরিচিত ইসলামপন্থী গ্রুপ এরকম একটি বেপরোয়া কিন্তু সমন্বিত আত্মঘাতী হামলা চালাতে পারে। ইস্টার সানডের দিনের এই হত্যাকাণ্ড, এক দশক আগের গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সবচেয়ে বড় হামলা। দক্ষিণ এশিয়ার এই দ্বীপ রাষ্ট্রটি এর আগেও এরকম হামলা দেখেছে। আত্মঘাতী হামলাকারীদের ব্যবহার করেছে তামিল টাইগাররা। কিন্তু নতুন এই হামলার নির্মমতা পুরো জাতিকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। সরকারের মুখপাত্র ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী রাজিথা সেনারত্নে বোমা হামলার জন্য স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা ইসলামপন্থী দল ন্যাশনাল তওহীদ জামাতকে দায়ী করেছেন। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক জড়িত রয়েছে, না হলে এই হামলা সম্ভব হতো না। গত সোমবার তিনি সাংবাদিকদের এ কথা বলেন। কিন্তু কীভাবে ছোট একটি গ্রুপ, যাদের বিরুদ্ধে শুধুমাত্র বুদ্ধমূর্তি ভাঙার অভিযোগ ছিল, তারা এত বড় ঘটনা ঘটাতে পারল?
এদিকে, শ্রীলঙ্কায় কয়েকটি চার্চ ও হোটেলে একযোগে আত্মঘাতী বোমা হামলার দায় স্বীকার করেছে মধ্যপ্রাচ্যের জঙ্গি দল ইসলামিক স্টেট-আইএস। গত রোববার ইস্টার সানডের প্রার্থনার মধ্যে ওই হামলার নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩২১ জনে দাঁড়িয়েছে। আহত হন পাঁচ শতাধিক মানুষ।
আইএসের বার্তা সংস্থা আমাকে গতকাল মঙ্গলবার হামলার দায় স্বীকার করে আরবিতে লেখা একটি বার্তা আসে। তবে সেখানে এ দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ দেখানো হয়নি বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে রয়টার্স। আইএসের এই দাবি সতর্কতার সঙ্গে দেখা দরকার, কারণ সাধারণত যেকোনো হামলার পরপরই দাবি করে থাকে আইএস, যারা হামলা চালিয়েছে, তাদের মিডিয়া পোর্টাল আমাক হামলাকারীদের ছবি প্রকাশ করে, যা এই ঘটনায় হয়নি। খবর বিবিসি ও বিডিনিউজের।
যেভাবে এনটিজে নাম বলা হচ্ছে, তা প্রশ্ন তৈরি করে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, হামলার বিষয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের আগেই সতর্ক করা হয়েছিল, যা মন্ত্রিসভাকে জানানো হয়নি। তিনি বলেছেন, শুধুমাত্র প্রেসিডেন্ট এ ধরনের বার্তা পেতে পারেন। কিন্তু এ ঘটনায় তিনি সেটা পেয়েছেন কি না তা পরিষ্কার নয়। একজন প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যকে খাটো করে দেখার উপায় নেই। তিনি গত বছর প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বড় ধরনের টানাপড়েনে জড়িয়েছিলেন। অনেকে ভাবছেন, রাজনৈতিক বৈরিতা কি ধরনের বিপদ ডেকে আনতে পারে, যার ফলে অনেক জরুরি বার্তাও যথাযথ গুরুত্ব পায় না।
সরকারের দাবি অনুযায়ী, এই আত্মঘাতী হামলাকারীরা যদি শ্রীলঙ্কার স্থানীয় হয়, তাহলে অবশ্যই এটা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বড় ব্যর্থতা। মার্কিন গণমাধ্যম বলছে, সম্ভাব্য হুমকির বিষয়ে শ্রীলঙ্কার কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করে দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।
শ্রীলঙ্কার নিরাপত্তা বাহিনীগুলো নজরদারি করেন দেশটির প্রেসিডেন্ট। তিনি এ ঘটনার ত্রুটি খুঁজে দেখার জন্য এর মধ্যে একটি কমিটি গঠন করেছেন। গৃহযুদ্ধ চলার সময় তামিল টাইগারদের বেশ কয়েকটি আত্মঘাতী হামলা ব্যর্থ করে দেওয়া এবং টাইগারদের মধ্যে নিজেদের লোক প্রবেশ করাতে পারার জন্য শ্রীলঙ্কার গোয়েন্দা সংস্থাগুলো একসময় অনেক প্রশংসা পেয়েছিল।
শ্রীলঙ্কার মুসলিম শত্রুতা : যখন এটা পরিষ্কার নিরাপত্তা আর রাজনৈতিক ব্যর্থতা বলে বোঝা যায়, তখন শ্রীলঙ্কার সমাজের মধ্যে সামপ্রতিক বৈরিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। গৃহযুদ্ধ চলার সময় তামিল টাইগারদের হামলার শিকার হয়েছে মুসলমানরা, নানাভাবে নির্যাতিত হয়েছে।
তবে সংখ্যাগুরু সিংহলিজ বুদ্ধ সমপ্রদায়ের হাতে সামপ্রতিক একাধিক হামলার শিকার হওয়ার পর মুসলমান নেতারা বলছেন, শ্রীলঙ্কার সরকারও তাদের ভেতর আস্থা তৈরিতে ব্যর্থ হয়েছে। গত বছর মার্চে ডিগানা শহরে মুসলমানদের দোকান ও মসজিদে সিংহলিরা হামলা করার পর একজন মারা যান।
শ্রীলঙ্কা মুসলিম কাউন্সিলের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিলমাই আহামেদ বলছেন, ডিগানা শহরের ঘটনার পর অনেক মুসলমান নিরাপত্তা দেওয়ার ব্যাপারে সরকারের ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। তাদের অনেকেই মনে করছেন, তারা নিজেরাই নিজেদের রক্ষা করতে পারবেন।
কট্টর ধর্মপ্রচারক : মনে করা হচ্ছে, শ্রীলঙ্কার পশ্চিমাঞ্চলের কট্টর ধর্ম প্রচারক যাহারান হাশিমের নেতৃত্বে ছোট একটি দল কযেক বছর আগে গঠিত হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি অমুসলিমদের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি বিদ্বেষমূলক ভিডিও প্রকাশ করেছেন। তার বেশিরভাগ ভিডিও তামিল ভাষায়। তার প্রচারণায় অনেক মুসলমান তরুণ আকৃষ্ট হয়েছেন বলে জানা যায়।
মুসলমান নেতারা বলছেন, বেশ কয়েকজন তরুণ আইএসের হয়ে লড়াই করার জন্য সিরিয়ায় গিয়েছিল, তাদের কেউ কেউ সেখানে যুদ্ধ করতে গিয়ে মারা গেছে।
তবে সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল জিএ চন্দ্রাসিরি বলেন, মুসলমানদের সঙ্গে আমাদের খুব আন্তরিক সম্পর্ক আছে। বেশিরভাগ মুসলমানই ওইসব তরুণের মতো নয়। তারা শান্তিপ্রিয় মানুষ।
কিন্তু গুটিকয়েক জিহাদির যদি সিংহলিদের ওপর ক্ষোভ থাকে, তাহলে খ্রিস্টানদের কেন লক্ষ্য করা হলো? শ্রীলঙ্কায় ধর্মীয় ও জাতিগত উত্তেজনা থাকলেও খ্রিস্টানরা সহিংসতা এড়িয়ে চলেছে।
বৈশ্বিক প্রভাব : আন্তর্জাতিক জিহাদি চক্রের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি এখনো পরিষ্কার নয়। তবে যেভাবে বিলাসবহুল হোটেল ও গির্জা লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, সুক্ষ্মভাবে হামলা চালানো হয়েছে, তাতে স্থানীয় চরমপন্থিদের ওপর বৈশ্বিক জিহাদি নেটওয়ার্কের প্রভাব অস্বীকার করা যাবে না।
শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহে পার্লামেন্টে বলেন, হামলার সঙ্গে বিদেশি যোগসাজশের বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। এদিকে, গত দুদিনে সব মিলিয়ে ৪০ জনকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করেছে শ্রীলঙ্কার পুলিশ। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একজন সিরীয় নাগরিককেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে সেনা সূত্রের বরাতে জানিয়েছে রয়টার্স।
নিহত বেড়ে ৩২১ : শ্রীলঙ্কায় কয়েকটি চার্চ ও হোটেলে একযোগে চালানো আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩২১ জনের দাঁড়িয়েছে। কলম্বো পুলিশের মুখপাত্র রাবন গুসাসেকারা গতকাল এক বিবৃতিতে জানান, গত রোববার ওই হামলায় আহত পাঁচ শতাধিক মানুষের মধ্যে বেশ কয়েকজন হাসপাতালে মারা গেছেন। এই তথ্য যখন এল, তখন হতাহতদের স্মরণে রাষ্ট্রীয় শোক পালন করছে শ্রীলঙ্কা।
অন্তত সাতজন আত্মঘাতী এসব হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। হতাহতের অধিকাংশই শ্রীলঙ্কার। তবে নিহতদের মধ্যে ৩৮ জন বিদেশি রয়েছেন বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। এদের মধ্যে অন্তত আটজন ভারতীয়, আট ব্রিটিশ, তিন ডেনিশ, দুই তুর্কি, দুই অস্ট্রেলীয়, এক চীনা, এক বাংলাদেশি এবং যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ড ও পতুর্গালের নাগরিকরা রয়েছেন।
জরুরি অবস্থার বলে পুলিশ ও সামরিক বাহিনী আদালতের নির্দেশ ছাড়াই সন্দেহভাজনদের আটক ও জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে। এর আগে গৃহযুদ্ধের সময় শেষ এ ক্ষমতা ব্যবহার করেছিল দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীগুলো। বিস্ফোরণের পর সরকার ফেইসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও ইনস্টাগ্রামের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে প্রবেশ বন্ধ করে দেয়।
হামলার তদন্তে ইতোমধ্যে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে পুলিশের আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারপোল। প্যারিসভিত্তিক এই সংস্থাটি জানিয়েছে, ইতোমধ্যে তারা একটি দল কলম্বোয় পাঠিয়েছে, যদি আরো কিছু প্রয়োজন হয়, তাও দিতে তৈরি তারা। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই ও ব্রিটিশ কর্মকর্তারাও তদন্তে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।

x