কেন এবং কীভাবে বিস্ফোরণ

দায় নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য

ঋত্বিক নয়ন

সোমবার , ১৮ নভেম্বর, ২০১৯ at ৪:৪০ পূর্বাহ্ণ

গ্যাস সংক্রান্ত দুর্ঘটনার ফলে ইদানীং বেশ কিছু মর্মান্তিক প্রাণহানি এবং বিপুল সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। যেহেতু জ্বালানি হিসেবে গ্যাস এখন জনপ্রিয় ও অতীব প্রয়োজনীয় হয়ে উঠছে তাই এর ব্যবহার ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। এটি বন্ধ করা বা কমানো সম্ভব নয়। তবে যেটি করা দরকার তা হচ্ছে গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় মান নিয়ন্ত্রণ ও সাবধানতা অবলম্বন। এছাড়া এ বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। গ্যাস ব্যবহার নিরাপদ করতে হলে এর দুটি দিকে নজর দিতে হবে। প্রথমত এর সরবরাহ ব্যবস্থা মানসম্মত হতে হবে। পাইপ লাইনের মাধ্যমে সরবরাহকৃত গ্যাসের ক্ষেত্রে পাইপ এবং প্রয়োজনীয় আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি যদি মানসম্পন্ন না হয় তাহলে উচ্চ চাপে সরবরাহকৃত গ্যাসের চাপ সহ্য করতে না পেরে সরবরাহ নেটওয়ার্ক বিস্ফোরিত হতে পারে। যেভাবে গতকাল সকালে পাথরঘাটায় ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ দুর্ঘটনার পর পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ। তবে বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞগণ বলছেন, ‘গ্যাস লিকেজের কারণেই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। এটা ধারণা করার কিছু নেই, এ বিষয়ে আমরা পুরোপুরি নিশ্চিত।’
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিদর্শক তোফাজ্জল হোসেন আজাদীকে বলেন, ভবনের রাইজার ও পাইপ লাইন খুব পুরনো। পাইপ লাইন রবার দিয়ে মোড়ানোর কথা ছিল। যেহেতু পাইপ লাইন রবার দিয়ে মোড়ানো ছিল না, আমরা ধারণা করছি, পাইপ লাইনের কোনো ফুটো দিয়ে গ্যাসটা বের হয়েছে। যেহেতু পাশে দেয়াল ছিল তাই গ্যাস রুমের মধ্যে প্রবাহিত হয়েছে। তিনি বলেন, প্রবাহিত গ্যাস ঘরের ইলেকট্রনিক্স সুইচ বোর্ডেও প্রবেশ করতে পারে এবং সেখানে স্পার্কিংয়ের মাধ্যমে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। আমরা জানতে পেরেছি, আহত একজন ঘরে দেয়াশলাই জ্বালিয়েছে। এতে আগুনের উৎস পেয়ে বিস্ফোরণ ঘটেছে।
গ্যাস থেকে বিস্ফোরণ হলে আগুনের মাত্রা ভয়াবহ হত বলে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) কর্মকর্তাদের বক্তব্য তুলে ধরলে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের কর্মকর্তা তোফাজ্জল বলেন, আমাদের কাছে ছবি আছে। যে গ্যাস লাইনে বিস্ফোরণ হয়েছে, সেটা ব্যবহার করতে করতে খুব পুরাতন ও সূক্ষ্ম হয়ে গেছে। আর গ্যাসের সাথে আগুনের স্পর্শ হলে আগুনের ঝলক হয়। এতে আগুন লাগার কোনো সুযোগ নেই। কারণ গ্যাসের তীব্রতা দ্রুত শেষ হয়ে যায়। তবে গ্যাস চুলা থেকে না কি লাইন থেকে ছড়িয়েছে, সে বিষয়টি প্রথমে সনাক্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
এর আর্গে দুপুরে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড মহাব্যবস্থাপক (বিপণন) আ ন ম সালেক ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ফায়ার সার্ভিসের বক্তব্যের বিরোধিতা করে বলেন, গ্যাস লাইনের ত্রুটি থেকে কোনো বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেনি। তিনি বলেন, গ্যাস লাইনের ত্রুটি থেকে কোনো বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটলে চুলা অক্ষত থাকতে পারে না। এখানে চুলা ছিল অক্ষত। এছাড়াও ওই বাসায় শুকাতে দেওয়া কাপড় চোপড়েও আগুন লাগেনি। গ্যাস লাইনের রাইজার অক্ষত পাওয়া গেছে।
এদিকে চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের উপপরিচালক জসিমউদ্দিন আজাদীকে বলেন, বড়ুয়া বিল্ডিংয়ের নিচতলায় সীমানা প্রাচীরের পাশেই ওই বাড়ির গ্যাস রাইজার। বিস্ফোরণটি নিচতলাতেই হয়েছে। হয়ত রাইজারে কোনো সমস্যা ছিল, হয়ত লিকেজ থেকে গ্যাস বের হয়ে জমে গিয়েছিল। সকালে বাসায় কেউ আগুন ধরালে তাতে বিস্ফোরণ ঘটে থাকতে পারে। গ্যাস লাইন পুরোনো ছিল। এই দুর্ঘটনায় গ্যাস লাইনের লিকেজ, রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া কিংবা নাশকতামূলক কোন কর্মকান্ডের উপস্থিতি আছে কি না, তা তদন্ত করা হচ্ছে।
বিস্ফোরক অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মতে, দরজা-জানালা বন্ধ অবস্থায় রান্নাঘরে যদি লিক হয়ে গ্যাস জমে তাহলে কেউ বাতির সুইচ অন করলে, অথবা দেশলাই বা লাইটার দিয়ে চুলা জ্বালাতে গেলে সঙ্গে সঙ্গে ঘরভরা গ্যাসে আগুন ধরে তার আয়তন ও চাপ বহুগুণে বেড়ে যায়। এতে বিশাল বিস্ফোরণের সৃষ্টি হয়। বিদ্যুতের বাল্ব, ফ্যান বা অন্যান্য যে কোনো যন্ত্রপাতির সুইচ অন-অফ করলে সেখানে ছোট ছোট স্ফুলিঙ্গ তৈরি হয় যা অনেক সময় দেখা যায় না। কিন্তু জমে থাকা গ্যাসে বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য তা যথেষ্ট। প্রাকৃতিক গ্যাসে কোনো গন্ধ নেই। তাই ঘরে গ্যাস আছে কিনা টের পাওয়া যায় না। এজন্য পাশ্চাত্যে বহু আগে থেকেই গ্যাসে বিশেষ গন্ধ মেশানো হয়, যেন ঘরে গ্যাস লিক হলে মানুষ বুঝতে পারে ও সাবধান হতে পারে। তারা জানান, আজকাল বাজারে কিছু গ্যাস-অ্যালার্ম পাওয়া যায়। চাইলে সেগুলোও লাগানো যেতে পারে। তবে এদের গুণাগুণ দেখে নিতে হবে। আবার এদের সেন্সরটি রান্নাঘরের চুলার সাপেক্ষে কোন জায়গায় লাগাতে হবে তার জন্যও সঙ্গে দেওয়া নিয়মাবলি পড়ে নিতে হবে অথবা বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে হবে। আমাদের দেশের সাধারণ বৈদ্যুতিক মিস্ত্রিরা বেশির ভাগই অল্প শিক্ষিত। দেখে দেখে তারা কাজ শেখে এবং অনেক ক্ষেত্রেই ভালো কাজ করে। কিন্তু নতুন যন্ত্রপাতি লাগানোর ব্যাপারে যে নিরাপত্তার বিষয়গুলো জানা দরকার তা তাদের থাকে না।
এদিকে গ্যাস লাইনের ছিদ্র অথবা গ্যাস রাইজার থেকে চট্টগ্রামে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন চট্টগ্রাম নগর পরিকল্পনাবিদেরা। গতকাল বিস্ফোরণের পর চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)-এর প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ শাহিনুল ইসলামসহ একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে শাহিনুল ইসলাম ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের বলেন, দুর্ঘটনা কবলিত ভবনটি সিডিএর বিধি অনুযায়ী হয়নি। সড়কের জায়গা দখল করে তৈরি করা হয়েছে সেপটিক ট্যাংক। তার পাশে রান্নাঘর এবং গ্যাসের রাইজার রাখা ছিল। ফলে সেপটিক ট্যাংকের জমে থাকা গ্যাস ও গ্যাস লাইনের লিকেজ একসাথে হয়ে বিকট শব্দে বিস্ফোরণের ঘটনাটি ঘটে থাকতে পারে।

x