কৃষক পরিবারের নবান্ন উৎসব

ঠাঁই নিয়েছে শহরে

মনজুর আলম, বোয়ালখালী

সোমবার , ২৫ নভেম্বর, ২০১৯ at ১০:৩৭ পূর্বাহ্ণ

বাংলার কৃষি ভিত্তিক জীবনে নবান্ন উৎসবটি বহু প্রাচীনকালের। এ উৎসবটির সাথে মিশে আছে বাঙালিয়ানার হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির নানা দিক। প্রাচীনকাল থেকেই বাঙালি জাতি ধর্ম বর্ণকে উপেক্ষা করে নবান্ন উৎসবে মেতে ওঠে। অগ্রহায়ণ এলেই কৃষকের মাঠজুড়ে ধানকাটার ধুম পড়ে যায়। অত্যন্ত ব্যস্ত সময় কাটান এ সময়ে কৃষাণ-কৃষাণীরা। নতুন ধান কাটা আর সেই সাথে প্রথম ধানের অন্ন খাওয়াকে কেন্দ্র করে পালিত হয় এই উৎসব। হেমন্ত এলেই দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠ ছেয়ে যায় হলুদ রঙে। এই শোভা দেখে কৃষকের মন আনন্দে নেচে ওঠে। নতুন ফসল ঘরে ওঠার আনন্দ। প্রাচীনকাল থেকেই বাঙালির জীবনে অগ্রহায়ণ কৃষকের নতুন বার্তা নিয়ে আগমন ঘটে। অগ্রহায়ণের নবান্ন নিয়ে আসে খুশির বার্তা। নতুন ধান ঘরে উঠানোর কাজে ব্যস্ত থাকে কৃষাণ কৃষাণীরা। আর ধান ঘরে উঠলে পিঠে পায়েস খাওয়ার ধুম পড়ে যায়। কৃষক পাড়া আর কৃষক ঘরে চলে নবান্ন উৎসব। তখন গ্রাম বাংলায় নতুন এক আবহের সৃষ্টি হয়। একে অন্যের মধ্যে তৈরি হয় এক সামাজিক মেলবন্ধনের। কৃষক ঘরের ধান ভাঙার গান ভেসে বেড়ায় বাতাসে, ঢেঁকির তালে মুখর হয়ে উঠে বাড়ির আঙ্গিনা। অবশ্য যান্ত্রিকতার ছোঁয়ায় এখন আর ঢেঁকিতে ধান ভানার শব্দ খুব একটা শোনা যায় না। অথচ খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, ঢেঁকি ছাঁটা চাল দিয়েই হতো ভাত রান্না। তার পরও নতুন চালের ভাত নানা ব্যঞ্জনে মুখে দেয়া হয় আনন্দঘন পরিবেশ। তৈরি হয় নতুন চালের পিঠা, ক্ষীর- পায়েসসহ নানা উপাদান। দেশের কোনো কোনো অঞ্চলে নবান্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে চলে খাওয়া দাওয়ার ধুম। নবান্ন উৎসবে গ্রামগঞ্জে আয়োজন করা হয় গ্রামীণ মেলার। এসব মেলায় শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে সব শ্রেণী-পেশার মানুষের ঢল নামে। আনন্দ দেখা যায় ছোট-বড় সব বয়সের মানুষের মধ্যে। গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষ এই উৎসব ভিন্নভাবে পালন করে। মেলার এককোণে রাতভর চলে গানের উৎসব। এই উৎসবে উপস্থিত থাকেন নবীন প্রবীণ সবাই। হরেক রকমের বাহারি সব খাবারের দোকানের পসরা দিয়ে বসানো হয় গ্রামীণ মেলা। তবে গ্রামীণ মেলা এখন আর শুধু গ্রামেই সীমাবদ্ধ নেই জানিয়ে বিশিষ্ট সংগঠক ডাঃ মৃণাল কান্তি বড়ুয়া বলেন উৎসবটি এখন ব্যাপক আয়োজনের মধ্যে দিয়ে পালিত হতে শুরু করেছে শহরাঞ্চলে। এতে যেন কিছুটা খাপছাড়া হয়ে যায় ব্যাপারটি। কারণ বন্যেরা বনে সুন্দর-শিশুরা যেমন মাতৃক্রোড়ে তেমনি গ্রামীণ মেলা গ্রামেই সুন্দর শহরে নয়।
ইকবাল পার্ক বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রবীণ শিক্ষিকা পূর্ণিমা ঘোষ বলেন- নবান্ন উৎসব হিন্দুদের একটি প্রাচীন প্রথা। হিন্দুশাস্ত্রে নবান্নের উল্লেখ ও কর্তব্য নির্দিষ্ট করা রয়েছে। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, নতুন ধান উৎপাদনের সময় পিতৃপুরুষ অন্ন প্রার্থনা করে থাকেন। এই কারণে হিন্দুরা পার্বণ বিধি অনুসারে নবান্নে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করে থাকেন। শাস্ত্রমতে, নবান্ন শ্রাদ্ধ না করে নতুন অন্ন গ্রহণ করলে পাপের ভাগী হতে হয়। একসময় অত্যন্ত সাড়ম্বরে নবান্ন উৎসবটি উদযাপিত হত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে।
পশ্চিম গোমদন্ডী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রবীণ শিক্ষক মৃদুল বড়ুয়া বলেন- নবান্ন উৎসবটি মূলত বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী শস্যোৎসব। বাংলার কৃষিজীবী সমাজে শস্য উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে যে সকল আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসব পালিত হয়, নবান্ন তার মধ্যে অন্যতম। “নবান্ন” শব্দের অর্থ “নতুন অন্ন”। নবান্ন উৎসব হল নতুন আমন ধান কাটার পর সেই ধান থেকে প্রস্তুত চালের প্রথম রান্না উপলক্ষে আয়োজিত উৎসব। সাধারণত অগ্রহায়ণ মাসে আমন ধান পাকার পর এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। কোথাও কোথাও মাঘ মাসেও নবান্ন উদযাপনের প্রথা রয়েছে। নবান্ন অনুষ্ঠানে নতুন অন্ন পিতৃপুরুষ, দেবতা, কাক ইত্যাদি প্রাণীকে উৎসর্গ করে এবং আত্মীয়-স্বজনকে পরিবেশন করার পর গৃহকর্তা ও পরিবারবর্গ নতুন গুড় সহ নতুন অন্ন গ্রহণ করেন। নতুন চালের তৈরি খাদ্যসামগ্রী কাক কে নিবেদন করা নবান্নের অঙ্গ একটি বিশেষ লৌকিক প্রথা। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, কাকের মাধ্যমে ওই খাদ্য মৃতের আত্মার কাছে পৌঁছে যায়। সাংবাদিক এস.এম নাঈম উদ্দিন বলেন- সকল মানুষের সবচেয়ে অসামপ্রদায়িক উৎসব হিসেবে নবান্ন উৎসবটি এক সময় খুবই সমাদৃত ছিলো। কালের বিবর্তনে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী এই উৎসবটি এখন বিলুপ্তপ্রায়। তার প্রশ্ন এ প্রজন্ম জানেনা নবান্ন কি-আগামীরা জানবে কি করে।

x