কী শেখার কথা কী শিখছি

চট্টগ্রামে ক্রিকেট শেখার স্কুল

হাসান আকবর

মঙ্গলবার , ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ১১:২১ পূর্বাহ্ণ
40

ক্রিকেট এখন কিশোর, তরুণদের কাছে স্বপ্নের ব্যাপার। ক্রিকেট এখন তাদের কাছে ফ্যাশন। এখন সব তরুণ কিশোররা স্বপ্ন দেখে ক্রিকেটার হওয়ার। একজন সাকিব কিংবা একজন তামিম হওয়ার স্বপ্ন এখন দেশের লক্ষ লক্ষ কিশোর-তরুণের চোখে মুখে। ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন বুকে ধারন করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে লক্ষ লক্ষ তরুণ। আর এসব তরুণদের স্বপ্নকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য ক্রিকেট শেখার স্কুল। চট্টগ্রামেও তার ব্যতিক্রম নয়। নগর জীবনে নিজের সন্তানকে স্কুল কিংবা কলেজে পাঠিয়ে নির্ভয়ে থাকতে পারেননা অভিভাবকরা। তাইতো স্কুল কিংবা কলেজের সামনে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকেন বাচ্চাদের মায়েরা। আর এখন সে সব মায়েদের ডিউটিও যেন ডাবল হয়ে গেছে। এখন সকালে স্কুল থেকে আনার পর বাচ্চাদের নিয়ে আবার মাঠে ছুটে যাচ্ছে মায়েরা। তাদেরও লক্ষ্য তার সন্তান একদিন বড় ক্রিকেটার হবে। একদিন জাতীয় দলে খেলবে। বলা যায় ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন এখন যে কেবল বাচ্চাদের মধ্যে রয়েছে তা কিন্তু নয়। সে স্বপ্ন এখন বুকে ধারন করছে অভিভাবকরাও।
একটা সময় ছিল এই চট্টগ্রাম থেকে সাত জন ক্রিকেটার খেলেছিল বাংলাদেশ জাতীয় দলে। এখন বলতে গেলে সবেদন নীলমনি হিসেবে আছেন কেবল তামিম। যদিও টেস্ট দলে রয়েছেন নাইম হাসান। এছাড়া ইয়াসির আলি রাব্বি এখনো জাতীয় দলে স্থায়ী হতে পারেন্‌ি। আর সে কারণেই কিনা চট্টগ্রামের ক্রিকেটের সে ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে নানামুখি চেষ্টা চলছে। কিশোর-তরুণদের ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে এই নগরীতে প্রতিষ্টিত হয়েছে অনেক ক্রিকেট শেখার স্কুল। চট্টগ্রামে প্রায় ৪০টির মত ক্রিকেট একাডেমি রয়েছে। যেখানে প্রায় কয়েক হাজার কিশোর তরুণ ক্রিকেট শিখছে। চেষ্টা করছে তাদের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে। কিন্তু সবকিছু যেন ঠিকমত হচ্ছেনা। এত ক্রিকেট শেখার স্কুল থাকা সত্ত্বেও চট্টগ্রাম থেকে বেরিয়ে আসছেনা কোন ক্রিকেটার। প্রতিদিন এম এ আজিজ স্টেডিয়াম কিংবা সাগরিকাস্থ জহুর আহমদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে গেলে দেখা যায় শত শত ছেলে ক্রিকেট শিখতে ব্যস্ত। তাদের গুরুরা দারুন ব্যস্ত। কিন্তু কি শিখছে এই সব কিশোর-তরুণরা। কতটা সঠিক পদ্ধতিতে ক্রিকেট শিখছে তারা। আর কারাই বা এসব ক্রিকেট একাডেমি পরিচালনা করছে। তাদের ক্রিকেট ক্যারিয়ারই বা কি। এমন প্রশ্ন বারবার উঠে আসছে। কিন্তু সে সব প্রশ্নের সঠিক কোন উত্তর মিলেনা।
এই চট্টগ্রামে যে ৪০টির মত ক্রিকেট শেখার একাডেমি রয়েছে সে সব পরিদর্শন করে দেখা গেছে বেশিরভাগ একাডেমিতে নেই ভাল মানের কোন কোচ। যারা শেখাচ্ছেন তারা হয়তো দ্বিতীয় বিভাগ কিংবা সর্বোচ্চ প্রথম বিভাগ ক্রিকেট খেলেছে। কদিন আগে সাবেক এক জেলা দলের ক্রিকেটারের সাথে আলাপ হচ্ছিল এই সব ক্রিকেট একাডেমির বিষয়ে। তিনি বেশ আক্ষেপের সাথে বলছিলেন, কি শিখছে এই সব ছেলেরা। দেখা যাচ্ছে ছেলেরা দৌড়াচ্ছেতো দৌড়াচ্ছে। আর কোচ কোথাও গিয়ে সিগারেট খাচ্ছে। দেখা গেছে একজন ছাত্রকে দিয়ে বাচ্চাদের ক্যাচ প্র্যাকটিস করানো হচ্ছে আর কোচ কোথাও গিয়ে আড্ডা মারছে। কিন্তু অবিভাবকরা মনে করছেন তার সন্তান ভাল ক্রিকেট শিখছে। ফলে দিনের পর দিন অনুশীলন করে গেলেও শেষ পর্যন্ত ক্রিকেটের “ক” ও শিখতে পারছেনা। চট্টগ্রামে যতগুলো ক্রিকেট একাডেমি রয়েছে সে সব একাডেমির মধ্যে বেশ কয়েকজন জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার পরিচালনা করেন একাধিক একাডেমি। যেমন সাবেক জাতীয় তারকা নুরুল আবেদীন নোবেল পরিচালনা করেন ইস্পাহানী একাডেমি। আফতাব আহমেদ চৌধুরী পরিচালনা করেন আফতাব আহমেদ ক্রিকেট একাডেমি। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের কোচ হিসেবে নিবন্ধিত মোমিনুল হক পরিচালনা করেন ব্রাদার্স ক্রিকেট একাডেমি। চট্টগ্রাম জেলা দলের সাবেক ক্রিকেটার মাসুম উদ দৌলা পরিচালনা করেন পোর্ট সিটি ক্রিকেট একাডেমি। আবু শামা বিপ্লব পরিচালনা করেন নিও ক্রিকেট একাডেমি। চট্টগ্রাম জেলা দলের সাবেক ক্রিকেটার তপন দত্ত পরিচালনা করেন জুনিয়র ক্রিকেট ট্রেনিং একাডেমি। বিকেএসপির সাবেক ছাত্র মর্তুজা রায়হান মিঠু পরিচালনা করেন ব্রাইট ক্রিকেট একাডেমি। এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আধুনিক সুযোগ সুৃবিধা সম্বলিত একটি একাডেমি চালু করেছে। যেখানে কোচ হিসেবে সাবেক একাধিক জেলা দলের ক্রিকেটারকে রাখা হয়েছে। কোয়ালিটি স্পোর্টস ক্লাবও একটি একাডেমি চালু করেছে। যেখানে তারাও কোচ হিসেবে একাধিক সাবেক ক্রিকেটারকে রেখেছে। এছাড়া ফোর এইচ গ্রুপ সিরাজ ক্রিকেট একাডেমি নামে একটি একাডেমি গড়েছে। যা কিনা একেবারেই স্বতন্ত্র। নিজেদের মাঠ আবাসিক ব্যবস্থাসহ নামী কোচ সব মিলিয়ে দারুন এক ক্রিকেট শিক্ষা প্রতিষ্টান বলা যায় এই একাডেমিটাকে। আরেকজন ক্রিকেটার একটি একাডেমি পরিচালনা করেন। তিনি হচ্ছেন আজিম উদ্দিন। তার একাডেমির নাম রাইজিং স্টার ক্রিকেট একাডেমি। এ কয়টি একাডেমিতে কেবল সাবেক ক্রিকেটাররা জড়িত। যারা কিনা জেলা দল কিংবা বিভাগীয় দল বা জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন বেশ সুনামের সাথে।
তাহলে বাকি একাডেমিগুলো কারা পরিচালনা করছে। তেমন প্রশ্ন এসেই যায়। বাকি একাডেমি গুলো তারাই পরিচালনা করছে যারা হয়তো দ্বিতীয় বিভাগ ক্রিকেট খেলেছে কিংবা সর্বোচ্চ প্রথম বিভাগ ক্রিকেটে কয়েকটি ম্যাচ খেলেছে। কিংবা কখনো ক্রিকেটই খেলেনি। তারই এখন ক্রিকেট কোচ। আবার তাদের একাডেমি গুলোতে ছাত্রের সংখ্যাও কম নয়। বিপুল সংখ্যক ছাত্র আবার কয়েক শিফটে ভাগ হয়ে ক্রিকেট শিক্ষা নিচ্ছে ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে উঠা এসব ক্রিকেট একাডেমিগুলোতে। ফল যা হচ্ছে তা কেবলই অশ্ব ডিম্ব। কিন্তু ক্রিকেট শেখার নামে বিপুল অর্থ নিয়ে নিচ্ছে ছাত্রদের কাছ থেকে। প্রকৃত অর্থে কি শিখছে ছাত্ররা এই সব একাডেমি থেকে সেটা একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। যদিও চটকদার বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়ে থাকে একাডেমিগুলোর পক্ষ থেকে। বলা হয়ে তাকে তামিম এসেছে আমার একাডেমি থেকে। আফতাব আমার একাডেমি থেকে। তবে তাদের কতটা পরিচর্যা করতে পেরেছে একাডেমি গুলো সেটাও বড় একটা প্রশ্ন হয়ে দাড়িয়েছে। সাবেক ক্রিকেটারদের অনেকেই বলেছেন যে সব একাডেমি এখন ক্রিকেট শেখাচ্ছে সে সব একাডেমির প্রশিক্ষকরা কতটা জানেন সেটাও বড় প্রশ্ন। একজন কিশোর যদি শুরু থেকেই ভুল শিখে তাহলে তা তার ক্যারিয়ারের পুরোটা সময় ভুল হয়েই থাকবে। একজন ব্যাটসম্যানের কখন পা যাবে। আর কখন ব্যাট যাবে। কোন বলটাকে কিভাবে মোকাবেলা করবে সেটা যদি শুরু থেকেই শিখতে না পারে তাহলে সে শিক্ষা সারা জিবনই ভুল হয়ে থাকবে। একজন স্থানীয় লিগে খেলা ক্রিকেটার যখন কোচ হয়ে যান তখন কি শিক্ষা পাবে তরুণরা সেটা অনুমান করতে মোটেও কষ্ট হওেয়ার কথা নয়।
আর যে সব পরিবেশে এসব কিশোর তরুণরা ক্রিকেট শিক্ষা নিচ্ছে সেটাও বা কতটা উপযুক্ত সেটাও প্রশ্ন হয়ে থাকে। বাংলাদেশ দলের আইসিসি ট্রফি অধিনায়ক এবং বিসিবির পরিচালক আকরাম খান যেমন বললেন ব্যাঙের ছাতার মত একাডেমি গড়ে উঠাতে আপনি হয়তো দেখছেন অনেক ছেলে ক্রিকেট শিখছে। সত্যিকার অর্থে সেখান থেকে ভাল কিছু আশা করাটা ভুল। আপনি হয়তো ফাক গলে দু একজন ক্রিকেটার পাবেন। তবে তা মোটেও কোয়ালিটি ক্রিকেটার হবেনা। বিশেষ করে চট্টগ্রামে যে পরিবেশে ক্রিকেট শিখে ছেলেরা তা মোটেও ক্রিকেট শেখার জন্য উপযোগী নয়। স্টেডিয়ামের বালি মাঠে ধুলা বালি খেয়ে আর যাই হোক ক্রিকেটার হওয়া যাবেনা। আর একাডেমিগুলো কতটা পরিপূর্ণ সে প্রশ্ন থেকেই যায়। তিনি বলেন সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে আপনি যদি এগিয়ে যেতে না পারেন তাহলে ক্রিকেটার পাওয়া যাবেনা। তবে ক্রিকেট বোর্ডের এমন কোন আইন আছে কিনা যে একাডেমি করতে হলে বোর্ডের অনুমতি লাগবে। আকরাম খান বলেন তেমন আইন আছে কিনা জানা নেই আমার। তবে আমি মনে করি। এ ধরনের আইন করা খুব দরকার। কারণ একটি মেডিকেল কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় করতে যেমন মেডিকেল বোর্ড বা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অনুমতি লাগে তেমনি বোর্ডের তদারকি ছাড়া একাডেমি হওয়া উচিত নয়। আর তাছাড়া চট্টগ্রামে যে সব ক্রিকেট একাডেমি গুলো রয়েছে সেগুলো কতটা দক্ষ একটি একাডেমি চালানোর মত সেটাও জানা দরকার। তিনি বলেন বেশির ভাগ একাডেমিরই লক্ষ্য টাকা কামাই করা। কাজেই আপনি ভাল কিছু আশা করতে পারবেননা এই সব একাডেমি থেকে। তিনি বলেন একটি শৃংখলার মধ্যে যদি একাডেমিগুলোকে নিয়ে আসা যায় তাহলে ভাল কিছু আশা করা যায়। তাছাড়া আকরাম খান বলেন আমাদের সময় আমরা অ্যাথলেট থেকে ক্রিকেটার হয়েছি। আর এখনকার ছেলেরা কষ্ট না করেই ক্রিকেটার হতে চায়। যা মোটেও সম্ভব নয়। তার উপর যদি অংকুরেই ভাল শিক্ষা না পায় তাহলেতো ক্রিকেটার হওয়া কখনোই সম্ভব নয়।
আকরাম খানের মত অনেকেই বলেছেন এম এ আজিজ স্টেডিয়ামের মত ধুলা বালির মধ্যে ক্রিকেট শেখা সম্ভব নয়। অনেকেই বলেন যেখানে মাঠের অভাবে দলগুলো অনুশীলন করতে পারেনা সেখানে ক্রিকেট একাডেমি হবে কি করে। একসাথে কয়েকশ ছেলে অনুশীলন করছে একটি মাঠে। কার বল কোন দিকে যাচ্ছে সেটা বলতে পারেনা। আর সেখানে পুরোপুরি মনযোগ দেওয়াটা মোটেও সম্ভব নয়। হয়তো অভিভাবকরা ছেলেকে ক্রিকেটার বানানোর স্বপ্নে বিভোর হয়ে ছুটছেন মরিচিকার পানে। কিন্তু লাভের লাভ কিছু হচ্ছেনা। হয়তো তাদেরই লাভটা হচ্ছে যারা এইসব একাডেমি নামক দোকান খুলে ব্যবসা শুরু করেছে। তাছাড়া একজন অভিভাবকের পক্ষে কখনোই সম্ভবনা তার ছেলে কি শিখতে তা জানা। পড়া লেখার বেলায় হয়তো অনেকেই বুঝতে পারেন তার ছেলে কি পড়ছে। কিন্তু ক্রিকেটে সেটা মোটেও সম্ভব নয়। তাইতো বলতে হয় কি শেখার কথা কি শিখছি।

x