কিশোর অপরাধ দমনে পদক্ষেপ নিতে হবে

সোমবার , ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৫:৪৪ পূর্বাহ্ণ
51

দেশজুড়ে কিশোর অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে নগরকেন্দ্রিক গ্যাং কালচার ভয়ংকর আকার ধারণ করেছে। পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়, মাদক নেশায় জড়িয়ে পড়া থেকে শুরু করে চুরি, ছিনতাই, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা, এমনকি নিজেদের অভ্যন্তরীণ বা অন্য গ্যাং গ্রুপের সঙ্গে তুচ্ছ বিরোধকে কেন্দ্র করে খুন-খারাবি থেকেও পিছপা হচ্ছে না কিশোর অপরাধীরা। আরও উদ্বেগের বিষয়, মাদক নেশার টাকা জোগাড়ে ছোটখাটো অপরাধে জড়ানো বিভিন্ন গ্যাংয়ের সদস্যরা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হয়ে উঠছে ভয়ংকর অপরাধী, এলাকার ত্রাস। এর পেছনের অন্যতম কারণ রাজনৈতিক ‘বড় ভাই’দের প্রশ্রয়। এতে করে এক সময় চট্টগ্রাম ঢাকাসহ বড় শহরকেন্দ্রিক থাকলেও বর্তমানে গ্যাং কালচার ছড়িয়ে পড়েছে ছিমছাম, নীরব জেলা-উপজেলা শহরগুলোতেও।
গতকাল দৈনিক আজাদীর উপসম্পাদকীয় কলামে ডাঃ আবু মনসুর মো. নিজামুদ্দিন খালেদ লিখেছেন, কিশোর অপরাধের কারণ খুঁজতে যেয়ে দেখা গেছে অপরাধী কিশোরদের অনেকেই ব্রোকেন ফ্যামিলির সন্তান। কারণ স্বামী-স্ত্রীর বিবাহ বিচ্ছেদের প্রভাব অনিবার্যভাবে তাদের সন্তান-সন্ততির ওপর পড়ে এবং তখন তাদের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ মন-মানসিকতার অভাব দেখা দেয়। আবার কিশোর অপরাধের অন্যতম কারণ যে দারিদ্র তাও বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে অভাবগ্রস্ত পরিবারের শিশু-কিশোররা তাদের অনেক শখ আহলাদ পূরণে ব্যর্থ হয়। অথচ সমবয়সী ধনী পরিবারের সন্তানদের মতোই তারাও সবকিছু পেতে চায়। এই অসম চাহিদা পূরণে অনেক সময় দরিদ্র পরিবারের শিশু-কিশোররা অপরাধী হয়ে পড়ে। আবার অনেক সময় দেখা যায়, পরিবারের অভাব পূরণের লক্ষ্যে শিশু-কিশোররা ছোটবেলা থেকেই কাজের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে এবং প্রয়োজনীয় শ্রমের অভাবে প্রথমে তারা ছোটখাট চুরি, ছিনতাইয়ের পথ বেছে নেয় এবং পরে বড় বড় অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।
সমাজ বিজ্ঞানীরা বলছেন, কিশোর অপরাধ দমনে শিশু-কিশোরদের সামাজিক কাজে অংশগ্রহণের পাশাপাশি পারিবারিক অনুশাসন দরকার। তাঁরা বলেন, ‘সামাজিক যে টানাপড়েন তৈরি হয়, তারই একটা অংশ গ্যাং কালচার। স্কুল ও পরিবারের মাঝে সেতুবন্ধন থাকা উচিত।’ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ বিষয়ে তৎপর ভূমিকা পালন করেছে বলে তারা জানিয়েছে। তবে এ তৎপরতা আরো বাড়াতে হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
যে হারে কিশোর অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা এক কথায় আমাদের জন্য উদ্বেগজনক। কারণ কিশোররা বিপথে গেলে তা আমাদের জন্য মোটেও ভালো কোনো ফলাফল বয়ে আনবে না। এ কারণে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অনেক কিছুই করণীয় রয়েছে। তবে রাষ্ট্র কর্তৃক আইন প্রয়োগের পাশাপাশি আমাদের পরিবারের অভিভাবকদের করণীয় এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একজন কিশোরের বেড়ে ওঠার সময়টিতে তার পাশে থাকার জন্য সবচেয়ে বেশি সুযোগ থাকে তার পরিবারের মানুষের। এ সময়ে পরিবারের গাইডলাইন থেকে বঞ্চিত হলে কিশোরদের বিপথে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। তাই কিশোরদের মাঝে মানবিক মূল্যবোধ ও পরমতসহিষ্ণুতা সৃষ্টিতে পরিবারের যেমন মুখ্য ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন, তেমনি তারা যেন অপরাধে না জড়ায় সেজন্য রাষ্ট্রকে কঠোর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবার ও সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ইতিবাচক পদক্ষেপ এবং রাজনৈতিক নেতা ও স্থানীয় প্রশাসনের কঠোর উদ্যোগ ছাড়া গ্যাং কালচার রোধ সম্ভব হবে না। এক্ষেত্রে প্রথমেই এগিয়ে আসতে হবে পিতামাতাকে। সন্তান কী করে, কার সঙ্গে মেশে কোথায় সময় কাটায়- এ কয়টি বিষয়ে পর্যাপ্ত মনিটর করতে পারলেই গ্যাংয়ের মতো বাজে কালচারে সন্তানের জড়িয়ে পড়া রোধ করা সম্ভব। কিশোর সন্তানের গতিবিধি সম্পর্কেই পিতামাতা, অভিভাবক ও আত্মীয়স্বজনদের বাড়তি পর্যবেক্ষণ থাকলে মাদক সেবন, অন্যায়-অপরাধ ও জঙ্গিবাদের মতো ভয়ানক কাজে জড়ানো রোধ করা সম্ভব হবে। এছাড়া অভিভাবকহীন ও পথশিশুদের বিষয়ে থানাকেন্দ্রিক পর্যবেক্ষণের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে।
অপরাধ দমনে লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলায় অংশগ্রহণ করাতে হবে কিশোরদের। এসব গ্যাং বাহিনী বা কিশোর গ্যাং এর লাগাম টানা না গেলে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতে থাকবে। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কিশোর অপরাধ দমনে আরো কঠোর হতে হবে। সেইসাথে বাবা-মাকে সন্তানের প্রতি আরও যত্নবান হতে হবে।

x