কালো হায়েনা

বিপুল বড়ুয়া

বুধবার , ১১ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৭:৫৯ পূর্বাহ্ণ

একদু’বার মিনহাজকে দেখে বাবু। দূর থেকে বেশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে। কেমন যেনো একটা গোলমাল ঠেকে বাবুর। যা ভাবছিলো তা ঠিকতো। তার দেখার কোনো ভুল হচ্ছে না তো!

অনেক অনেক কিছু মিলিয়েভাবনাগুলোকে আবারও জোড়াতালি দেয় বাবু। নিজে নিজেই এদিক সেদিক আবার ভেবে চিন্তে নেয়। সময় দ্রুত ফুরিয়ে যায়। কোন মিনহাজকে দেখছে বাবু।

একটা আবছা ছায়া বাবুর মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়। চমকে দেয় যেনো বাবুকে। তালগোল যেনো পেকে যায় বাবুর।

কার অস্পষ্ট কণ্ঠস্বর যেনো বহুদূর হতে ভেসে আসে। সে কণ্ঠস্বর যেনো অনেক চেনা জানা। অনেক কাছের।

বাবু আমি মিনহাজ। হা করে কি দেখছিস। বোবা হয়ে গেলি নাকি। ‘যুদ্ধে নেমেছি বাবু’ বলে খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসা তার।

এতসবের পরেও বাবুর মুখে কোনো কথা জোগায় না। বাবু হতবাক হয়ে চেয়ে থাকে তার মুখোমুখি ছেলেটির দিকে। বিস্ময়ে বাবু যেনো কিছুই বুঝে উঠতে পারে না।

এ্যাই বাবু কি পাথর হয়ে গেলি নাকি? মুখে কোনো রা শব্দ নেই। ব্যাটা হাদারাম কোথাকার। গবেট একখান।’

দেখ আমার পোশাকআশাক। কেমনযুদ্ধের সৈন্য সৈন্য মনে হচ্ছে না আমাকে। দেখ কাঁধে বেল্টে ওটা কি। দেখ না। রাইফেলরাইফেল। চিনিসদেখছস কখনো, দেখসনি ব্যাটা

বাবু আস্তে আস্তে সম্বিৎ ফিরে পায়। একে একে সব মনে করতে পারে। বিকেলের কথা। যুদ্ধকালীন দিনের কথা। বাইরে কোথাও যেতে বাবামার মানা। মামাতো ভাই সপু এসেছিলো বাসায়। তাকে নিয়ে এই খানদের ফ্যাক্টরি পেরিয়ে ঘাটকূলে আসা।

কিন্তু এদিকে এসে কি না মহা ফাঁপরে পড়ে যায় বাবু। কাকে দেখাকী অবস্থায় দেখাকেমন তার কথাবার্তা সবসব কিছু যেনো গুলিয়ে যেতে বসে বাবুর। সপুও দূরে দাঁড়িয়ে কাণ্ড দেখে বাবু ও সেই গোলগাল মতো ছেলেটিকে।

বাবু বেশ সময় নিয়ে দেখে মিনহাজকে। মিনহাজ এ কোথায় গিয়ে পৌঁছল। কেউ আটকালো না মিনহাজকে এ মরণ খেলা থেকে। কেউ ফেরালো না তাকে। তার বাবা মাও

বাবু দেখে মিনুকে। তাদের একজন ভালো বন্ধু। যাকে সবাই চেনে মিনহাজুল মাহমুদ মিনু নামে। বেশ চুপচাপ ক্লাসে মিনু। কারো সাথে তেমন কথাবার্তা নেই। মিনুর আড্ডা বলতে গেলে জীবনঅ্যালবার্টতৌহিদরাফসান আর সে এই কজনের সাথে।

ক্লাস সেরেই একটা ছোট্ট সাইকেলে চেপে বাসায় ফেরে মিনহাজ। বটানি প্র্যাকটিকালে ফুলস্লাইডপেঁয়াজআদা নিয়ে মজার মজার কাণ্ড মিনহাজের। বেশ আদবকায়দা করে গল্প করা মিনহাজের কাণ্ড দেখে বাবুরা কজন মিলে বেশ মজা করতো। সেই মুখচোরা মিনহাজমিনু আজ এ কোন যুদ্ধ যুদ্ধ পোশাকে তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। কি তাজ্জব কথা। আহারে চেনাই যাচ্ছে না মিনহাজকে। বেশ খাকি মোটা কাপড়ের ড্রেস জোব্বা জাব্বা খাকি প্যান্ট পায়ে মোটা বুট জুতাকাঁধে ভারী রাইফেলমাথায় আবার পুলিশি টুপিও। বাপরে কী জবরদস্ত সাজ পোশাক। পাকিস্তানি সেনা।

বাবু, আলবদরে নাম দিলাম। পাকিস্তানকে রক্ষা করতে হবে না। বাপদাদার পাকিস্তানআমরা তাগড়া জোয়ানরা পাকিস্তানি আর্মির পাশে না দাঁড়ালে হয় নাকি? তুই কি বলিস?’

বাবু হা করে চেয়ে থাকে মিনহাজের দিকে। বাবুর আস্তে আস্তে মনে পড়েদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। পাকিস্তানি সৈন্যরা ঝাঁপিয়ে পড়েছে নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর। বাঙালি জাতির নেতা শেখ মুজিববাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন।

শেখ মুজিবকে ইয়াহিয়া খান আটক করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে গেছে। দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছেস্বাধীনতা যুদ্ধ। চারদিকের খবরপাকিস্তান সরকারতাদের এদেশের দোসরদের নিয়ে শহরগ্রামে আলবদরআলশামসমিলিশিয়া বাহিনীরাজাকার বানিয়ে শান্তি কমিটি করে বাঙালিদের দমনে নেমেছে।

বাবু ভাবেতাদের মিনু মিনহাজ আজ ভয়ঙ্কর আলবদর বাহিনীতে। তারা পাকিস্তানি সৈন্যদের সাহায্য করছেতাদের সাথে সাথে নিরীহ বাঙালিদের অত্যাচারনির্যাতন করছেকরছে সে আরো কত কি? মাথা ঝিম মেরে উঠে বাবুর। মিনুও সেই দলে?

কষ্ট হয় বাবুর। পাকিস্তানিরা এদেশে তাদের দোসরদের দিয়ে কেমন ঘরে ঘরে সংঘাত লাগিয়ে দিয়েছে। ভাইয়ের মুখোমুখি ভাইকে দাঁড় করিয়েছে।

মিনু তুই আলবদর বাহিনীতে যোগ দিলি?’ অবাক হয়ে চেয়ে থাকে বাবুমিনহাজের দিকে। বাবুর বিস্ময়ের সীমা নেই।’

বাবু, কেন কি হয়েছে? তোর ভালো লাগছে না। তা দেখ এই টুসটাস পটকা ফুটিয়েমুক্তিবাহিনী করেমুক্তিযুদ্ধ করে কী হবে বলতোকোথায় পৃথিবীর সেরা পাকিস্তানি আর্মি আর নেই ঢালতলোয়ার নিধিরাম সর্দার মুক্তিযোদ্ধারা। ওরা কি যুদ্ধ করবেপাকিস্তানি আর্মির সাথেবাংলাদেশ স্বাধীন করবে?’

যতো সব ভাঁওতাবাজি। পাকিস্তানকে ভাঙবে? বোকারা। বাবু দেখিসওদের কি অবস্থা হয়। পালাবার টাইম পাবে না বললাম।’ মিনুর অতসব কথায় মেজাজ তেতে উঠে বাবুর। অনেক করে নিজকে সামলেমিনহাজের দিকে তাকায়। দেখেমিটি মিটি হাসছেমিনহাজ। দাঁতে দাঁত চাপে বাবু। হারামজাদা। ‘বাবু, কাল হতে খান ফ্যাক্টরিতে ক্যাম্প করছি আমরা। দুয়েকদিনের মধ্যে পাকিস্তানি আর্মি ক্যাম্পে এসে উঠবে। এদিকে আমরা চেকপোস্ট দেবো। নৌকায় যেতেআসতে সব্বাইকে চেক করবো। পাকিস্তানি আর্মি ক্যাম্পে আসবেক্যাম্প হয়েছে চেকপোস্ট বসছে চৌরাস্তায় চামড়া গুদামে। কী ভয়ংকর কাণ্ড হতে যাচ্ছেতাতে তার সহপাঠী মিনহাজও আলবদর হয়ে কাজে নেমেছেপাকিস্তানকে রক্ষা করবেবাঙালির স্বাধীনতা ঠেকাবে। আর ভাবতে পারে না বাবু। কুলাঙ্গার মিনহাজ। বন্ধু নামের কলঙ্ক। হায়েনার দোসর। লেখাপড়া জানা ভালো ছেলেরা আজ কতো অধঃপতনে কী মরণ খেলায় নেমেছেস্বাধীনতার শত্রু। প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে বাঙালি জাতির।

মিনহাজ তার বন্ধু সহপাঠী মিনু বেশ রসিয়ে রসিয়ে মজা করে আরো কী কী বলেখল্‌ খল্‌ করে হাসে পিশাচের মতো বোঝাতে চায় আরো অনেক কিছু। খুনে হায়েনার পোশাক পরেছে মিনু।

বাবুর চোয়াল দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হয়ে ওঠে। চোখে পড়ে না হার্মাদ মিনহাজকে আর। দৃষ্টিসীমা থেকে হারিয়ে যায় মিনু। হাত নিশপিশ করে বাবুর। মিনহাজদের নিশ্চিহ্ন করতে এক রক্তঝরা সংগ্রামের জন্য নিজকে তৈরি করতে উঠে পড়ে লেগে যায় বাবু। বাবু ফিরে তাকায় না আর মিনহাজের দিকে। বোঝে হারিয়ে যাচ্ছে মিনহাজসে এক অতল অন্ধকারে। মিনহাজকে নিয়ে আর খুব একটা ভাবেও না বাবু। মিনহাজ সে কোথায়সে কোন অন্ধকারে

x