কামিনী সুবাসিত নক্ষত্ররাত

রুনা তাসমিনা

রবিবার , ১৪ এপ্রিল, ২০১৯ at ৭:১৬ পূর্বাহ্ণ
81


কাঁপা কাঁপা হাতে পদকটি নিয়ে গভীর এক শ্বাস নিলেন তিনি। কজন পায় এই সম্মান! হাজার মানুষ আজ মঞ্চের সামনে বসে দেখছে তাকে! অথচ জীবনে এই প্রথম তিনি এতগুলো মানুষকে একসাথে দেখলেন। তিনি রত্নগর্ভা! আজ নতুন করে যেন নিজেকে আবিষ্কার করলেন এই মুহূর্তে। নিজেকে এভাবে কখনো তো ভাবেন নি! শুধু ভেবেছেন তীব্র রক্ষণশীল পরিবার থেকেই ছেলেমেয়েদের মানুষ করতে হবে! মানুষের মতো মানুষ! তিনি পেরেছেন। পাঁচ ছেলেমেয়েই আজ প্রতিষ্ঠার শিখরে নক্ষত্রের মতো জ্বলছে!
পদকটি হাতে নিয়ে নিজের নামটি চেষ্টা করেও পড়তে পারছেন না।ছানি পড়া চোখের দৃষ্টি ঝাপসা। গালের অগনিত ভাঁজের রেখা পথ ধরে পরনের শাড়িতে জমা হচ্ছে চোখের পানি। সুখগুলোও যদি জমা হতো এভাবে শাড়ির আঁচলে! না না ভুল ভাবছেন। এই তো এতো এতো সুখ তাঁর আঁচলে! মায়ের হাত ধরে রেখেছে তাঁর এক রত্ন। ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
বাবা,আমার নামটি কোথায় লেখা আছে? একটু হাতটি ওখানে রাখো না!
ছেলে যত্ন করে মায়ের শীর্ণ হাত রাখে পদকের গায়ে। যেখানে লেখা আছে তার নাম। তিনি হাতের আঙুল বুলিয়ে স্পর্শ করেন।
মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর অনুভূতি বলতে গিয়ে কিছুই বলতে পারেন না। গলা বুঁজে আসে আবেগে। নাকি মনে পড়ে যায় কষ্টের সেই দিনগুলোর কথা! সহস্র ধারায় বেয়ে পড়া চোখের পানিকে অগ্রাহ্য করে মুখে হাসির রেখা টেনে সবার উদ্দেশ্যে ‘ধন্যবাদ’শব্দটি উচ্চারণ করে সরে আসেন মাইক্রোফোনের সামনে থেকে। অনুষ্ঠান শেষে মঞ্চ থেকে নেমে আকাশের দিকে ধেয়ে যায় তাঁর বুকের গভীর এক দীর্ঘশ্বাস।

গ্রামের আলপথ ধরে যখন বাড়ি ফিরে আসছিলেন, বিকেলের গর্বিত আলো এসে পড়ে তার শরীরে। এই বিকেল যেন আনন্দে মাতোয়ারা! ওরা দেখেছে কত মলিন বিকেল এই বৃদ্ধার জীবনের। এই আলো জানে, তাঁর নিভে নিভে জ্বলার কথা। রাতের অন্ধকার জানে, চুপিসারে পড়া দীর্ঘশ্বাসের কথা। বাতাস এসে সংগোপনে বুকে টেনে নিত সে দীর্ঘশ্বাস। সে শব্দ যদি কেউ শুনতে পায়! তাদের সাথেই গড়ে উঠেছিল সখ্যতা। বাড়ির আঙিনা তাই ভরে রেখেছিল গাছপালায়। অনেক বছর পর আজ আবার ফিরে এসেছে সেই গ্রামে। বিকেলের সোনা রোদ তাঁকে ছুঁয়ে বলছে,
আমরা ভুলিনি তোমায়। হাত বাড়িয়ে দেখো! এখনো ভালোবাসি আগের মতোই।
গাছের ঝিরিঝিরি বাতাস গায়ে পরশ বুলিয়ে বলে যাচ্ছে, দেখো.. এখনো বুকের মধ্যে সামলে রেখেছি তোমার দীর্ঘশ্বাস।
তাদের ভালোবাসা দেখে তিনি আনন্দে আপ্লুত! দু’পাশের বিস্তৃত ধানী জমির মাঝখান দিয়ে নেমে যাওয়া আলপথ ধরে তিনি হাঁটছেন বাড়ির পথে।
বাবা, ওই যে লালছে রঙ, ওগুলো কি? ঠিক মতো ঠাহর করতে পারছি না।
মায়ের দুধ শাদা হাত যত্ন করে বুলিয়ে ছেলে বললো,
পুকুর পাড়ের উত্তরে কৃষ্ণচূড়া গাছ আর দক্ষিণে শিমুল গাছে ফুল ধরেছে মা।
বৈশাখ এসে গেলো! আহারে! এই বৈশাখ মাসে কত কাজ থাকতো! আর এখন অফুরন্ত অবসর।
জমিগুলোর ঠিকমতো দেখাশোনা করছিস তো?
মা, তুমি এসব নিয়ে একদম ভেবো না। স-ব ঠিক মতো হচ্ছে।
ছেলের কথায় হেসে বলেন, হবেই তো! হবেই তো। আমার বাপধন আছে না!
ওরা ঠিকঠাক মতো আসতে পারছে কি না একটু দেখতো বাবা। গ্রামের কাঁচা রাস্তায় হাঁটার অভ্যাস নেই। আবার টাল সামলাতে না পেরে আছাড় খেয়ে পড়ে ব্যথা পাবে। তাঁর পেছনে আসতে থাকা নাতিপুতিকে উদ্দেশ্য করে বলা।
বড়মেয়ে পাশ থেকে বললো, ওরা তোমার চাইতে অনেক শক্ত মা। আমাদের ভয় তোমাকে নিয়ে।
বললাম চলো গাড়িতে যাই, শুনলে না। এই এবড়োথেবড়ো পথে হেঁটেই বাড়ি যাবে অনুযোগ ছোটো মেয়ের।
মা রে! জীবন কি কখনো সোজা পথে ছিল! এবড়োথেবড়ো পথে হেঁটেই হেঁটেই তো আজ তোমাদের যোগ্য করে তুলেছি। দেশের কাছে, দশের কাছে আজ তোমরা কতো সম্মানিত! এই পাওয়াগুলোই তো আমার সঙ্গী এখন। তোমার বাবা যদি এই দিন দেখে যেতে পারতেন! মানুষটার স্বপ্ন আজ আলো হয়ে জ্বলছে এই মাটিতে তিনি যদি দেখতে পেতেন!
পুকুরের দক্ষিণ পাড়ে এসে একটু থামেন। ছানি পড়া চোখে হয়তো দেখতে চেষ্টা করেন ঝরে পড়ে লাল হয়ে থাকা কৃষ্ণচূড়ার গালিচা।
কি মা?
দেখছি ফুলগুলো দেখা যায় কিনা। লালছে রঙটিই দেখা যায়। ফুলগুলো পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি না। ডাক্তার তো বলেই দিয়েছেন এখন আর চোখ অপারেশন করা যাবে না। কি এক অজানা ব্যথায় গলার আওয়াজ বড় করুণ শোনায়। এই কষ্ট ছুঁয়ে যায় মা’কে ঘিরে থাকা ছেলেমেয়েদেরও। আনন্দের মাঝে বেদনার একটুকরো মেঘ এসে যেন চোখগুলো পানিতে ভরে দেয়।
মা, চলো! পুকুরের ঘাটে বসি কিছুক্ষণ?
তাই চলো বাবা। ছেলেকে বললেন।

অন্ধকারের চাদরে তখনো ঢাকা পড়েনি গ্রামের সবুজ মাঠ,শিমুল, কৃষ্ণচূড়া গাছ কিংবা ঝিরঝিরে বাতাসে পুকুরে উঠা ছোটো ছোটো ঢেউ। ওগুলো এখনো খেলছে বাতাসের সাথে। মাঝে মাঝে ঝপাং করে পানির নিচ থেকে লাফিয়ে উঠছে একটি দু’টি মাছ। শানবাঁধানো ঘাটে সবাই বসেছে।
জানো! এই ঘাট তো দুরের কথা, ঘরের উঠোনেও পা রাখার অনুমতি ছিল না আমাদের। তবে রাতের বেলা পারতাম। এই শানবাঁধানো ঘাট দিনের আলোতে কখনোই দেখিনি। রাতের বেলা ঘরের কাজকর্ম শেষ করে হাতমুখ ধুতে আসতাম। পূর্ণিমা রাতে পুকুরের পানিগুলো চাঁদের আলোয় চিকচিক করতো। কামীনি আর চাঁপা ফুলের গন্ধ মৌ মৌ করতো। খুউব ইচ্ছে করতো ঘাটে বসে থাকতে কিন্তু তোমার দাদার বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে ঘরে পৌঁছুতে হবে সেই ভয়ে আর বসা হয়নি কোনদিন। কামীনি আমার খুউব পছন্দের ফুল ছিল তাই এখান থেকে একটি ডাল ভেঙে নিয়ে লাগিয়েছিলাম রান্নাঘরের পাশে। বর্ষার সময়ে শাদা শাদা ফুলে ভরে থাকত আমার গাছটি। ভেজা বাতাসের সাথে ভেসে আসতো ফুলের খুশবু। আমি রান্না করতে করতে বুক ভরে নিতাম সেই প্রিয় গন্ধ। মা থামলেন।যেন এই মুহূর্তে আবার পাচ্ছেন সেই সুবাস।
মা’কে আজ কথায় পেয়েছে। কোনদিন এত কথা মায়ের মুখে শোনেনি কেউ। দেখেছে শুধু কাজের মধ্যে ডুবে থাকতে। আর বাবার মৃত্যুর পর নামাজ আর কোরান নিয়েই বেশি সময় কাটত। মা বেশি রকমের শান্ত ছিল। সেই শান্ত মা আজ কেমন যেন অস্থির। মা যেন কিছু একটা খুঁজছে কথা বলতে বলতে। অতীতের সেই সুখ দুঃখের দিনগুলো কি মা দেখতে পাচ্ছে! ওখানে কি খুঁজে বেড়াচ্ছে বাবাকে! না। কোন প্রশ্ন নয় আজ। মা বলে যাক তাঁর মনের কথা। বড় ছেলে ভাবে।
তাই আজ আর ছেলেমেয়েরা কেউ বাঁধা দেয়না কথার মাঝে। চুপ করে শুনে যাচ্ছে সবাই। শান্ত, স্নিগ্ধ মুখটিতে কেমন একটা জ্যোতি ছড়িয়ে আছে। মুখের শত শত বলিরেখার মধ্যেও নির্মল হাসিটি ঝিলিক খেলছে। বড়মেয়ে তবু একটু করে বলতে গিয়েছিল,
মা তুমি হাঁপিয়ে গেছ। চুপ করে বসো কিছুক্ষণ…. মা কথা শেষ করতে না দিয়ে বললো,
তোমরা আজ আমাকে থামিও না। কখনো সময়ই পাইনি তোমাদের সাথে কথা বলার। কখনো ব্যস্ত ছিলে পড়াশোনা নিয়ে, কখনো তোমাদের কর্মব্যস্ততা। আর তোমাদের দেখে দেখে প্রাণ জুড়াতাম আমি। মনে পড়ে! পেছনের বারান্দায় সবাই পড়তে বসতে তোমরা। রান্নার ফাঁকে ফাঁকে আমি এসে দেখে যেতাম তোমাদের পড়া। আচ্ছা কখনো তোমাদের জিজ্ঞেস করা হয়নি! তোমরা কি আমার লাগানো কামীনি ফুলের গন্ধ পেতে?
খেয়াল তো করিনি মা! মেঝ ছেলে বললো।
তুমি আমাদের কোনদিন বেত দিয়ে মারোনি ঠিক। কিন্তু তোমার মৃদু শাসনের মধ্যেই কেমন একটা ভীষণ রকমের তীব্রতা ছিল। ওই শাসনের ভয়ে পড়া কখন শেষ করবো সেই চিন্তায় থাকতাম। পরিক্ষা আসলে তো কথাই ছিল না। তোমার উদ্বিগ্ন মুখ আমাদের বিচলিত করতো। পরিক্ষা দিতে যাওয়ার পথে সবাই সবাইকে বলতাম ভালো করে পরিক্ষা দিতে। পরিক্ষার হলে কারো সাথে কথা বলে সময় নষ্ট না করতে। ছোটো ছেলে হেসে বলে।
ছেলের সাথে সাথে ফিক করে দাঁতহীন মুখে হাসি ফুটে ওঠে মায়ের মুখেও।
সেদিন থেকেই তো আমার দিনগোনা শুরু হতো পরিক্ষা কয়টা হলো! কেমন হলো! তোমাদের ফলাফল কেমন হবে! ভালো করতে না পারলে তোমার বাবার মুখটা মলিন হয়ে যাবে। সরকারি চাকরিতে ক’টা পয়সা! সেই সামান্য আয় আর অল্প কিছু জমিজমা আমাদের সম্বল। কিন্তু স্বপ্ন কি সম্বল মানে! আকাশ সমান স্বপ্ন বুকে পুষতাম। তোমার বাবা মাঝে মাঝে খুব মন খারাপ করতেন, তোমাদের কোন প্রাইভেট শিক্ষক দিতে পারেন নি। মানুষটা সপ্তায় একটা দিন বাড়িতে কাটাতেন। ওই একটা দিনও কাটতো নানা ব্যস্ততায়। তোমাদের নিয়ে বসার সময় হতো কম।কিন্তু খবর ঠিকই নিতেন।
হ্যাঁ হ্যাঁ মা। হেডস্যার মাঝে মাঝে ক্লাসে বলতেন, তোর বাবা জিজ্ঞেস করেছিলেন পড়ালেখা কেমন চলছে। বড়ছেলে মায়ের কথার মাঝখানে বলে ওঠে।
কার্তিক মাসে তো নিঃশ্বাস ফেলার সময় থাকতো না। উঠোন ভর্তি ধানের পারা। ধান ভানা, কামলাদের জন্যে রান্না,ঘরের অন্য কাজ তো ছিলই। শরীরে এত অবসাদ থাকতো, তোমাদের যে মন দিয়ে দেখবো সে সময় পেতাম না। তবুও সমস্ত অবসাদ, ক্লান্তি কোথায় গায়েব হয়ে যেতো, যখন মনে পড়তো পৌষ মাসে তো তোমাদের বার্ষিক পরিক্ষা! সে সময়ে কতবার যে তোমাদের পড়াতে বসিয়ে নিজেই ঘুমিয়ে পড়েছি পাটির ওপর! মা যেন নিজেকে নিজে দেখতে পাচ্ছেন! তাই যেন আবার লজ্জা মেশানো হাসি ঝিলিক খেয়ে যায় মুখে।

সন্ধ্যা নেমে এসেছে এরই মধ্যে। মা’কে ঘিরে পুকুরঘাটে বসে সবাই। গ্রামে খুব একটা আসা হয় না কারো ব্যস্ততার কারণে। আজ সবাই একসাথে আসাতে সারা বাড়ি যেন খিলখিল করে হাসছে খুশিতে। ছোটোরা ইচ্ছে মতো দৌড়ুচ্ছে এদিক সেদিক। কেউ কেউ গল্প করছে কাচারি ঘরের দাওয়ায় বসে। মায়ের প্রিয় কামিনী গাছের নীচে মা’কে ঘিরে বসে আছে ছেলে মেয়েরা। অন্ধকার ধীরে ধীরে গাঢ় হচ্ছে। চাঁদহীন আকাশ লক্ষ কোটি নক্ষতত্রের চাদরে ঢাকা। বড় ছেলে বললো,
রাত হয়ে যাচ্ছে। চলো সবাই এবার ঘরে যাই। চলো মা।
যাবে বাবা! ঠিক আছে। মা’র দোয়া তোমাদের সাথে আছে। ভীষণ শান্ত হঠাৎ মায়ের গলা। কিছুটা বিষন্নও।
সবাই ঘরের দিকে পা বাড়িয়েছে। কিন্তু মা চলছে অন্য পথে! বড়মেয়ে ডেকে উঠলো,
মা! ওদিকে কোথায় যাও!
মা মুখ ফিরিয়ে দেখলেন। হাসি লেগে আছে মুখে। ইশারা করে মসজিদের দিকে দেখিয়ে দিলেন।
দেখতে দেখতে মা যেন পৌঁছে গেলেন মসজিদের পাশে। কামিনী ফুলের সময় নয় এখন। তবুও তার সুবাস ছড়িয়ে পড়ে সারা বাড়ি। এতো সুবাস রেখে গেলো মা! ছোটো মেয়ে মায়ের পদকটি এনে রাখে ঘরের টেবিলের ঠিক সেখানটিতে যেখানে বহু পুরনো মায়ের একটি ছবি টাঙানো আছে দেয়ালে। ছবিতেও মা হাসছেন। স্মিত হাসিভরা সে মুখ। সবাই চুপচাপ। সবাই অনুভব করে তাদের বুকের ভেতর থেকে মা আজ বেরিয়ে এসেছিলেন। কামিনীর সুবাস, বাইরে রাতের আকাশে লক্ষ কোটি নক্ষত্র যেন তাদের ঢেকে বলছে,
সে তো কবেই আমাদের মা হয়েছে! তোমাদের মতোই ভালোবাসে আমাদের। মা আমাদের কাছেই আছেন বাবার সাথে।
জলে ভিজে থাকা চোখ চুপিসারে মুছে নিয়ে বড় ছেলে আকাশের দিকে তাকিয়ে যেন নিজেকেই শোনালো,
তুমি এসো মা। আবার কোন বরষার রাতে কামিনীর সুবাস হয়ে। বৃষ্টির জলের সাথে না হয় নক্ষত্র ভরা রাতে। তুমি এসো…

x