কান্দীলের মৃত্যু যা ভাবতে বাধ্য করছে

শনিবার , ৩০ নভেম্বর, ২০১৯ at ৫:০০ পূর্বাহ্ণ

পূর্বকথা:
কান্দিল বালুচ ছিলেন পাকিস্তানের সোশ্যাল মিডিয়া তারকা। যাকে প্রায়শ পাকিস্তানের কিম কার্দাশিয়ান বলা হতো। যার প্রায় লক্ষ লক্ষ ফলোয়ার ছিলো সোশ্যাল মিডিয়াতে। নিজের নাচ, গানের ছবি ভিডিও পোস্ট করার পাশাপাশি পাকিস্তানের রক্ষণশীল সমাজের নানান ট্যাব্যু ভাঙা নিয়ে সোচ্চার ছিলেন। রক্ষণশীলতার বিপরীতে বিভিন্ন বক্তব্য রেখেও সমালোচিত হন তিনি। তার জনপ্রিয়তা বাড়ার সাথে সাথে নিজের পোস্টে বা ভিডিওতে বিভিন্ন পণ্যের প্রমোশন বা বিজ্ঞাপন করার জন্য তাকে অর্থ দেয়া হতো। তিনি বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কাছে বেশ প্রিয় হয়েই উঠেছিলেন পণ্যের সোশ্যাল মিডিয়া প্রোমোর জন্য। ২০১৪ সালে যখন তিনি জনপ্রিয়তার তুঙ্গে তখন জানা যায় কৈশোরেই তার বিয়ে হয়েছিল এবং একটি ছেলে সন্তানের মা তিনি। সেই স্বামী যাকে তিনি অসভ্য জানোয়ার বলে আখ্যা দেন, সেই স্বামীর অত্যাচারে টিকতে না পেরে দুধের শিশুকে নিয়ে তিনি পালিয়ে আসেন। যদিও অর্থাভাবে ছেলেকে লালন পালন করতে না পেরে ফিরিয়ে দেন ছেলেকে স্বামীর কাছে। ২০১৫ সালে পাকিস্তান থেকে সবচেয়ে বেশি যে নামগুলো গুগলে সার্চ দেয়া হয়, তারমধ্যে প্রথম দশজনের একজন কান্দিল। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় খোলামেলা ছবি এবং ভিডিও দেয়া থেকে শুরু করে নারীর বিরুদ্ধে চলমান সমাজের রক্ষণশীল বিভিন্ন প্রথার বিরুদ্ধে নিয়মিত বক্তব্য প্রদানের কারণে সমালোচিত হচ্ছিলেন এমন সময় মুফতি আব্দুল কাভির সাথে একটি টিভি টকশোতে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তিনি তখন মুফতি কাভির সাথে সেলফি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করেন। এতে মুফতি কাভি বেশ সমালোচিত হন। তাকে ধর্মসংক্রান্ত সব কমিটি থেকে বিতাড়ন করা হয়। এই ঘটনার কিছুদিন পরে কান্দিলকে বিছানায় মৃত পাওয়া যায়। কান্দিলের ভাই ওয়াসিম স্বীকার করেন, পরিবারের নাম ডুবানোর জন্য সম্মান রক্ষার্থে তিনি কান্দিলকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে হত্যা করেছেন। পাকিস্তানে অনার কিলিং কিংবা সম্মান রক্ষার্থে হত্যা বিভিন্ন অঞ্চলে এবং গোত্রে সিদ্ধ। হুমনা কবির সাংবাদিক, এবং এই লেখাটি কান্দিলের মৃত্যুর পরে তিনি লিখেন।
তিনি সাঁতরাতে ভালবাসতেন। পানি তাঁর কত প্রিয় ছিল তা বোঝা যেতো তাঁর ভিডিও ও ছবিগুলো দেখলে। একই জামা পরে- একটা সাদা বাথরোব, একটা গোলাপি পোলকা-ডট জামা পরে বারবার ছবি আর ভিডিও শেয়ার করতেন।
তাঁর আসল নাম ছিল ফৌজিয়া আযীম। জন্মেছিলেন একটি সাধারণ, মধ্যবিত্ত রক্ষণশীল পরিবারে। অল্প বয়সে বিয়ে করেছিলেন, সেই ঘরে পুত্র সন্তানও ছিল। যখন বনিবনা হচ্ছিল না তখন আবার সংসার ছেড়ে চলেও আসেন। তাঁর নিজের বক্তব্যমতে তিনি চেয়েছিলেন, ‘নিজের দুই পায়ে দাঁড়াতে, নিজের জন্য কিছু করতে।’
তিনি ফেসবুকে পরিচিত ছিলেন কান্দীল বালুচ নামে। লাখ লাখ মানুষ ফেসবুকে তাঁর ফলোয়ার ছিলেন। সোশ্যাল মিডিয়াতে যে ছবিগুলো পোস্ট করতেন- খোলামেলা আবেদনময়তার কারণে পাকিস্তানের মতো দেশের পরিপ্রেক্ষিতে বেশ সাহসী মনে করা হতো।
গত কয়েক ঘণ্টা আগে ঘটে যাওয়া ঘটনায় এসব নিয়েই লেখালেখি হচ্ছে। আমরা যা জানি পুলিশের ভাষ্যমতে, কান্দিল বালুচ মৃত, এক ভাইয়ের হাতে খুন হয়েছেন, যিনি কিনা ভেবেছিলেন তাকে অসম্মানিত করা হয়েছে।
***
এই পত্রিকায় কান্দিল বালুচকে নিয়ে আমরা প্রথম স্টোরি করি ২০১৫ অক্টোবরে। তখন তাকে আমরা প্রথম দেখি সোশ্যাল মিডিয়ায় মুখ পাউট করে পোজ দেয়া ছবিতে, যেখানে তিনি দর্শকদের কাছে জানতে চাইছেন, “আমাকে কেমন লাগছে?” আমরা খুবই মজা পেয়েছিলাম এবং আগ্রহী হয়ে উঠেছিলাম। অবাক হয়ে ভাবছিলাম, “কে এই মেয়ে?”
পাকিস্তানি সংস্কৃতি যে দুটো ব্যাপার খুব আজব তা হলো ভিন্ন কিছুকে গ্রহণ করার মানসিকতা (উদাহরণস্বরূপ: আলি সালীম সাফল্যের সাথে একটা টক শো চালাতেন যেটা সঞ্চালনা করার সময় তাকে খুব বেগ পেতে হতো।) এবং তীব্র আচরণ এর কল্পিত সতীত্ব বা বিশুদ্ধতা রক্ষার প্রতি (উদাহরণস্বরূপ: ২০১১ সালে বীণা মালিককে কঠোর সমালোচনা করা হয়েছিল একটি ভারতীয় ম্যাগাজিনের কাভার হিসেবে আসার জন্য। যদিও হাল্কা করে আই এস আইএর নাম এসেছিল এক্ষেত্রে।) কান্দীল ছিলেন দুটোই- যাকে কামনাও করতো সবাই, আবার ঘৃণাও করতো! তিনি ছিলেন একজন তরুণী যিনি স্পষ্টতই পাকিস্তানের অলিখিত বা অবিদিত কোন নিয়ম-কানুন মেনে চলেন নি, যেমন তোমার একান্ত সত্তা আর বাইরের সত্তার মধ্যে পার্থক্য রাখতে হবে। ভিতর ও বাইরে চলাফেরার যে সীমারেখা তিনি তা অস্পষ্ট করে ফেলেছিলেন। তাঁর সব ছবি আর ভিডিও দিয়ে তিনি আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন তাঁর শয্যাকক্ষে, তাঁর বিছানায়। তিনি সরাসরি ক্যামেরা আর দর্শককে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করতেন , তাঁরা এরপর কি চায়: একটা সেলফি? নাকি আরো কিছু? তাঁর মিউজিক ভিডিও থেকে নেয়া একটা স্ক্রিনশটে ছিল, “নিষিদ্ধ করো। ”
তাঁর পোস্টের নিচে অসংখ্য কমেন্টে তরুণ ছেলেরা লিখতো তাঁরা তাঁর সাথে থাকতে চায়; তাঁরা এও চাইতেন যে তাকে নিয়ে ঘুরে বেড়াতে। তরুণীরা চমকে যেতো তাঁর “অসভ্যতায়”, তাঁরা তাঁর উপর চেঁচামেচি করত, তাঁর যা খুশি তা করার জন্য।
২০১৫ সালের শেষের দিকে, ফেসবুক আর ইন্সট্রাগ্রামে অনবরত পোস্ট দেয়ার মাধ্যমে কান্দীল পাকিস্তানের উঠতি সেলিব্রেটি হিসেবে নিজের শক্ত একটা অবস্থান করে ফেলেছিলেন। তিনি অবশ্য মোটেও প্রথম কোন নারী নন পাকিস্তানের যিনি এমন সাহসী এন্টারটেইনার হিসেবে সমাদৃত হয়েছেন। তাঁর আগে, আমরা পেয়েছিলাম মীরা, বীণা, মাথিরা এবং আরো অনেককে।
কিন্তু যখন তাঁরা নিজেদের আবেদনময়তা, তাড়না ও আগ্রহ ইত্যাদি ঘিরে থাকা প্রশ্নে ঘুরপাক খেতেন, তখন- কান্দীল বিন্দুমাত্র লজ্জিত হতেন না স্ক্রিনের দেবী হবার ইচ্ছের কথা প্রকাশ করতে, আবার পাশাপাশি এমন একজন হয়ে গেছিলেন যিনি প্রভাবিত করতে পারেন। একটি টিভি শোতে তিনি বলেন সানি লিওন তাঁর রোল মডেল। নিজেকে সেক্সি বলতে তিনি বিন্দুমাত্র দ্বিধা করতেন না। যদিও তিনি খোলা বইয়ের মতো মোটেও ছিলেন না, কিন্তু নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষার ব্যাপারে তিনি যথেষ্ট সৎ ছিলেন। এবং এটাই প্রমাণিত হলো আজ, যদি তুমি পাকিস্তানের নারী হয়ে থাকো তাহলে তোমার উচ্চাকাঙ্ক্ষা তোমার মৃত্যুর কারণ হবে।
***
এই পত্রিকাতেই আমরা কান্দীলের ছোট ক্যারিয়ার খুব কাছ থেকে দেখেছি। আমরা তাঁর কাছে যেতে চাইতাম প্রায়। তাঁর মেজাজ মর্জির উপর নির্ভর করতো, তিনি আমাদের ডাক এড়াবেন নাকি দীর্ঘক্ষণ আড্ডা দিবেন।
তাঁর পোস্টগুলো যতো বেশি মানুষের নজরে পড়া শুরু করলো এবং তিনিও ততো বেশি মূলধারার পত্রিকার খবরের শিরোনাম হতে শুরু করলেন, আমার ধারণা তখনই সে পাকিস্তানের নারী হিসেবে বিভিন্ন বিষয়ে মেসেজ দেয়া নিয়ে নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠেন। এই সময়েই আমরা কান্দীলকে দেখা শুরু করি এভাবে যে একজন উঠতি জনপ্রিয় সমর্থক হিসেবে কাজ করছে পাকিস্তানের মেয়েদের প্রকাশ্যে আসার ব্যাপারে।
আর তাই, আমরা প্রশ্ন তুললাম কেন পাকিস্তানিদের ভিতর এতো ঘৃণা কান্দীলের জন্য। আর আমরা প্রচুর সমালোচিত হলাম তাকে এতো গুরুত্ব দেয়ায়। কিছুদিন আগে এক কমেন্টেটর আমাকে জিজ্ঞেস করলেন কিছু কথার প্রেক্ষিতে, “তোমরা তো কান্দীলকে খুব গুরুত্ব দিচ্ছো, পরে কি, পতিতালয় থেকে রিপোর্ট করবে নাকি?”
এসব সমালোচনা স্পষ্ট করে দেয় পাকিস্তানিরা কি ভাবতো কান্দীলকে নিয়ে: তাঁরা তাকে ততক্ষণ পর্যন্ত সহ্য করতে প্রস্তুত ছিল যতক্ষণ সে কেবল একটা ভোগ্য পণ্য ছিল, কারণ তাঁরা আমোদিত হতো। কিন্তু যখন থেকে সে তাঁদের বলা শুরু করলেন বিনোদনের মাধ্যমে, নারী অধিকার নিয়ে, তাকে মৃত্যুর জন্য তৈরি হতে হল।
এবছরের শুরুতে, এটা মোটামুটি স্পষ্ট হয়ে গেলো যে কান্দীল যা খেলাচ্ছলে শুরু করেছিলেন তা তাঁর পক্ষে খুব ব্যক্তিগত হয়ে পড়েছিল। আমরা বুঝতে পেরেছিলাম তাঁর একটা উদ্দেশ্য ছিল। তিনি বুঝতে শুরু করেছিলেন যে তাঁর জনপ্রিয়তা দিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের পাশাপাশি পাকিস্তানের অগ্রসর অংশের লোকদের নিয়ে তিনি নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে বিশদে কাজ করতে পারেন।
কিছুদিন আগে যখন খবর পেলাম তাঁর বিয়ে অল্পদিনের মধ্যে ভেঙে গেছে, আমরা তাঁর সাথে শেষবারের মতো কথা বললাম। সে খুবই বিপর্যস্ত ছিল কিন্তু যে লেখক ডেকেছিলেন তাঁর সাথে বেশ অমায়িকভাবে কথা বলেছিলেন।
“আমি একজন সোশ্যাল মিডিয়া সেনসেশন, ফ্যাশন আইকন” তিনি বলেছিলেন। “আমি জানি না কতো মেয়ে আমাকে দেখে সাপোর্ট পায়। আমি খুবই বলিষ্ঠ নারী। অনেক মেয়ে আমাকে বলেছে আমি প্রভাবশালী, এবং হ্যাঁ, আমি তাই। ”
আমারও মনে হয় তিনি প্রভাবশালী নারী। হ্যাঁ, তিনি ছিলেন ধোঁয়াশা, রহস্যময়ী। কিন্তু দেরিতে হলেও তিনি বুঝতে শুরু করেছিলেন কিসের জন্য তিনি দাঁড়াতে পারেন। পুরুষতান্ত্রিকতার প্রতি তাঁর নিজস্ব অভিমত ছিল, আমি বিশ্বাস করি তিনি নিজেকে শিক্ষিত করছিলেন এবং তা শুধুমাত্র খ্যাতির জন্য না, কারণ তাঁর জীবন তাকে দেখিয়েছিল যে দুনিয়াটা মেয়েদের জন্য খুব কঠিন জায়গা এবং তিনি এটা বদলাতে চেয়েছিলেন।
***
আমরা যা জানি তা হলো কান্দীল বালুচ নিজের মতো করে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হবার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি ছিলেন মিডিয়া প্রেমী, গতকালের ছবির রেসপন্স দিয়ে তিনি নিজের আগামীকালকে চাঙ্গা করে তুলতেন।
তিনি ছিলেন একাধারে একটি পণ্য এবং আজকের পাকিস্তানের ভয়ংকর দশার প্রতিবিম্ব, যেখানে না উদারতা না রক্ষণশীলতা শেষ অব্দি অন্যকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়, যেখানে নারীরা ক্রমবর্ধমানভাবে দেখা যাচ্ছে লোকের চোখে যে কোন কারণে খুন হতে পারে, যেখানে তুমি খ্যাতি কিনতে পারো সমাজে, কিন্তু শুধুমাত্র সভ্য শ্রেণির নির্ধারিত সব নিয়ম মেনে। কিছু লোক মিডিয়াকে দায়ী করছে তার মৃত্যুতে তাকে, তাঁর ব্যক্তিত্বকে, কারণগুলোকে মহিমান্বিত করায়। আমি এইটুকু নিশ্চিত করে বলতে চাই যা ঘটেছে তা মর্মান্তিক।
আমি মনে করি না কান্দীল নিজেও খুব একটা জানতেন তিনি কি ছিলেন বা তিনি ঠিক কি উপস্থাপন করতে চান! কান্দীল মাত্র শুরু করেছিল। তাঁর অনেক দূর যাওয়ার ছিল এবং যদি না তাকে সম্মান রক্ষার্থে হত্যা করা না হতো, আমার কোন সন্দেহ নেই তিনি বহুদূর যেতেন।
তাঁর শেষ পোস্টগুলোর একটাতে কান্দীল বলেছিলেন, “নারী হিসেবে নিজেদের জন্যই আমাদের দাঁড়ানো উচিত। নারী হিসেবে সুবিচারের জন্য দাঁড়াতেই হবে। একজন আধুনিক নারীবাদী হিসেবে আমি বিশ্বাস করি. . . আমি শুধুমাত্র মুক্ত চিন্তার মুক্ত মানসিকতার একজন নারী এবং আমি যেভাবে আছি সেভাবেই নিজেকে দেখতে ভালোবাসি। “
আজ তাঁর নাম টাইপ করে সার্চ দিয়ে তাঁর ফেসবুক পোস্টগুলো দেখছিলাম। তাঁর গভীর কালো চোখ আর বাঁকানো ঘন ভ্রূ আমাকে অনুপ্রাণিত করল।
“তুমি কি আমার জন্য দাঁড়িয়েছ?” তাঁরা প্রশ্ন করেছিল, “তুমি যা কিছু করতে পারতে, করেছ কি?”
এই প্রশ্ন সাথে করে আমাদের বাঁচতে হবে এখন থেকে।
ডন পত্রিকায় প্রকাশিত

x