কাঠের আসবাবপত্রের ওপর ফুল তোলেন যাঁরা

কাজী মোশাররফ হোসেন : কাপ্তাই

সোমবার , ৫ আগস্ট, ২০১৯ at ১১:০৪ পূর্বাহ্ণ
174

কাঠের আসবাবপত্র বা কাঠের ফার্নিচার কম বেশি সবার প্রিয়। বাংলাদেশের এমন কোন পরিবার পাওয়া যাবেনা যার ঘরে কাঠের আসবাবপত্র নেই। তবে সাধারণ মানুষ বা স্বল্প আয়ের মানুষ আম, জাম, কাঁঠাল, করই ইত্যাদি গাছের আসবাবপত্র তৈরি করে থাকেন। একটু স্বচ্ছল যারা তাঁরা সেগুন, চাপালিশ, তেলশুর, গর্জন ইত্যাদি গাছের আসবাবপত্র তৈরি করেন। তবে যাঁরা অধিক ধনী এবং অত্যন্ত সৌখিন তাঁরা চন্দন গাছসহ অন্যান্য অনেক মূল্যবান গাছের আসবাবপত্র তৈরি করেন।
আসবাবপত্র বলতে সাধারণভাবে যা বোঝা যায় তা হলো খাট, পালং, সোফা, আলনা, চেষ্টব ড্রয়ার, আলমারী ইত্যাদি। কোন একসময় এসব আসবাবপত্রে তেমন কারুকাজ ছিলনা। কোনভাবে যেনতেন খাট, টেবিল, চেয়ার, আলনা বানাতে পারলেই হতো। আশির দশকের কথা বলছি। তখন যে বাড়িতে কাঠের পালং ছিল সেই বাড়ির কদর ছিল গ্রামের সর্বত্র। পালংয়ের পাশাপাশি যদি সোফা এবং চেয়ার টেবিল থাকতো তাহলেতো কথাই নেই। ঐ বাড়ির লোকজনকেই আশপাশের সবাই সমিহ করে চলতো। তখন এসব আসবাবপত্রে খুব বেশি কারু কাজ ছিলনা। ঐ আমলের সৌখিন কেউ কেউ আসবাবপত্রে কিছু কারুকাজ করতেন।
তবে এখন যুগ বদলেছে। এখন শহর গ্রাম বলে কোন কথা নেই। সর্বত্রই আসবাবপত্র তৈরি করা হচ্ছে। আর শুধু আসবাবপত্রই নয় ঐ আসবাবে কারুকাজও করা হয়। যারা কাঠের উপর কারুকাজ করে থাকেন তাদের সাধারণভাবে ফুল মিস্ত্রি বলা হয়ে থাকে। এখন খাট, পালং, বক্সখাট, সোফা, কাঠের আলমারি, ওয়ারড্রব, চেয়ার, টেবিল, আলনা এমনকি কাঠের তৈরি টুল বা পিঁড়িতেও কারুকাজ করা হয়। আর যে যতবেশি নিখুঁত কারুকাজ করতে পারেন তার কদরও ততবেশি থাকে।
কাপ্তাই উপজেলাসহ আশপাশের অনেক উপজেলায় বিপুল সংখ্যক ফার্নিচারের দোকান রয়েছে। এসব ফার্নিচারের দোকানে প্রতিদিন বেশ কয়েকজন মিস্ত্রী দিনরাত কাঠের আসবাবপত্র তৈরি করে থাকেন। আর প্রতিটি আসবাবপত্রে অবশ্যই কারুকাজ থাকতে হবে। সমপ্রতি ইসমাইল হোসেন নামক এক ফার্নিচার ব্যবসায়ী এই প্রতিনিধিকে বলেন, আসবাবপত্র অনেকেই তৈরি করতে পারেন। কিন্তু কাঠের উপর কারুকাজ করা সহজ কাজ নয়। যারা আসবাবপত্রে কারুকাজ করেন তাদের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। তাদের বেশি পারিশ্রমিক দিয়ে দোকানে রাখতে হয়।
কাঠের উপর সাধারণত কি ধরনের কারুকাজ করা হয় জানতে চাইলে ফার্নিচার ব্যবসায়ী মোঃ সোলায়মান জানান, কাস্টমাররা যা পছন্দ করেন তাই কাঠের উপর খোঁদাই করতে হয়। অনেক কাস্টমার আসবাবপত্রে ফুল চান, কেউ চান প্রজাপতি, কেউ ময়ুর, কেউ শাপলা, অনেকে দোয়েল, কবুতর, হরিণ, সিংহ এবং কেউ কেউ বাঘের মাথাও আসবাবপত্রে খোঁদাই করতে চান। আবার অনেকে কোন মানুষের ছবিও কাঠের উপর খোঁদাই করার আগ্রহ দেখান। একজন দক্ষ ফুল মিস্ত্রি যে কোন কাঠের উপর বা যে কোন আসবাবপত্রের উপর গ্রাহকের চাহিদানুযায়ী খোঁদাই করতে পারেন। একজন দক্ষ ফুল মিস্ত্রির বেতন একলাখ টাকাও হতে পারে বলে জানা গেছে।
ফার্নিচার ব্যবসায়ী মোঃ মনছুর জানান বর্তমানে দক্ষ ফুল মিস্ত্রি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। কারণ নতুন করে কেউ ফুল মিস্ত্রির কাজ শিখতে চাচ্ছেন না। অনেকে এই কাজকে তুচ্ছ কাজ হিসেবে বিবেচনা করেন। আসবাবপত্রে ঘর ঠাসা থাকলেও ফার্নিচার ব্যবসায়ী, ফুল মিস্ত্রি, বা যারা কাঠের কাজ করে থাকেন সমাজে তাদের খুব বেশি কদর নেই। যারা এই কাজ বর্তমানে করে যাচ্ছেন তাদের অনেকেই এই কাজকে সম্মানজনক কাজ হিসেবে বিবেচনা করছেন না। নিজেরা ফুল মিস্ত্রির কাজ করলেও তাদের সন্তানদের এই কাজ শেখাতে অনেকেই আগ্রহী হন না। যে কারণে চাহিদা থাকলেও দক্ষ ফুল মিস্ত্রি পাওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে বলে একাধিক ফার্নিচার ব্যবসায়ী এই প্রতিনিধিকে জানান।

x