কাজী মুহাম্মদ আলমগীর

নিভে যাওয়া জ্ঞানের প্রদীপ

অপু ইব্রাহিম : সন্দ্বীপ

সোমবার , ২৮ অক্টোবর, ২০১৯ at ১০:১৫ পূর্বাহ্ণ
46

মানুষের মৃত্যু অবধারিত। পৃথিবীতে কেউ চিরদিন থাকতে পারে না।
মৃত্যু সৃষ্টিকর্তার অমোঘ বিধান। জীবনের খেলাঘর থেকে অনন্তকালের পথে পাড়ি দিতেই হয়। শামিল হতে হয় মৃত্যুর মিছিলে। কিছু মানুষের মৃত্যু হৃদয়ে কান্নার ঢেউ তুলে যায়, অন্ধকার করে যায় চারপাশকে। তাঁদের শূন্যতা ও বিয়োগ ব্যথা পীড়া দেয় সবাইকে। তবে তাঁরা মরেও অমর থাকেন বিশাল কর্মময় জীবনের মাধ্যমে। ইতিহাস তাঁদের ভুলে না। কীর্তিমানদের মৃত্যু নেই। গভীর শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় তাঁরা বেঁচে থাকেন মানুষের অন্তরে। এমনি একজন সন্দ্বীপের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ মুছাপুর বদিউজ্জামান উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক কাজী মুহাম্মদ আলমগীর। তিনি জ্ঞানের আকাশ থেকে খসে পড়া একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। নিভে যাওয়া একটি জ্ঞানের প্রদীপ। গত ১৭ আগস্ট ‘১৯ ঢাকায় বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আইসিইউতে থাকাকালীন মৃত্যুবরণ করেন। শিক্ষক সমাজের আদর্শ মহান শিক্ষকের মৃত্যুতে শোকে শোকাভিভূত হয় সন্দ্বীপবাসী।
ছাত্রদের কাছে তিনি ছিলেন ঈর্ষণীয় জনপ্রিয় শিক্ষক। মানুষ গড়ার শ্রেষ্ঠ কারিগর। হাজার হাজার ছাত্র তাঁর জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে আলো ছড়াচ্ছেন বিশ্বময়। ক্লাসে ছাত্রদের পড়াতেন ঝরঝরে শুদ্ধ বাংলায়। বিষয়বস্তু সাবলীল উপস্থাপনা দিয়ে আলোচ্য বিষয়কে প্রমাণ করতেন চমৎকারভাবে। প্রাঞ্জল ভাষার মাধুর্য বর্ণনার আলোচনা সহজেই হৃদয়ঙ্গম করে নিতেন ছাত্ররা।
বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী আলোকিত মানুষ গড়ার নিপুণ কারিগর খ্যাতিমান প্রধান শিক্ষক কাজী মুহাম্মদ আলমগীর ১৯৬৫ সালের ৩ মার্চ ঢাকার আরমানিটোলা হাম্মাদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে শিক্ষা জীবন শুরু করেন। এরপর সন্দ্বীপের এ.কে একাডেমি-গাছুয়ায় ১৯৬৬ সালের ১ জুন থেকে ১৯৭৫ সালের ৯ মার্চ পর্যন্ত ৯ বছর সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৭৫ সালর ১০ মার্চ থেকে ২০০৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত তিনি মুছাপুর বদিউজ্জামান উচ্চ বিদ্যালয়ে সততা, দক্ষতা, ন্যায়নিষ্ঠার সাথে টানা ৩০ বছর প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
শিক্ষক সমাজের আদর্শ কাজী মোহাম্মদ আলমগীর শিক্ষকতাকে নিয়েছিলেন ব্রত, সাধনা, পেশা ও নেশা হিসেবে। তিনি ছিলেন নীতিতে অটল, প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থে কঠোর, বচনে স্বল্পভাষী এবং প্রশাসনে অসাধারণ। তিনি একাধারে ৪০ বছর শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত থেকে একদিনও প্রাইভেট টিউশনি করেননি ।
শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি সমাজ সংস্কারেও ভূমিকা রাখেন। কাজী মুহাম্মদ আলমগীর কাজী আফাজ উদ্দিন আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন। তিনি উক্ত বিদ্যালয়ের আজীবন দাতা সদস্য ও দীর্ঘদিন পরিচালনা কমিটির সভাপতি ছিলেন। সততার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত কাজী মুহাম্মদ আলমগীর আবুল কাসেম হায়দার মহিলা কলেজ গভর্নিং বডির প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য, পশ্চিম চৌকাতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি, বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি সন্দ্বীপ উপজেলা শাখার সভাপতি, সন্দ্বীপ এসোসিয়েশন চট্টগ্রামের উপদেষ্টা এবং সন্দ্বীপ ইউনিক সোসাইটির উপদেষ্টা ছিলেন।
শিক্ষার আলো বিচ্ছুরণে বিশেষ ভূমিকা রাখায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন কর্তৃক তিনি পুরস্কৃত ও সম্মানিত হন। যেমন- রোটারি ক্লাব অব রমনা ডিস্ট্রিক্ট-৩২৮০ কর্তৃক ঢাকা ক্লাবে এক আনন্দঘন অনুষ্ঠানে মানবিক ও সেবামূলক কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ সম্মাননা, সনদ ও ক্রেস্ট প্রদান (২০০০ সালের ৩১ অক্টোবর), সন্দ্বীপ উপজেলার শ্রেষ্ঠ মাধ্যমিক শিক্ষক হিসেবে চট্টগ্রামস্থ রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল এন্ড কলেজ কর্তৃক গুণীজন সম্মাননা প্রদান (২০০৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর), জাতীয় শিক্ষক দিবস উপলক্ষে সন্দ্বীপ উপজেলার শ্রেষ্ঠ ও প্রবীণ প্রধান শিক্ষক হিসেবে সন্দ্বীপ উপজেলা প্রশাসন কর্তৃক সম্মাননা প্রদান (২০০৪ সালের ১৯ জানুয়ারি), মাস্টার হারুন অর রশিদ এডুকেশন প্রাইজ কর্তৃক শ্রেষ্ঠ মাধ্যমিক প্রধান শিক্ষক হিসেবে সংবর্ধনা প্রদান (২০০৪ সালের ১৮ এপ্রিল), মুছাপুর বদিউজ্জামান উচ্চ বিদ্যালয়ের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে বিদ্যালয়ের শুভাকাঙ্ক্ষী ও প্রাক্তন ছাত্রদের উদ্যোগে শিক্ষাক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা ও অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ বিদায় সংবর্ধনা প্রদান (২০০৫ সালের ৮ নভেম্বর)। বেসরকারি শিক্ষকের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি চট্টগ্রাম আঞ্চলিক শাখা কর্তৃক সম্মাননা প্রদান (২০০৮ সালের ২২ আগস্ট), রুপালী ক্রেডিট কো-অপারেটিভ লিমিটেড কর্তৃক সংবর্ধনা প্রদান (২০০৮ সালের ১০ জানুয়ারি) এবং ফিমেল সেকেন্ডারি স্কুল এন্ড এ্যাসিসটেন্স প্রজেক্ট কর্তৃক নারী শিক্ষা প্রসারে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ সন্দ্বীপ উপজেলার শ্রেষ্ঠ মাধ্যমিক প্রধান শিক্ষক হিসেবে সম্মাননা প্রদান। তিনি ১৯৫৯ সালে সাউথ সন্দ্বীপ হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক, ১৯৬২ সালে চট্টগ্রামস্থ স্যার আশুতোষ সরকারি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক, ১৯৬৪ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে বিএসসি এবং ১৯৬৬ সালে ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বি.এড পাস করেন। শিক্ষক সমাজের বটবৃক্ষ কাজী মুহাম্মদ আলমগীর ১৯৪৩ সালে ৪ জানুয়ারি সন্দ্বীপ উপজেলার বনেদী পরিবার সারিকাইত কাজী বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা টানা ৪০ বছর সারিকাইত ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন।

x