কল্যাণের সানাই বাজাতে বাজাতে যার আগমন

ফেরদৌস আরা রীনু

রবিবার , ১৪ এপ্রিল, ২০১৯ at ৭:২৭ পূর্বাহ্ণ
69

ষড়ঋতুর বাংলাদেশে গ্রীষ্মকালে আসে বৈশাখ। নতুন বছর নিয়ে ফিরে আসে বাংলার প্রথম মাস। বৈশাখী বাতাসে হৃদয় দোলে। সেই দোলায় লুটোফুটি খায় বাংলার ক্ষেত, নদী,আকাশ, পুকুর,বৃক্ষ,পাখি। আর তার সাথে বৈশাখী সাজে সজ্জিত উড়ে নারীর শাড়ির আঁচল। বাংলার নারীরা যেন বৈশাখী রূপে রঙিন হয়ে বাংলার ঘরে ঘরে নিত্য নিয়ে আসে সুখ,স্বপ্ন,সমৃদ্ধি, ভুলিয়ে দেয় সারা বছরের দুঃখ-কষ্ট-বেদনা। বৈশাখ যেমন তার আগমনীর মধ্য দিয়ে রাঙাতে থাকে প্রকৃতিকে তেমনি বাঙালি নারীরা বৈশাখের সাথে সাথে রাঙাতে থাকে তার সংসারের সুখ।
বাংলা নববর্ষ বাঙালির জীবনে একটি আনন্দের দিন — একটি উৎসবের দিন। আমাদের জীবনে পহেলা বৈশাখের প্রথম সূর্যোদয় যেন আনন্দের ঝরণা ধারা বয়ে দেয়। বৈশাখী উৎসবগুলো যেন নারীর পদচারণায় মুখরিত হয়ে আরো বর্ণিল আরো প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। গাঁয়ের বধূ, কৃষাণী,পাতাকুড়ানি নারী শ্রমিক, শহুরে নারী এইদিন না পাওয়ার বেদনা, মান অভিমান ভুলে অপেক্ষায় থাকে কবে আসবে উৎসবের রঙে রঙিন বৈশাখ। সাধ আর সাধ্যের মধ্যে চলে বোঝাপড়া। সারা বছর ধরে প্রস্তুতি নিতে থাকে এই দিনটির জন্য। প্রস্তুত থাকে নতুন পোশাক, সাজসজ্জা আপ্যায়নের জন্য রাখে পিঠা, পায়েস আর পান্তা ইলিশ।
এদেশের নারীরা তাদের ভালোবাসার স্রোতে সিক্ত করে রাখে তার পারিবারিক জীবন। আমাদের সংস্কৃতিতে উৎসব মিলেমিশে আছে। এবং উৎসবগুলোতে নারীরা উপেক্ষিত হয়নি কোন কালেই। বরং উৎসব পার্বণে নারীর ভূমিকা অনেকাংশে কর্তৃত্বশীল।যুগ যুগ ধরে বাঙালি নারীরা তার ঘরে নববর্ষের বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান পালন করছে। অন্তরে ধারণ করছে ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা। পহেলা বৈশাখ উৎসব বেশি পুরানো না হলেও এর সাথে যুক্ত আচার-রীতির উপাদানগুলো পালিত হয় তা বেশ পুরানো। বৈশাখে “আমানি”নামে যে আচারটি প্রচলিত তা পালন করেন বাঙালি গৃহিণীরা। এক কলসি পানিতে স্বল্প পরিমাণ অপক্ক আম ও চাল ছেড়ে দিয়ে সারারাত ভিজতে দেন এবং তার মধ্যে একটি কচি আমের ডাল বসিয়ে দেন। পহেলা বৈশাখ ভোরবেলা গৃহিণীরা ঘুম থেকে উঠে সবাইকে ওই চাল খেতে দেন সারাবছর অসুখ না হওয়ার জন্য এবং ঘরে শান্তি নামার আশায় আমের শাখা দিয়ে কলসির পানি সারা ঘরে ছিটান। এদিন গৃহিণীদের ব্যস্ততার সীমা থাকে না। গ্রাম-শহর উভয় ক্ষেত্রে চোখে পড়ে গৃহিণীদের নববর্ষ আগমনের কয়েকদিন আগে থেকে ঘর-দোর ঘষে-মেজে-ধুয়ে ঝকঝকে-চকচকে করে তোলা। অতিথি আপ্যায়নের জন্য ঐতিহ্যবাহী পিঠে,পায়েস, দই, গজা,খাজা,মুড়ি-মুড়কি, নাড়ু, ইলিশ পান্তা এবং নানা মিষ্টি প্রস্তুত রাখে। নববর্ষে গ্রামে-শহরে যে মেলা বসে তার বেশিরভাগ জিনিসই তৈরি হয় নারীদের হাতে। বাঁশের কুলা, ডালা,চালুনি,ঝুড়ি, পাখা তৈরি যেমন নারীর হাতে তেমনি মাটির হাঁড়ি, পাতিল, খেলনা, টেপা পুতুল,পাটের তৈরি শিকা, ম্যাট, কার্পেট, ব্যাগ তৈরিতেও তারা পিছিয়ে নেই। পুরুষরা মেলায় যেসব ঐতিহ্যবাহী খাবার — বাতাসা,কদমা,বরফি, বাদাম,নাড়ু, জিলাপি তাও নারীর তৈরি। বাংলা সনকে বরণ করে নিতে সকল লৌকিক আচার-অনুষ্ঠানের পুরোটাই জুড়ে থাকে নারীর ছোঁয়া।
বর্ষবরণের এইদিনে সকল বাঙালি মেতে উঠে মহা উৎসবে। আর নারীদের জীবনেও বৈশাখ স্পন্দন ছড়ায়। বৈশাখের বর্ষবরণ উৎসবে যে আড়ম্বর হয় তার বড় অনুসঙ্গ হচ্ছে নারীদের সাজসজ্জা। আর এইদিনে নারী মূলত বাঙালিয়ানা সাজ ও শাড়িতে অতুলনীয়। বাঙালিয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে পুরাপুরি ফুটিয়ে তুলিতে শাড়িই ভরসা। আলতা-ফিতা-চুড়ি আর বর্ণিল পোশাকের আড়ালে বাঙালি নারী খুঁজে পায় তার আপন রূপ। বাঙালি নারীর সাজসজ্জায় এমন রূপ চিরায়ত। বৈশাখ মানে সাদা শাড়ি লাল পাড়। সাদাতে যেন নারীর স্নিগ্ধতা বেড়ে যায় অনেক গুণ। সম্রাট আকবরের সময় থেকে নববর্ষের দিন নতুন করে হিসেবের খাতা খোলার রেওয়াজ। হিসেবের সেইখাতার মলাট লাল রঙের। তাই অনেকে মনে করে এইভাবে এসেছে বৈশাখের পোশাক লাল আর সাদা। নতুন বছরকে উদযাপনের রীতিতে বাঙালি নারীরা শুভ্র জমিনের সাথে লাল পাড় বেছে নেওয়া বৈশাখের প্রতীক হয়ে উঠেছে। পহেলা বৈশাখের সাদা -লাল শাড়ি বলে দেয় সকালে শুভ্র রোদের পর রক্তিমাভা উদিত সূর্য। যা সারা বছরের জরা-জীর্ণ-দীনতা ভুলিয়ে ধরণীকে সবুজ সতেজে ভরিয়ে দিয়ে জীবনকে করে দিবে বর্ণিল। তবে এখন শহুরে নারীরা সাদা-লালের পাশাপাশি তাদের পছন্দ মতো উজ্জ্বল রঙ ও বৈচিত্রময় যে কোন শাড়ি বেছে নেন। শাড়ির সঙ্গে ব্লাউজের রঙ এবং ডিজাইনে আনেন চমক। অনেকে আবার আরামের জন্য সালোয়ার-কামিজ পরেন। বঙ্গললনাকে চুড়ি ছাড়া কল্পনা করা যায় না। যেহেতু বৈশাখ সেহেতু কাচের রেশমী চুড়ি হাতে বা পরলে বেমানান। তবে মাটির চুড়ি ও গহনাও পরা যায়। চুল বাঙালি নারীর সৌন্দর্য্যের অন্যতম অহংকার। পোশাকের সঙ্গে চুলের সাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈশাখের পোশাকে সাথে চুলে খোপা বা বেণী করে তাতে বেলি কিংবা গাজরার মালা লাগিয়ে নিজেকে একেবারে আলাদাভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারেন অনায়াসে। ভিন্ন রঙের পোশাকের সঙ্গে কপালে লাল টিপ যে কোন রমণীর সাজ পায় পূর্ণতা। শাড়ি, চুড়ি, টিপ,আলতা,পুঁতুর মালা,চুলে জড়ানো ফুলের মালাতেই যেনো পরিপূর্ণতা পায় বাঙালি নারী।
বৈশাখ মানে ঝড়। বৈশাখ মানেই প্রকৃতির রুদ্র রূপ। তবুও ঝড়ের পরে আসে প্রশান্তি। পুরা দেশটা এইদিন পরিণত হয় বিরাট এক উৎসবমঞ্চে। কল্যাণের সানাই বাজাতে বাজাতে আগমন ঘটে বৈশাখের। আমাদের অন্তরে, আমাদের বুকের গভীরে দেশের চিরায়ত শিল্প-সংস্কৃতি আর মাটির গন্ধ চির অমলিন হয়ে থাকুক। বৈশাখ থাকুক আমাদের জীবনযাপনে, ভাষায়, উৎসবে-পার্বণে, আমাদের নারীদের লাল-সাদা শাড়িতে রঙিন আল্পনায় আগামীদিনের স্বপ্ন দেখা। আমাদের অন্দরমহলে থাকা নারীরা বিনা বাধায়, উৎসাহের সঙ্গে, সম্মানের সঙ্গে নববর্ষ উৎসবে যুক্ত হয়ে বলে উঠুক “শুভ নববর্ষ”।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক

x