কল্পলোকে বরাদ্দের ১৩ বছর পরও খালি ৭৫ শতাংশ প্লট

হয় হাতবদল, হয় না ভবন

সবুর শুভ

মঙ্গলবার , ১২ নভেম্বর, ২০১৯ at ৫:১৮ পূর্বাহ্ণ
3115

নগরীতে আবাসন সংকট প্রকট। প্রতিদিনই শহরে যোগ হচ্ছে মানুষ। জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধি হচ্ছে বছরে ১০ শতাংশ হারে। অথচ শহরের আকার বাড়ছে না। বাড়ছে না আবাসন সুবিধা। মানুষ তার প্রয়োজনে নিজের মতো করে আবাসন গড়ে তুলছে। যার অধিকাংশই অপরিকল্পিতভাবে। তবে পরিকল্পিত আবাসন নিশ্চিত করার জন্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিগত ৬ দশক ধরে কাজ করছে। ১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত চউক ১৯৬৩ সালে কাতালগঞ্জ আবাসিক এলাকায় ৫৮টি প্লট বরাদ্দের মাধ্যমে শুরু করে নগরীতে আবাসন সমস্যা সমাধানের কর্মযজ্ঞ। এরপর এ পর্যন্ত মোট ১১টি আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে সিডিএ। কোনটাতেই প্লট বরাদ্দ অবশিষ্ট নেই। বর্তমানে সিডিএর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রকল্প অনন্যা-২ বাস্তবায়নের চিন্তা ভাবনা চলছে।
১১ আবাসিক প্রকল্পের মধ্যে বাকলিয়ায় কর্ণফুলী নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে তোলা হয় কল্পলোক আবাসন প্রকল্পটি। এর মধ্যে ২০০৬ সালে কল্পলোক আবাসিক এলাকা প্রথম পর্যায় ও ২০০৭ সালে কল্পলোক আবাসিক এলাকা দ্বিতীয় পর্যায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হয়। প্রথম পর্যায়ে ৩৯ দশমিক ৯০ একর ও দ্বিতীয় পর্যায়ে ৮৯ দশমিক ৪২ একর জায়গার উপর গড়ে তোলা হয় প্রকল্প। প্রথম পর্যায়ে ৪২৩টি ও দ্বিতীয় পর্যায়ে ১ হাজার ৩৫৬টি প্লট বরাদ্দ করা হয় গ্রাহকদের কাছে। বর্তমানে এখানে কাঠা প্রতি সরকারি মূল্য হচ্ছে ১৫ লাখ টাকা। বরাদ্দকালীন সময়ে প্রথম পর্যায়ের প্লটের সর্বোচ্চ মূল্য ছিল কাঠা প্রতি ৩ লাখ ২৫ হাজার ও দ্বিতীয় পর্যায়ের প্লটের কাঠা প্রতি সর্বোচ্চ মূল্য ছিল ৬ লাখ টাকা করে। এতে গ্রহীতারা প্লট বুঝে পাওয়ার পর অধিকাংশ প্লটের মালিকানা বদল হয়েছে ২/৩ বার। এক্ষেত্রে গ্রহীতাদের বাণিজ্যিক মানসিকতার বিষয়টি লক্ষ্যণীয়। ১৩ বছর আগে এ প্রকল্পটি (১ম ও ২য় পর্যায়) বাস্তবায়িত হলেও ৭৫ শতাংশ প্লটে ভবন গড়ে উঠেনি। যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য নগরীর চারদিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ এ আবাসিক এলাকায় ভবন গড়ে না উঠার ক্ষেত্রে নানা সমস্যা ও সুযোগ সুবিধার অপ্রতুলতার কথাও বলেছেন সংশ্লিষ্টরা। এর মধ্যে প্লট গ্রহীতাদের জন্য অত্যাবশ্যকীয় গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ, চারদিকে বাউন্ডারি দেয়াল ও প্রকল্পের ভেতরের রাস্তাগুলোর উন্নয়ন নিশ্চিত না করার অভিযোগ খোদ চউকের বিরুদ্ধেই।
প্লটে প্লটে ভবন গড়ে না উঠার কারন হিসেবে আবাসিক এলাকার রাস্তা সংস্কার না করা, চাদাঁবাজি ঠেকাতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকা, বাণিজ্যিক মানসিকতা মাথায় রেখে প্লট বরাদ্দ নেয়া, ঘনঘন প্লটের মালিকানা বদল, ময়লা আবর্জনা অপসারণে অপ্রতুল ব্যবস্থাপনা ও আলোকায়নের ব্যবস্থা না করা, ভবন করার আগে মাটি পরীক্ষায় অতিরিক্ত খরচ ও চারটি রেডিমিঙ কোম্পানির (জলাবদ্ধতা প্রকল্পের কাজে) আবাসিক এলাকায় জেঁকে বসাকে উল্লেখ করেছেন আবাসিক এলাকায় বসবাসকারী লোকজন ও সিডিএর দায়িত্বশীলরা।
তবে সরেজমিনে পাওয়া তথ্য মতে, গত তিন বছরে কল্পলোক আবাসিক এলাকায় ভবন গড়ে তোলার একটা মানসিকতা দেখা যাচ্ছে। এ কারনে প্রকল্পের ভেতরে নানা সমস্যা থাকলেও গড়ে উঠছে কিছু কিছু ভবন। তবে ভাড়াটিয়ার অপ্রতুলতার কারনেও অনেকক্ষেত্রে এখানে ভবন গড়ে উঠছে না বলে জানিয়েছেন চউকের প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, কল্পলোক আবাসিক এলাকা দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্প থেকে ২০০৮ সালে লোহাগাড়ার প্রবাসী দিলারা মমতাজ ঝিনুকে প্লট বরাদ্দ দেয়া হয় । পরের বছর ২ সেপ্টেম্বর রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হয়। এরপর এম এ বাশার নামে এক ব্যবসায়ীকে (একই এলাকার) আমমোক্তারনামা দেন মমতাজ। এ আমমোক্তারনামা মূলে ৩ দশমিক ৫৮ কাঠার প্লটটি ২০১৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন নামে লোহাগাড়া থানা এলাকার এক প্রবাসীর কাছে হস্তান্তর করা হয় । মোহাম্মদ কামাল আবার ২০১৭ সালের ৪ এপ্রিল প্রবাসী ব্যবসায়ী (একই এলাকার) মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমসহ ৮ জনকে এ প্লট হস্তান্তর করেন। প্লটটি এভাবে একের পর এক ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর হলেও সেখানে ভবন গড়ে উঠেনি এখনো। কল্পলোকের অধিকাংশ প্লট এভাবে একের পর এক হাত বদল হয়েছে। কিন্তু ভবন গড়ে উঠেনি।
সরেজমিনে কল্পলোক আবাসিক এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, আবাসিকের কোন সুবিধা নেই নগরীর সবচেয়ে বড় (চউকের) এ আবাসন প্রকল্পে, যেসব সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করার কথা সিডিএ, সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর। আবাসিকে প্রবেশের মুল রাস্তা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ব্লকের রাস্তাগুলোর অবস্থা একেবারে নাজুক। সড়কে বড় বড় গর্তগুলো, সামান্য বৃষ্টিতে যেগুলোতে পানি জমে হয় কাহিল অবস্থা। নগরীর সবকটি সড়কের পাশে সিটি কর্পোরেশনের বাতি থাকলেও এ আবাসিকে সড়কের পাশে কোন বাতি নেই। সন্ধ্যার পর অন্ধকার নেমে আসলে চুরি, ছিনতাই, মাদক সেবনসহ অনৈতিক কাজ চলে বলে অভিযাগ করেন বাসিন্দারা। মাদক ও ছিনতাইকান্ডে এখানে লাশ পড়ার ঘটনাও রয়েছে। প্লট বরাদ্দের সময় স্কুল-কলেজ, কাঁচা বাজার, শপিংমল, খেলার মাঠ, মসজিদ, কবরস্থানসহ অত্যাধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তব অবস্থা এর বিপরীত বলে অভিযোগ করেন কল্পলোক আবাসিক এলাকার সমাজ কল্যাণ সমিতির নেতারা। তারা বলেন, বর্তমানে ভাঙা সড়ক, ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকা, বাতির অভাবে পুরো এলাকা অন্ধকার, নিরাপত্তা সমস্যা, পুরো আবাসিক এলাকাকে সংরক্ষণের জন্য বাউন্ডারি দেয়াল না থাকা ও চারটি রেডিমিঙ কোম্পানির ১৮ চাকার গাড়ির দাপট পুরো আবাসিক এলাকটিকে বেহাল করে রেখেছে। তাছাড়া রেডিমিঙ থেকে ছড়ানো ধূলাবালির কারনে আবাসিক এলাকার বাসিন্দারা অস্থির। এসব কারনে এ আবাসিক এলাকায় ভবন গড়ে উঠার গতি মন্থর বলে জানালেন এখানে প্লট কিনে ভবন করা বাশঁখালীর বাসিন্দা এডভোকেট আজিজুল হক।
সিডিএর কর্মকর্তারা বলেন, আবাসিক প্রকল্পে বাণিজ্যিকভাবে লাভের আশায় প্লট বরাদ্দ নেয়া হয় অধিকাংশ ক্ষেত্রে। এ কারনে প্লটগুলো ২/৩ বার হাতবদল হয়। এটা অবশ্য সিডিএর লাভ বলেও জানান নাম প্রকাশ না করা অনেক কর্মকর্তা। কারন সিডিএর আয়ের ৮৫ শতাংশ আসে প্লট বিক্রি ও হস্তান্তর ফি থেকে। প্রতিটি প্লটের মালিকানা হস্তান্তর করতে প্রতি কাঠার নির্ধারিত মূল্যের ১০ শতাংশ সিডিএকে দিতে হয় ।
এছাড়া আবাসিক এলাকায় প্লট গ্রহীতারা ভবন গড়ে তোলার জন্য নিজেদের উদ্যোগে মাটি ভরাট করতে চাইলে স্থানীয় সন্ত্রাসীরা বাধা দেয় কিংবা চাদাঁদাবি করে। এ ভয়ে অনেকে ভবন গড়ে তোলার ঝামেলায় যেতে চায় না। সিডিএ কল্পলোক আবাসিক এলাকার সমাজ কল্যাণ সমিতির সভাপতি এডভোকেট আতিক উল্লাহ চৌধুরী জানান, একটা আবাসিকে যেসব সুযোগ-সুবিধা থাকার কথা, তার কোনটিই কল্পলোক আবাসিকে নেই। বরং সব ধরনের ভোগান্তি রয়েছে।
প্রকল্পের ভেতরে নানা সমস্যার বিষয়ে জানতে চাইলে কল্পলোক আবাসিকের প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ শামীম বলেন, আবাসিক প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ হলে সিটি কর্পোরেশনকে হস্তান্তর করার কথা। কিন্তু বিভিন্ন কারণে হস্তান্তর করা হয়নি। এর অন্য একটি কারণ হচ্ছে কল্পলোক আবাসিক এলাকা প্রথম পর্যায়, দ্বিতীয় পর্যায় শেষ হওয়ার পর তৃতীয় পর্যায়ের কাজ শুরু করার কথা ছিল, সেটি না হওয়ায় সিটি কর্পোরেশনকে হস্তান্তর করা হয়নি। আর কল্পলোক আবাসিকের সড়কগুলো রিং রোড প্রকল্পের কাজের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। তাদের বড় বড় গাড়ির কারণেও সড়কের অনেকটা ক্ষতি হয়েছে। রিং রোড প্রকল্পের কারণে যে সড়ক নষ্ট হয়েছে, প্রকল্পের পক্ষ থেকে সেগুলো মেরামত করে দেয়া হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

x