কর্ণফুলী রক্ষায় আরো দায়িত্বশীল হতে হবে

বৃহস্পতিবার , ৭ নভেম্বর, ২০১৯ at ৫:০৭ পূর্বাহ্ণ
38

১৪ কারণে কর্ণফুলী নদী দূষিত হচ্ছে। ফলে নদীটি অস্তিত্ব হারাতে বসেছে বলে আশংকা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে গত ২ নভেম্বর দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়নসহ ১৪ কারণে দূষিত হচ্ছে কর্ণফুলী নদী। এ দূষণের ফলে শুধু নদীটির অস্তিত্বের সংকট তৈরি হচ্ছে না। বরং জলজ জীব, নাগরিক স্বাস্থ্য, সামাজিক জনজীবন ও দেশের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে। কর্ণফুলী রক্ষায় প্রণীত ১০ বছর মেয়াদী ‘মাস্টার প্ল্যান’ বা মহাপরিকল্পনা পর্যালোচনায় এ তথ্য জানা গেছে।এদিকে সরকার কর্ণফুলী নদীকে ঘিরে ওঠা চট্টগ্রাম বন্দরকে একটি আঞ্চলিক বন্দর হিসেবে তৈরি করে আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক হাব হিসেবে গড়ে তুলতে নানামুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। কিন্তু কর্ণফুলী দূষণের প্রভাবে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ব্যাহত হবে এবং আন্তর্জাতিক মহলে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে বলেও শংকা প্রকাশ করা হয়েছে মাস্টার প্ল্যানে।
বিভিন্ন সময়ে কর্ণফুলী নদীর দূষণ, দখল ও দু পাড়ের অবৈধ উচ্ছেদ নিয়ে সম্পাদকীয় ও উপ-সম্পাদকীয়সহ নানা প্রবন্ধ নিবন্ধ আমরা প্রকাশ করেছি। নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে আমরা বলার চেষ্টা করেছি যে, কর্ণফুলী নদী চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের ধারক ও প্রাণভোমরা হিসেবে খ্যাত। এ নদী প্রকৃতির অপার দান। দেশের অর্থনীতিতে এই নদীর অবদান অপরিসীম। উদার হস্তে এই নদী দিয়ে যাচ্ছে দেশ ও জাতিকে। কিন্তু সময়ের ধারাবাহিকতায় এই নদী এখন ক্রমশ নিষ্প্রভ হয়ে পড়ছে। নদীটির প্রাণস্পন্দন এখন অনেকটা ম্রিয়মাণ। ক্রমাগত দখল, দূষণ আর ভরাটের কারণে কর্ণফুলী আজ তার ঐতিহ্য হারাতে বসেছে।
কর্ণফুলী নদী দূষণের কারণ হিসেবে মাস্টার প্ল্যানে যে ১৪ কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে সেগুলো হচ্ছে- চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলায় কোন সুয়ারেজের ব্যবস্থাপনা না থাকা, নাগরিক বর্জ্য, সাগরের বর্জ্য, অপচনশীল বর্জ্য, অপরিকল্পিত পাহাড় কাটা ও নিচু ভূমি ভরাট, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, অপরিকল্পিত নগরায়ন, শহরে অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জাহাজ নির্মাণ ও মেরামত শিল্প, কাপ্তাই লেকের নাব্যতা হ্রাস, কর্ণফুলী পেপার মিল, নৌ-যানে এসটিপি (সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) এর অপ্রতুলতা, ফিটনেসবিহীন নৌ-যান এবং নদী ও খাল সংলগ্ন অস্থায়ী বাজার।
আজাদীর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শহরে ৫০ হাজার সেনেটারি এবং ২৪ হাজার ল্যাট্রিন রয়েছে যা সরাসরি কর্ণফুলী নদীতে উন্মুক্ত। এছাড়া চট্টগ্রাম শহরে কোন প্রকার সুয়ারেজ ব্যবস্থাপনা নেই। ফলে বহুতল ভবন, বাণিজ্যিক ভবন, দোকানপাট, বাজার-ঘাট, শপিং-মল, হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক, হোটেল ও বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সুয়ারেজ বর্জ্য পড়ছে কর্ণফুলী নদীতে। শহরের ২০টি খাল ও ড্রেন হয়ে এসব বর্জ্য যাচ্ছে। এছাড়া চট্টগ্রামের ১১ উপজেলার গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগীর খামারসমূহের অধিকাংশে বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট নেই। এসব খামারের বর্জ্যগুলোও পড়ছে নদীতে।
পরিবেশবিদদের মতে, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই কর্ণফুলীর দূষণ অর্ধেকে নেমে আসবে। কারণ বন্দরনগর চট্টগ্রাম ও আশপাশের তিন শতাধিক শিল্প-কারখানার রাসায়নিক বর্জ্য প্রতিনিয়ত দূষণ করছে দেশের অর্থনীতির ‘লাইফলাইন’ খ্যাত কর্ণফুলী নদীকে। একই সঙ্গে ছয়টি সংস্থাও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নদীদূষণে ভূমিকা রাখছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁরা বলেন, সরকারি সব প্রতিষ্ঠান মিলে দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করতে হবে। কেননা, স্বাভাবিক পানিতে যে পরিমাণ দ্রবীভূত অঙিজেন থাকার কথা, কর্ণফুলী নদীতে তা অনেক ক্ষেত্রেই কমে গেছে। অঙিজেনের অভাবে পানিতে জলজ প্রাণি বাস করতে পারছে না। সাধারণ পানির ক্লোরাইডের মাত্রা লিটারপ্রতি ১৫০ থেকে ৬০০ মিলিগ্রাম থাকার কথা। কিন্তু কর্ণফুলীতে এর মাত্রা অনেক বেশি। পানিতে দ্রবীভূত হয় এমন কঠিন পদার্থের মাত্রা যেখানে প্রতি লিটারে ১০০ মিলিগ্রাম হওয়ার কথা, সেখানে কর্ণফুলীর পানিতে রয়েছে ২৪৩ মিলিগ্রাম।
কর্ণফুলী নদীর দূষণ রোধ, অবৈধ দখল বন্ধ ও নাব্যতা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান নানা সময়ে করা হলেও কাজের কাজ কিছুই না। কর্ণফুলীর বর্তমান অবস্থা দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে এ নদীর কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। কর্ণফুলী রক্ষায় নগরবাসীকেও আরো সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের যে অভাব রয়েছে তা দূর করতে হবে।

x