করোনায় উদ্বেগ বাড়ছে গার্মেন্টস খাতে

চীন থেকে সঠিক সময়ে কাঁচামাল পৌঁছা নিয়ে শংকা

হাসান আকবর

শুক্রবার , ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ at ৪:৫৮ পূর্বাহ্ণ

করোনা ভাইরাসের ধাক্কায় বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাতে উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে। চীনের জীবনযাত্রা অচল হয়ে পড়ায় সেখান থেকে পণ্য আসা কমে গেছে। সময়মত কাঁচামাল পৌঁছা নিয়ে শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। মার্চের ১৫ তারিখের মধ্যে কাপড়সহ আনুষাঙ্গিক কাঁচামাল দেশে না পৌঁছলে বহু গার্মেন্টস সংকটে পড়বে।
গার্মেন্টস মালিকদের সংগঠন বিজিএমএইর দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলেছেন, দেশের ঢাকা চট্টগ্রাম নারায়ণগঞ্জ গাজীপুর মিলে বর্তমানে হাজার চারেক টিকে আছে। এই চার হাজার গার্মেন্টসের মধ্যে এক হাজারের মতো কারখানার নিজস্ব কাজ নেই। সাব কন্ট্রাক্ট করে। বাকি হাজার তিনেক গার্মেন্টস ইউরোপ আমেরিকাসহ বিশ্বের নানা দেশের পোশাক তৈরি করে। এসব গার্মেন্টস কারখানায় চল্লিশ লাখেরও বেশি শ্রমিক কর্মচারী কাজ করেন। যাদের আশি শতাংশেরও বেশি নারী। গার্মেন্টস খাতে রপ্তানির পরিমাণ কিছুটা কমলেও এখনো দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান খাতই হচ্ছে গার্মেন্টস। গত বছর ৩২ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে। বাংলাদেশে গত ২৩ বছর ধরে গার্মেন্টস সেক্টর বিকশিত হলেও ফেব্রিকস এবং অন্যান্য কাঁচামাল খাত তেমন একটা বিকশিত হয়নি। এতে করে দেশের গার্মেন্টস সেক্টরের পুরোটাই চীন নির্ভর।
আর এই নির্ভরতাই বাংলাদেশের গার্মেন্টস সেক্টরকে কঠিন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
চীনের বিভিন্ন কারখানায় গত ২৫ জানুয়ারির আগেই বিভিন্ন অর্ডার দেয়া হয়। কথা ছিল ৩ ফেব্রুয়ারি কারখানা খুললে এসব পণ্য উৎপাদন করে তারা বাংলাদেশে পাঠাবে। কিন্তু করোনাভাইরাসে চীনের নিউ ইয়ারের ছুটি লাগাতার করা হয়েছে। দফায় দফায় এই ছুটি বাড়িয়ে বর্তমানে ২১ ফেব্রুয়ারি কল কারখানা খোলা হবে বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে এসব কারখানা কবে খুলবে তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। মার্চের ১৫ তারিখের মধ্যে দেশের বহু কারখানায় কাপড় সূতা না পৌঁছলে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে। মধ্য এপ্রিল পর্যন্ত চালাতে পারবে এমন একটি কারখানাও দেশে নেই বলেও সূত্রগুলো জানিয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে একাধিক শীর্ষস্থানীয় গার্মেন্টস ব্যবসায়ী বলেছেন, চীনের করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে এপ্রিলের মধ্যে দেশের অনেক গার্মেন্টসেই উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে। এতে আসন্ন রোজা এবং ঈদের বেতন বোনাস নিয়ে ভয়াবহ এক পরিস্থিতির মুখে পড়তে যাচ্ছে তৈরি পোশাক খাত। বিজিএমইএর পক্ষ থেকে বিষয়টি ইতোমধ্যে বাণিজ্যমন্ত্রীকে জানানো হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে গার্মেন্টস মালিকরা সহায়তা চেয়েছে বলেও সূত্র জানায়।
বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহ সভাপতি এস এম আবু তৈয়ব গতকাল দৈনিক আজাদীকে বলেন, পরিস্থিতি খুবই উদ্বেগের। এই ধরনের সংকট দেশের গার্মেন্টস সেক্টর অতীতে কোনদিন পড়েনি। চীনের পরিস্থিতির উপর আমাদের ভাগ্য নির্ভর করছে। মার্চের ২০ তারিখের মধ্যে কাপড়সহ কাঁচামাল আনতে না পারলে তিনি কারখানা চালু রাখতে পারবেন না বলেও জানান। তিনি বলেন, এই সংকটে শুধু বাংলাদেশই নয়, পুরো বিশ্ব তছনছ হয়ে যাবে।
বিকল্প উৎসের ব্যাপারে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চীনের বিকল্প উৎস নেই। পাকিস্তান বা কোরিয়া থেকে কিছু কিছু কাপড় আনার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এর দাম দ্বিগুণ। চীনের চেয়ে দ্বিগুণ দামে কাপড় কিনে পোশাক তৈরি করাতে বিদেশি ক্রেতারা কিনতে রাজি হচ্ছেন না। তাদেরও পোশাক বিক্রির বিষয়টি মাথায় রেখে অর্ডার নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে হচ্ছে।
এব্যাপারে গতকাল বিজিএমইএর প্রথম সহ-সভাপতি এম এ সালাম বলেন, গত ২৩ বছরে যা হয়নি এখন তা হতে যাচ্ছে। আমরা এক কঠিন সময়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেছি। আগামী ২১ ফেব্রুয়ারি যদি চীনের কলকারখানা না খোলে তাহলেই আমাদেরকে ভয়াবহ এক সংকট মোকাবেলা করতে হবে। তিনি বলেন, আমাদের কারখানাগুলোতে মার্চের মাঝামাঝি থেকে কাঁচামাল সংকট দেখা দেবে। ২১ ফেব্রুয়ারি চীনের কারখানা খুললেও আমাদের সংকট পুরোপুরি কাটবে না। আমাদেরকে বিমানে কাঁচামাল নিয়ে আসতে হবে। আবার একইভাবে বিদেশি ক্রেতার কাছেও তৈরি পোশাক পাঠাতে হবে বিমানে। এতে আমাদের খরচ বহুলাংশে বেড়ে যাবে। তবে একেবারে বন্ধ হয়ে যাওয়ার চেয়ে এয়ার শিপমেন্ট করে হলেও শেষ রক্ষা করা যাবে। কিন্তু ২১ ফেব্রুয়ারিও যদি চীনের পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হয় তাহলে আমাদের আর কারখানা চালু রাখা সম্ভব হবে না। তিনি আসন্ন রমজান ও ঈদের পরিস্থিতি নিয়েও শংকা প্রকাশ করেন।
বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক দৈনিক আজাদীকে বলেন, চীনের সংকট আমাদের বড় ধরনের সমস্যায় ফেলেছে। এখনো হয়তো পরিস্থিতি সামাল দেয়ার পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু আগামী ২১ ফেব্রুয়ারি যদি চীনের করকারখানা উৎপাদনে না যায় তাহলে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার অবস্থা থাকবে না। চীনের করোনাভাইরাসের কারনে কিছু কিছু বায়ার ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও বাংলাদেশের দিকে ঝুঁকছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তবে অত্যন্ত সাময়িক এই সুবিধাও শুধুমাত্র কাঁচামাল সংকটে আমরা গ্রহণ করতে পারছি না।

x