কমিউনিটি পুলিশিং স্কুল বিতর্ক প্রতিযোগিতায় সিডিএ পাবলিক স্কুল চ্যাম্পিয়ন

কাজী আরফাত

বৃহস্পতিবার , ৩১ অক্টোবর, ২০১৯ at ৫:৩৬ পূর্বাহ্ণ
20

আমরা সবসময়ই শুনে আসছি, পুলিশ জনগণের বন্ধু। কিন্তু, সবসময় কি সেটার প্রতিফলন আমরা দেখি? হয়তো দেখি না। আবার অনেক সময় পুলিশ বিভাগের সদস্যদের এমন সব আত্মত্যাগ বা দায়িত্ববোধ আমরা দেখি, যা আমাদেরকে অনেক বেশি আশান্বিত করে, প্রাণিত করে, এই বিভাগের প্রতি আস্থা বাড়িয়ে দেয়। মোটকথায় বলা যায়, জনগণের সাথে পুলিশের রয়েছে একটা গভীর বন্ধুত্ব। একইসাথে লম্বা একটা দূরত্বও রয়েছে বৈকি। কবিগুরুর ভাষায়, “যে দূরত্ব সর্ষেক্ষেতের শেষ সীমানায়, শালবনের নীলাঞ্জনে”। তথাপি, বিভিন্ন ঘটনা বা রটনার ভিড়ে পুলিশ সদস্যদের অনেক ভালো কাজ আমাদের কাছে এসে পৌঁছায় না। দেশ নিয়ে তাদের অনেক ইতিবাচক পদক্ষেপ সমপর্কে হয়তো আমরা জানিই না।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের আগামী প্রজন্ম হতে চলেছে অনেক বেশি আধুনিক, চৌকস ও মেধাবী। আর তাইতো সেই প্রজন্মের কাছে পুলিশ হতে চাই অনেক বেশি কাছের, অনেক বেশি ইতিবাচক। তারই ধারাবাহিকতায়, আগামী প্রজন্মকে যুক্তি ও মেধায় গড়ে তোলার অন্যন্য প্রত্যয় নিয়ে উত্তর বিভাগ, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ, প্রথমবারের মতো আয়োজন করছে, স্কুল কমিউনিটি পুলিশিং বিতর্ক প্রতিযোগিতা ২০১৯।
“বিতর্কে জাগবে মানবিক বোধ,জঙ্গি মাদক করব প্রতিরোধ” এই স্লোগানকে সামনে রেখে গত ২১ ও ২২ অক্টোবর জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে আয়োজিত এই প্রতিযোগিতায় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ, উত্তর বিভাগের চারটি থানার, আটটি স্বনামধন্য স্কুল অংশগ্রহণ করছে। স্কুলগুলো হলো প্রেসিডেন্সি ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, অংকুর সোসাইটি গার্লস স্কুল, সিএমপি স্কুল এন্ড কলেজ, ইসপাহানী পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ, চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ, ইমারাতুন্নেসা সিটি কর্পোরেশন গার্লস স্কুল, সিডিএ পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ ও সানোয়ারা ইসলাম বালক উচ্চ বিদ্যালয়। দু’দিনব্যাপী যুক্তির তুমুল লড়াইয়ের মাধ্যমে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে চূড়ান্ত পর্বে উত্তীর্ণ হওয়ার গৌরব অর্জন করে চাঁন্দগাও থানাধীন সিডিএ পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ এবং বায়েজিদ থানাধীন চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ চূড়ান্ত পর্বে বিতর্কের বিষয় ছিলো- সামাজিক অপরাধ অবনমনে কমিউনিটি পুলিশিং হতে পারে অন্যতম সমাধান। এতে পক্ষে ছিলো সিডিএ পাবলিক স্কুল এবং বিপক্ষে ছিলো চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল। চূড়ান্ত পর্বে সভাপতিত্ব করেন কবি ও সাংবাদিক বিশ্বজিৎ চৌধুরী। এতে বিচারক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির মুট কোর্ট জাজ ও প্রাক্তন বিতার্কিক ব্যারিস্টার প্রশান্ত ভূষণ বড়ুয়া, দৃষ্টি চট্টগ্রামের সভাপতি মাসুদ বকুল ও সম্মিলিত আবৃত্তি জোটের সহ-সভাপতি প্রাক্তন বিতার্কিক সাইফ চৌধুরী। যুক্তি পাল্টা যুক্তির মাধ্যমে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলকে হারিয়ে চ্যামিপয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে সিডিএ পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ।
২২ অক্টোবর, এই বিতর্ক প্রতিযোগিতার সমাপন ও সনদপত্র প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. মাহাবুবর রহমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দৈনিক আজাদীর সমপাদক ও কমিউনিটি পুলিশিং চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সভাপতি এম এ মালেক, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার(অর্থ ও প্রশাসন) আমেনা বেগম ,উপ পুলিশ কমিশনার ( ট্রাফিক-উত্তর) মো. আমির জাফর, অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (উত্তর) মো. মিজানুর রহমান, সহকারী পুলিশ কমিশনার(পাঁচলাইশ) দেবদূত মজুমদার, সহকারী পুলিশ কমিশনার (বায়েজিদ) পরিত্রান তালুকদার ও কমিউনিটি পুলিশের সদস্য সচিব অহিদ সিরাজ চৌধুরী স্বপন। সমাপনী অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন উপ-পুলিশ কমিশনার(উত্তর) বিজয় বসাক।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সিএমপি পুলিশ কমিশনার বলেন, পুলিশ সবসময় জনগণের নিরাপত্তার জন্য নিজেদের সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে থাকে। দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে, মাদক ও জঙ্গিবাদকে রুখে দিতে পুলিশের সাথে সাধারণ জনগণকেও সমপৃক্ত হতে হবে ৷ আর সেজন্যই কমিউনিটি পুলিশিং এর যাত্রা। তিনি আরো বলেন, আগামী প্রজন্মকে অনেক বেশি সহনশীল হতে হবে। দেশের জন্য অনেক বেশি কাজ করার মানসিকতা সৃষ্টি করতে হবে। বিতর্কের মতো শুদ্ধ সাংস্কৃতিক চর্চা, শিক্ষার্থীদের মননশীলতা ও সৃজনশীলতা বাড়াতে অনেক বেশি সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।
অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার আমেনা বেগম বলেন, এক সময় পুলিশ ছিল শাসকের বন্ধু। কিন্তু এখনের পুলিশ জনগণের বন্ধু পুলিশ চায় ছাত্র-ছাত্রীদের মনে স্থান করে নিতে। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি আরো বলেন, বুয়েটে যে অমানবিক ঘটনা ঘটছে এমন ঘটনা যেন আর না ঘটে। বর্তমানে সমাজে দেখা যাচ্ছে, মায়ের হাতে সন্তান খুন হচ্ছে। সন্তানকে বাবা খুন করে ফেলছে। যুক্তির মাধ্যমেই এই সকল অমানবিক বিষয়গুলো এড়ানো সম্ভব। সেজন্য বিতর্ক প্রয়োজন। তিনি ঘোষণা দেন, আগামী বছরের শুরুতে চট্টগ্রামের সকল স্কুল ও মাদ্রাসা নিয়ে বৃহৎ পরিসরে বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে।
দৈনিক আজাদীর সমপাদক এম এ মালেক বলেন, সমাজের শান্তি শৃংখলা আনতে হলে, পুলিশ ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব থাকলে চলবে না। এই দূরত্ব ঘোচাতে হবে। পুলিশ সদস্যদেরকে তাদের পেশাদারিত্বের মধ্যে থেকে সর্বোচ্চ মানবিক আচরণ করতে হবে। জনগণেরও নানাভাবে তথ্য-উপাত্ত দিয়ে পুলিশকে সহায়তা করতে হবে। দুইয়ের মধ্যে সেতুবন্ধন সৃষ্টি হলে, তবেই সমাজের নানা অসংগতি কাটিয়ে উঠা সম্ভব। আর পুলিশ ও জনগণের মধ্যে সেই সেতুবন্ধন হলো কমিউনিটি পুলিশিং।
সভাপতির বক্তব্যে উপ-পুলিশ কমিশনার (উত্তর) বিজয় বসাক বলেন, বিতর্কে যদি আমাদের মানবিকবোধ জাগে, তাহলে দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা জংগি ও মাদককে সমাজ থেকে সমূলে উৎপাটন করা সম্ভব। তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুঁড়ে বলেন, যে মুখে আমরা মা ডেকেছি, সেই মুখে কি মাদক নিতে পারি? শিক্ষার্থীরা সবাই একসাথে জবাব দেন, “না”। এই সময় উপস্থিত সকলে “মাদককে না বলি” প্ল্যাকার্ড উঠিয়ে মাদকের বিরুদ্ধে নিজেদের সংহতি প্রকাশ করে।
“মাদককে না বলি” প্ল্যাকার্ড উঠিয়ে মাদকের বিরুদ্ধে নিজেদের সংহতি প্রকাশ করে।বিভিন্ন পর্বে এই প্রতিযোগিতায় বিতর্কের সভাপতি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের মহা ব্যবস্থাপক নিতাই কুমার ভট্টাচার্য, চট্টগ্রামের কর কমিশনার ও কথা সাহিত্যিক বাদল সৈয়দ ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ আনোয়ারা আলম।
অনুষ্ঠান শেষে অতিথিবৃন্দ শিক্ষার্থীদের মাঝে সনদপত্র বিতরণ করেন।

x