কবির নৈঃশব্দ্য পাঠকের উদযাপন

এমদাদ রহমান

মঙ্গলবার , ৫ নভেম্বর, ২০১৯ at ১০:১২ পূর্বাহ্ণ
7

সেই কবে কবি ওয়াল্ট হুইটম্যান লিখে গেছেন এইসব নির্জনতার কথা! ভাস্কর চক্রবর্তীর ‘শীতকাল এসে গেছে সুপর্ণা’ আর হাসান আজিজুল হকের আত্মজা ও একটি করবী গাছের ‘ঠাণ্ডা নামছে হিম’ সঙ্গে করে, প্যারিসের এক ভোরে, বোদলেয়ারের কবরে যাব ভেবে হাঁটছিলাম দীর্ঘ বুলেভার ম্যাক্সিম গোর্কি দিয়ে, হঠাৎ নিজের অজান্তেই যেন গেয়ে উঠলাম সুমনের গানের কলি- পৃথিবী দেখছে আমাদের মুখে বেলা অবেলার প্রতিচ্ছবি… তারই অনুষঙ্গে মনে পড়ে গেল শঙ্খ ঘোষের গদ্যের বই ‘অল্প স্বল্প কথা’, তারপর মনে পড়ে গেল কবি হুইটম্যানের নোটবুকটিকে, যার নামটি বাংলায়- ‘সেইসব দিন’। পুরো বই জুড়ে হুইটম্যান যেন নৈঃশব্দ্যের সঙ্গে সংলাপে মেতেছেন। সেই কবে তিনি লিখে গেছেন কতসব নির্জনতার কথা!
কবির কথাগুলি জীবনের প্রতি যেন এক গভীর অনুধ্যান; পাতার পর পাতায় সেকালের আমেরিকার নিবিড় প্রকৃতিজীবনের এক মনোরম প্যানারমা; জীবনকে, জীবনের উজ্জ্বলতাকে যা অঞ্জলিতে ধরে আমৃত্যু পান করবার এক তুমুল আকাঙ্ক্ষা আর এক তীক্ষ্ণ অবজারভেশন।
হুইটম্যানের ‘সেইসব দিন’ প্রকাশিত হয় ১৮৮২ সালে। বিচিত্র বিষয়ে ঠাসা এই বইটিকে তাঁর ডায়েরিও বলা হয়, খসড়া নোটও বলা হয় যেখানে মূর্ত হয়ে উঠেছে উনিশ শতকীয় আমেরিকার জীবনধারা, একই সঙ্গে হুইটম্যানের সময়েরও এক বিশ্বস্ত ডকুমেন্টেশন। বোস্টন, হাডশন ভ্যালি, সেন্ট্রাল পার্ক, নায়াগ্রা ফলস্‌, দি গ্রেট প্লেইনস, আরকানসাস রিভার, ডেনভার সিটি ভ্রমণকালীন সময়ে সঙ্গে থাকা নোটবুকে এই কথাগুলি টুকে রেখেছিলেন তিনি। নগরজীবনে দিনে দিনে ক্লান্ত হয়ে তাঁর এই লেখাগুলো আমাদের জন্য তাই এক মহৎ জীবন-উৎসব! যেন আমাদের নিজেদের প্রয়োজনে, নিজেদেরকে নিজে উদযাপন করবার এক মন্ত্র লতাপাতাডালপালা থেকে আমাদের শিকড়ে-শিকড়ে রক্তের মতো প্রবাহিত করে দিলেন কবি ওয়াল্ট হুইটম্যান। দীর্ঘদিনের সঙ্গী হুইটম্যানের ‘সেইসব দিন’ বই থেকে খানিকটা পড়ে নেয়া যাক :

সেই আশ্চর্য রাত। আগস্ট ২৫, সকাল ৯-১০টা
সকাল থেকেই বসে আছি ডোবার পাশে- গভীর নৈঃশব্দ্য এখন চারপাশে। জায়গাটা প্রশান্ত জল ও নিস্তরঙ্গ, কাঁচের মতো; আকাশের সব রঙ আর সাদা মেঘদল জলের বুকে প্রতিফলিত। জলছবির সেই মেঘ উড়ছে, সঙ্গে প্রতিফলিত হচ্ছে উড়ে চলা পাখি। গতরাতে আমি এই ডোবার জলে স্নানে নেমে ছিলাম এক বন্ধুর সঙ্গে; মধ্যরাত পার হয়ে গিয়ে গিয়েছিল। পূর্ণকলা চাঁদ আর গুচ্ছ গুচ্ছ তারা আর মেঘদল, তাদের রূপালি আর তীব্র-তামাটে রঙ; সেই মেঘ বায়ুতাড়িত ধোঁয়াটে, বাষ্পময় -কিছুই যেন আর লৌকিক নয়, মিরাকল! আমি আর আমার বন্ধুর কাছে এই রাত্রি যেন তার সমস্ত আচ্ছন্নতা নিয়ে নেমে এসেছে। গাছেদের ছায়া, ঘাসের ডগায় চন্দ্রালোক, ধীরে বয়ে চলা বাতাস, আর যেন সমস্ত ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করতে থাকা পাকা গমের ঘ্রাণ।
এই একটি রাত, এই উদাসী আর অপার্থিব রাত তবে অবর্ণনীয়, প্রগাঢ়, আর্দ্র আর ব্যঞ্জনাময়- জীবনের সমস্ত কিছুর এমন এক সমন্বয়, আমাদের আত্মাকে যা পরিশ্রুত করে, আর আমাদের স্মৃতিগুলিকে করে তোলে আমৃত্যু বয়ে বেড়ানোর মতো চিরন্তন।

মাঝরাতে পাখির দেশান্তর
কখনও কি মধ্যরাতে কেউ পাখির উড়ে যাওয়ার শব্দ শুনতে পেয়েছ? মাথার ওপর দিয়ে, বাতাসে ভেসে, অন্ধকারে, গণনার অতীত তাদের ডানা, পাখসাট, বদলে ফেলতে তাদের গ্রীষ্মের শুরু কিংবা শেষের আবাস- শুনতে পেয়েছিলে কেউ? তাদের এই চলে যাওয়াটা এমন একটা ব্যাপার, যদি কেউ দেখে ভুলতে পারবে না কোনওদিনও। আমার এক বন্ধু রাত বারোটার পর জানিয়েছিলেন- গতরাতে উত্তরে পাড়ি জমানো সেইসব দেশান্তরী পাখিদের অদ্ভুত সেই ঘোরলাগা শব্দ, দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে বিপুল পাখির ঝাঁক (যদিও এবছর কিছুটা দেরিতে যাচ্ছে), তারপর যে-গাঢ়-নীরবতা, ছায়া-প্রচ্ছায়া, আর ঘ্রাণ, পরের ঘণ্টাগুলিকে (পাখিদের শরীরের এই ঘ্রাণ নিঃসঙ্গ রাতের প্রসাধন) আমার মনে হল এক অপার্থিব সঙ্গীত। তোমাকে, অবশ্যই পাখির ঝাঁকের মহাকাব্যিক উড়াল-ধ্বনি শুনতে হবে। একবার কিংবা বার বার। বিপুল ডানার বেপরোয়া গতিবেগ। তাদের উড়ে চলার সেই ভঙ্গিটি, মুহুর্মুহু ডাক এবং কিছু গানের স্বরলিপি। আর এই সমস্ত কিছু স্থায়ী হয় রাত বারোটা থেকে শুরু করে তিনটার পর পর্যন্ত। যদি কখনও এই প্রজাতিটিকে সম্পূর্ণরূপে আলাদা আলাদা করে দেখা যায়, তাহলে আমি তাদের চিনতে পারব, নামও বলে দিতে পারব- গানের পাখি বোবোলিংক, ট্যাঙার, উইলসন্স থ্রাস, সাদা-মুকুট চড়ুই এবং ওপরের বাতাস থেকে মাঝেমাঝে টিট্টিভদের গলা থেকে ভেসে-আসা সঙ্গীতের নোট।

শেষবেলার দৃশ্যাবলী। ফেব্রুয়ারি- ২২
গতরাত, তারপর আজকের পুরোটা দিন ছিল বৃষ্টিমুখর। জল ছপছপ। অপরাহ্নের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাতাস যখন ক্রমাগত ঘূর্ণি তুলে বয়ে চলছিল, সেই ঘূর্ণিতে উন্মত্ত মেঘদল কোথায় যেন অন্তর্হিত হয়ে গেল যেন কেউ টানানো পর্দা গুটিয়ে নিল শক্ত হাতে; আর তারপর দেখলাম, যেন এই জীবনে প্রথম এমন রামধনু দেখলাম, এমন এক বিস্তার, উজ্জ্বল, মহিমান্বিত এবং বিস্ময়কর! পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত ছুঁয়ে, এমনই বিস্তৃত- আচ্ছন্ন করে দেওয়ার মতো তার সেই বেগুনি, নিষ্প্রভ সবুজাভা হলুদ রঙের আলোকস্ফুরণ নিয়ে পুরোটা আকাশ জুড়ে, এবং আলোর এক অবর্ণনীয় প্রকাশ; জমকালো, যেন একটা কথাই বার বার মনে করিয়ে দিচ্ছে- দেখিনি এমনটা আর। দেখা হয় নি। পুরো একটি ঘণ্টা পার হয়ে গেল পৃথিবীর দু-প্রান্তের দুই বাহুর অদৃশ্য হওয়ার পর পুরোপুরি মিলিয়ে যেতে। কিনার ঘেঁষে চলা ছেঁড়া সাদা মেঘে মেঘে পেছনের আকাশ তখন আলোকপ্রবাহী কিন্তু অস্বচ্ছ নীল রঙের বিস্তার…তারপর যে সূর্যাস্ত হয়, অপার্থিব সৌন্দর্যে আত্মা তখন পূর্ণ…
এই নোট আমি ডোবার পাশে বসে বসে টুকে রাখছি, বেলা শেষ হয়ে যাচ্ছে তবুও যে আলো এখনও আছে কিছু লিখবার পক্ষে সে আলো যথেষ্ট; সন্ধ্যার ঘনায়মান অন্ধকারের ভেতর দিয়ে, স্ফটিকস্বচ্ছ জলের ওপর পশ্চিম থেকে পতিত হওয়া প্রতিফলন, জলে নুয়ে পড়া গাছগুলি, দেখতে দেখতে- এই নোট লেখা শেষ করছি আমি, শেষ করতে করতে জলে মাছের ভেসে বেড়ানো দেখছি। তাদের তেজি আলোড়ন জলে তরঙ্গ তুলছে।

রঙ- নানা মাত্রা
ভিন্ন ভিন্ন ঋতুতে, প্রতিদিনের ভিন্ন ভিন্ন সময়ে রঙ আর আলোর এমনধারা খেলা; দূর দিকচক্রবালের রেখাগুলো, ল্যান্ডস্কেপ যেখানে ক্ষীণ হতে হতে নিজেকে হারিয়ে ফেলে, ঠিক সেখানেই আলো আর রঙের এমন খেলা চলে! যেভাবে আমি ধীরে ধীরে, লেন ধরে এসে পৌঁছই দিনের শেষ ভাগে, তখন- দীর্ঘজীবী ভুট্টার সারির ভিতর দিয়ে পশ্চিম আর আমার মাঝখানে এক অতুলনীয় সূর্যাস্ত!
অন্যান্য দিনগুলিতে- টিউলিপ আর ওক গাছগুলির প্রাচুর্যময় গাঢ় সবুজ, জলে দাঁড়িয়ে থাকা ধূসর উইলো, চিনার আর কালো-আখরোটের নানা অনুজ্জ্বল রঙ, (বৃষ্টির পর) চিরহরিৎ দারুবৃক্ষদের পান্না আর বিচফলের হালকা হলুদ।

ছোট্ট গানের পাখি। মার্চ ১৬
ঝকঝকে উজ্জ্বল সকাল। সূর্য উঠেছে ঘণ্টাখানিক আগে। বাতাস কিছুটা কটুস্বাদযুক্ত। আর দিনের সূচনাতেই শুনতে পাচ্ছি তৃণভূমির ছোট্ট পাখির গান মাত্র বিশ রড দুরত্বে বেড়ায় বসে গান গাইছে সে। দুই-তিনটি সুর একত্রে মিশিয়ে- একটু থেমে আবারও গাইতে শুরু করে তার বুনো আকাঙ্ক্ষা আর আনন্দময় উদযাপনের গানটি। পাখিটি কখনও ধীরে কখনও নৈঃশব্দ্যে পাখা মেলছে, উড়ছে, চলে যাচ্ছে, গিয়ে সেই বেড়ায় গিয়ে বসছে, কখনও উঁচু খুঁটির ওপর; সেইসঙ্গে গানটি গেয়েই চলেছে সে।

দূরবর্তী শব্দেরা
কুঠার আর মাড়াইকলের ধুপধাপ, গোলাবাড়ির উঠোনে মোরগের ডাক [অন্য গোলাবাড়িগুলি থেকে ক্ষণে ক্ষণে ভেসে আসছে সেই ডাকের উত্তর], সেই সঙ্গে গবাদিপশুদের বাজখাঁই গলা- কিন্তু কাছে দূরের সবকিছুকে ছাপিয়ে ওঠে মত্ত বাতাস। উঁচু গাছগুলিকে আন্দোলিত করতে করতে, ঝোপঝাড় মাড়িয়ে দিয়ে আমাদের মুখ হাত ছুঁয়ে ছুঁয়ে মত্ত বাতাস এই উজ্জ্বল সুরভিত দুপুরকে দীর্ঘ সময়ের জন্য শীতল করে দিচ্ছে। এ যেন আমার সারা জীবনের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রতীক্ষার অবসানের এক দীপ্তিময় প্রকাশ; যেন ভিতরে গুঞ্জরিত হচ্ছে একটানা এক সুর- হয়তোবা বিষন্নতার- যে সুর আমাদেরকে পৌঁছে দেয় জীবনের ক্ল্যাসিক কিছু উপলব্ধির কাছে, হতে পারে সে উপলব্ধি হালকা, হতে পারে গভীর; নানামাত্রিক।
পাইনের বনে বাতাস ঘূর্ণি তুলছে এখন, বন জুড়ে অদ্ভুত শিসধ্বনি যেন সুর থেকে জন্ম নিচ্ছে মন্ত্র। কিংবা সমুদ্রে যেমনটা ঘটে থাকে- ঠিক এই মুহূর্তে মনের চোখে সমুদ্রের দৃশ্যাবলী – ঢেউ আর ঢেউ, ঢেউয়ে ঢেউয়ে ফেনা; ঢেউ উঠছে, নামছে, দুলছে, ফেনা মাথায় ছুটে যেতে চাচ্ছে বহুদূর, আর কোথা থেকে ভেসে আসা লবণের ঘ্রাণ, আদি নেই অন্ত নেই… আমরা যাকে চিরন্তন বলি।
প্রকৃতির এই সব খেয়াল, এইসব গড়া আর ভাঙা, এত ঘোরলাগা আর এই স্ববিরোধ- মানুষকে কোথায় দাঁড় করায়?
অন্যান্য অনুষঙ্গ : দিনে উজ্জ্বল সূর্য, রাত্রিতে চন্দ্রালোক- আলোর আশ্চর্য বিস্তার। দিনটি তবুও তেমন আশ্চর্য ছিল না, এই গ্রহ উপগ্রহের রাজত্বে, এই অসীমতায়, এই নিবিড় উষ্ণতায় আজকের এই রাতটি তেমন উজ্জ্বল নয়, গত তিন-চারটি রাত যেমন ঝলসাচ্ছিল। এই যে গ্রহগুলি- মঙ্গলকে আগে আর কখনোই এমন অগ্নিপ্রভা দেখিনি, কেমন আলো ছড়িয়ে দিয়েছে পুরো আকাশটায়, একটুখানি হলুদ রঙ এসে মিশে গেছে সেই আলোয় [জ্যোতির্বিদরা বলবেন- এটা কি সত্যি? গত শতাব্দীর চেয়ে মঙ্গল এবার আমাদের অনেক কাছাকাছি] এবং প্রভু জুপিটার [কিছুটা চাঁদের আড়ালে] এবং পশ্চিমে, সূর্য ডুবার পর নয়নাভিরাম ভেনাস, যার আলোকধারা ভেঙে গলে পড়ছে এমনভাবে যেন ঈশ্বর আজ তাকে নিয়ে খেলছেন।

শেষবেলার আলো ছায়া। মে ৬
সমস্ত দিনের শেষ একটা ঘণ্টাটিতে আলো-ছায়ার সবচেয়ে অদ্ভুত সবচে আশ্চর্য রূপটি দেখা যায়। চিত্রকরকে এই রঙ বিভ্রমে ফেলে দিবে। শিল্পী ভুল করবে। এই এখন, দিনের শেষে গলিত রূপার দীর্ঘ এক প্রলেপ যেন গাছগুলির ওপর অনুভূমিক হয়ে পড়েছে (পাতাগুলি তাতে প্রগাঢ় সবুজ হয়ে উঠেছে), প্রতিটি পাতা প্রতিটি ডাল, সংবদ্ধ বুনট, নিজেদের নিয়ে তারা অলৌকিক আনন্দে মাতাল, তারপর সেই রঙ দেখি আচ্ছন্ন করে ফেলেছে পরিপক্ক আলুবোখারার ওপর, দিগন্ত পরিব্যাপ্ত ঘাসে; ঘাসে সেই অদ্ভুত রঙ; প্রতিটি ডগা ভিন্ন ভিন্ন রঙে উজ্জ্বল।
দিনের আরও কখনও রঙের এই খেলাটা আর দেখা যাবে না। আর এই রঙ দেখবার জন্য আমার বিশেষ কিছু জায়গা আছে।
এমন সময়ে রঙ উছলে পড়ে জলের ওপর। জল তখন কাঁপে- তরঙ্গে। দীপ্তি ছড়ায়। মুহূর্তে সে জল ঘন সবুজ হয়ে ওঠে যেন এ রঙ ঠিক সবুজ নয়, এ রঙ অন্ধকারের; যেন ছায়া পড়েছে।
জলে তরঙ্গে রঙের এত রেখা।
রঙ তারপর কিনারে চলে যায়, তখন মনে হয় দীর্ঘ সারিবদ্ধ গাছগুলি থেকে তীরের মাথায় আগুন লাগিয়ে উপড়ে ছুঁড়ে দেওয়া হচ্ছে, আর সূর্য নেমে এসেছে মাটির নিকটে।
এভাবে রঙের অদ্ভুত প্রকাশ হয় যেন মূর্ত হচ্ছে অদেখা ভুবন। অচিন রাগিণী।

পাখিদের গান
কতখানি সঙ্গীত যে এখানে (বন্য, সহজ, আদিম, বিষন্ন, মধুর) বেজে চলেছে! চরাচরের সমস্ত পাখি আজ এখানে জড়ো হয়েছে, এই কনসার্টে। আমি দেখছিলাম তাদের গলার ভঙ্গি! গত আধঘণ্টা ধরে- যখন থেকে এ জায়গাটিতে এসে বসেছি- দেখছি, তুলোর মতো ঝরাপালকের দল ধীরে ধীরে নেমে আসছে ঝোপঝাড়ের ওপর। পালকগুলি নেমে আসছিল উড়ে উড়ে, অবিরাম। আমার মনে তখন অদ্ভুত স্পন্দময় শিস-ধ্বনি’র অনুভব, কেননা খুব ছোট্ট একটা পাখি চকিতে দেখা গেল, মালবেরিরাঙা পাখিটি ঝোপের চারপাশে চক্কর দিয়ে বসে পড়ল, একা হয়ে! মাথা, ডানা আর শরীর গাঢ় লাল, খুব উজ্জ্বলও নয়, গানও গাইছে না, যে-গান এতক্ষণ শুনছিলাম। বেলা ঠিক ৪টার সময় : জমকালো এক কনসার্ট আমাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলল। এক ডজন নানাপ্রকারের পাখি যেন প্রবল ইচ্ছাশক্তির বলে একসঙ্গে জড়ো হয়ে গেছে! হঠাৎ বৃষ্টি এসে তাদের ভিজিয়েও দিল, তবু উদ্দাম গান আর থামল না তাদের। এমনই যূথবদ্ধ তারা এই জীবনে। কেউ কাউকে ছেড়ে চলে যাবে না, কোথাও। তারপর আমি যখন ডোবার কাছটায় গাছের গুঁড়িতে এসে বসলাম, তখনও তাদের বহুলস্বরের কোরাস থামেনি। চোখে পড়ল সঙ্গীত থেকে বিছিন্ন একটি খসেপড়া পালক। পালকটি এমনই নিঃসঙ্গ যে মনে হলো তার জানা নেই জঙ্গলের ভেতরে উড়ে উড়ে কোথায় চলেছে। যেন জীবনের সমস্ত পরিক্রমা শেষে সে-ই একমাত্র একাকীত্বের গান গাইছে। মনে হচ্ছে, তার এই উড়ে যাওয়ার সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে মানুষের জন্য পৃথিবীতে নিয়ে আসা ভালবাসার গান, যে-গান অনন্তজীবনকালের; যার সাক্ষী এই চিরপ্রণম্য সময়!

এখন এই শেষরাতে, একা একা বুলেভার ম্যাঙ্মি গোর্কির আলো-অন্ধকারে কবির ‘লীভ্‌স্‌ অভ গ্রাস’ পড়তে পড়তে বোদলেয়ারের কবরের কাছে চলে যাওয়া যায়। পাঠকের শেষ আশ্রয় শেষ পর্যন্ত কবি, কেবল তিনিই পারেন পাঠককে পৃথিবীর গভীর ধ্যানের পথে একা একা হাঁটতে পারার শক্তিটুকু দিতে!

[বুলেভার ম্যাক্সিম গোর্কি, সান দেনি, প্যারিস, অক্টোবর ২০১৯]

x