কবিতা যখন পণ্য

সালমা বিনতে শফিক

মঙ্গলবার , ৫ নভেম্বর, ২০১৯ at ১০:৩১ পূর্বাহ্ণ
19

প্রিয়জনের জন্য অনেক যত্নে তৈরি উপহারের মোড়কের সঙ্গে কবিতা জুড়ে দিতে চান একখানা? কিংবা কবি হিসেবে কাগজে নাম ওঠাবার বড় সাধ আপনার? কিন্তু মনের এলোমেলো কথাগুলো শব্দে ও বাক্যে সাজিয়ে ছন্দবদ্ধ করতে পারছেননা। কবিতা দূরে থাক, কাগজ কলম নিয়ে বসলে একটা শব্দও বের হয়না মাথা থেকে। কিন্তু কবিতা আপনার চাই-ই। ভাবনা নেই, আপনার মনের সব কথা শব্দ ও ছন্দে সাজিয়ে তাৎক্ষনিক কবিতা রচনা করে দিতে তৈরি একালের কবি! আপনি নির্ভার থাকুন; ষোল পঙক্তির জন্য পঞ্চাশ টাকা কেবল হাতে রাখুন। বিফলে মূল্য ফেরতের প্রতিশ্রুতি- অর্থাৎ কবিতা আপনার পছন্দ না হলে কোন টাকা নেওয়া হবেনা। কবিতার শক্ত (হার্ড কপি)ও নরম (সফট কপি) দুই ধরনের সংস্করণই আপনার হাতে তুলে দেওয়া হবে। কবিতার আসল রচয়িতা কস্মিনকালেও বিক্রিত কবিতার সত্ত্ব দাবী করবেননা। অতএব এই কবিতার মালিক আপনি। কবিতার মালিককে কবি বলা যায় কিনা জানিনা। যদি যায়, তবে নির্ঘাত আপনিও কবি। অভিবাদন আপনাকে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সমপ্রতি শেষ হওয়া ভর্তি পরীক্ষার শেষ দিনে কবিতা বিক্রয়ের এক অভিনব বিজ্ঞাপনে চোখ আঁটকে গেল। কবিতারও বেসাতি চলে তাহলে! বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শ্রেনীকক্ষের দরজায় ও দেয়ালে সাঁটা বিজ্ঞাপনের ভাষা অতি মনোহর। ইংরেজিতে বড় করে লেখা ‘স্ট্রিট পোয়েট্রি’। বাংলা তর্জমা করলে পথকাব্য বলা যায় কি? স্ট্রিট ফুডের সঙ্গে পরিচিত আমরা। সব মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে, সব দেশেই তাই জনপ্রিয় পথের খাবার। স্ট্রিট মিউজিকের কথাও কমবেশি জানা আমাদের। উন্নত পৃথিবীর নামকরা শহরে স্ট্রিট মিউজিশিয়ানদের দেখা পাওয়া যায়, যাঁরা গান শুনিয়ে অর্থ উপার্জন করেন, অনেকটা আমাদের বাউল সন্ন্যাসীদের মতো। ‘স্ট্রিট পেইন্টার’রা আগ্রহী পথচারীর ছবি এঁকে দেন টাকার বিনিময়ে। গ্রাহক খুশি হয়ে পথশিল্পীকে খুশি করে নিজের প্রতিকৃতি নিয়ে স্থাপন করেন ঘরের দেয়ালে। প্রিয়জনের ছবিও আঁকিয়ে নেন অনেকে ছবি দেখিয়ে। একইভাবে পথ নাটকও দেখা যায় আজকাল আমাদের শহরগুলোতে, তবে পথনাটক উপভোগের জন্য দর্শককে হয়তো সব সময় টাকা গুনতে হয়না।
‘স্ট্রিট পোয়েট্রি’ একেবারেই নতুন শোনা। তাই গুগলে ঢুঁ মারলাম। লসএঞ্জেলসে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো যুবকদের একটা সংগঠন আছে এই নামে, যারা মানুষের বিপদে এগিয়ে আসে। অর্থ সংগ্রহ করে নানা প্রতিষ্ঠান ও ধনী ব্যক্তিদের কাছ থেকে, কেবল জনকল্যাণে ব্যয় করার জন্য। ‘পোয়েট্রি ইন মোশান ভ্যান’ নামে তাদের কিছু নিজস্ব পরিবহণ আছে যাতে করে জরুরী ওষুধ পৌঁছে দেয় তারা অসহায় মানুষদের দরজায়। ‘স্ট্রিট পোয়েট্রি’ নামে গানও নাকি আছে; শুনতে হবে একদিন। আমাদের এখানে ‘স্ট্রিট পোয়েট্রি’র অর্থ কি জানতে হলে বিজ্ঞাপনের পুরোটা দেখতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেনীকক্ষের দরজায় ও দেয়ালে ‘স্ট্রিট পোয়েট্রি’র বিজ্ঞাপন দেখে স্বভাবতই মনে হতে পারে পথের ধারে কবিতা পাঠের অনানুষ্ঠানিক আসর। এতে দোষের কিছু নেই। এমনকি কবিতা পাঠ করে কবি যদি কিছু পয়সা দাবীও করেন, তাঁকে সেজন্য দোষারোপ করা যায়না। কিন্তু পুরো বিজ্ঞাপনটা দেখে চক্ষু চড়কগাছ! ‘চল পাখির মতো উড়ি, চল আকাশ ছুঁয়ে ফেলি’ দুর্দান্ত কথাগুলো ইংরেজিতে লেখা। এখানেও কোন সমস্যা নেই, দোষের কিছু নেই। পাশেই বাঙবন্দী কিছু কথা ‘প্রতি কবিতার শুভেচ্ছা মূল্য পঞ্চাশ টাকা! সর্বোচ্চ লাইন ষোল। কবিতা পছন্দ না হলে কোন টাকা নেওয়া হবেনা’। কেমন ধোঁয়াশা ধোঁয়াশা লাগে। নিচের বাঙে জবাব মেলে সবকিছুর- “ইনস্ট্যান্ট কবিতা লেখে (লিখে নয়) দেওয়া হবে…………” । ইনস্ট্যান্ট কফি, ইনস্ট্যান্ট নুডলসের মতো ইনস্ট্যান্ট কবিতা বিক্রয়ের সুব্যবস্থা!
আমার মনের কথা অন্য একজন সুন্দর করে লিখে কবিতার জন্ম দেবেন, আর আমি সেই কবিতার মালিক বনে গিয়ে প্রিয়জনকে উপহার দেব, কিংবা খবরের কাগজে আমার নামেই ছাপিয়ে কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবো – বিজ্ঞাপনের ভাষা কিন্তু সেই ইঙ্গিতই বহন করে। আর ইনস্ট্যান্ট কবিতা লিখে দিয়ে যিনি ষোল পঙক্তির জন্য পঞ্চাশ টাকা করে গ্রহণ করবেন, তাঁর অর্থোপার্জনের কি দারুণ ব্যবস্থাইনা হয়ে গেল,বিশেষ করে ছাত্রাবস্থায়। আরও আছে, আপনার চাহিদামতো বাংলা ইংরেজি দুই ভাষাতেই কবিতা উৎপাদন ও সরবরাহের সুব্যবস্থা আছে বিজ্ঞাপনদাতার কাছে। তবে বাংলা ইংরেজি দু মাধ্যমেই সমান পারদর্শীতা একই ব্যক্তির নাও থাকতে পারে। সত্যি বলতে কি, সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞাপনদাতা স্বয়ং কবিতার জন্ম দেন, নাকি কবিতার ঠিকাদারি করেন, তা কিন্তু পরিষ্কার নয়।
আহা জীবনানন্দ! হাজার হাজার পঙক্তির কবিতা জং ধরা কালো ট্রাঙ্কে লুকিয়ে রেখে বড় অভিমানে এলোমেলো হাঁটছিলে তুমি কলকাতার পথে পথে। শত বছরের বুড়িয়ে যাওয়া ট্রামও তোমায় ছেড়ে কথা কয়নি। প্রতি ষোল লাইন পঞ্চাশ টাকায় বেচতে পারলে সরকারী হাসপাতালে সাধারণ শয্যায় ধুঁকে ধুঁকে মরতে হতনা তোমায়। তারও আগে অর্থসংকটের জন্য চাল নুন তেলের যোগান দিতে না পারায় স্ত্রী লাবণ্য’র বিশেদ্গারও সইতে হতনা।
শুধু কি জীবনানন্দ? টাকার অভাবে বিনা চিকিৎসায় ঘুমিয়ে পড়ে নজরুলের বুলবুল। শেঙপিয়ারও নাকি দুঃসহ অর্থকষ্টে ভুগেছিলেন শেষ জীবনে। আহারে, বড় ভুল সময়ে পৃথিবীতে এসেছিলেন মহাকবিগণ। একুশ শতকের বাংলায় জন্ম নিলে বোধকরি কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা বানাতে পারতেন তাঁরা। অন্তত অনাহারে দিন কাটাতে হতনা, বিনা চিকিৎসায় মরতে হতনা।
প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের একটা গান আছে- ‘আলু বেচ, ছোলা বেচ, বেচ বাকরখানি, বেচোনা বেচোনা বন্ধু তোমার চোখের মনি……’ এই গানে অনেক কিছু বেচতে বলা হয়েছে, কেবল অল্প কিছু জিনিস (জিনিস ঠিক নয়) বেচতে মানা করা হয়েছে। অনেকের তালিকায় না গিয়ে অল্পের তালিকার দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রতুল মুখোপাধ্যায় কেবল চোখের মনির সাথে সাথে বুকের কান্না, টুকটুকে লাল স্বপ্ন, আর জনমদুঃখী হাতের কলমটাকে না বেচতে বলেছেন।
আমাদের তরুণরা যদি অনায়াসে কবিতা বেচাকেনায় গা ভাসিয়ে দিয়ে হাতের কলমই বেচে দিতে শুরু করে তাহলে চোখের মনি, বুকের কান্না, টুকটুকে লাল স্বপ্ন সবকিছু এমনিতেই নাই হয়ে যাবে। ওদের ফেরাতে হবে। ভালোবাসা, মূল্যবোধ, হাসি-কান্না যেমন কেনাবেচা করা যায়না, তেমনি সৃষ্টিশীলতারও বেসাতি চলেনা। কবিতা সবাইকে লিখতেই হবে, এমনতো নয়। কবিতা পড়বে, শুনবে। যার যেকাজে মন লাগে সে সেকাজই করবে। সব কাজের মানুষদেরই আমাদের প্রয়োজন, বড় প্রয়োজন।
শেষ করছি আলোচ্য বিজ্ঞাপনের সঙ্গে সংযুক্ত দুই পঙক্তির ইংরেজি কবিতার সুত্র ধরে; ‘লেটস ফ্লাই লাইক আ বার্ড, লেট টাচ দা স্কাই’। কবিতার বিকিকিনির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই- খ্যাতি ও জনপ্রিয়তায় একজন মানুষ আকাশ ছুঁতেই পারে, পাখি কিন্তু আকাশে ওড়ে নিজের পাখায় ভর করে।

x