কবিতার পথ ধরে হেঁটে হেঁটে

মোরশেদ তালুকদার

সোমবার , ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ at ৫:৩১ পূর্বাহ্ণ
73

কবিতা ‘সৌন্দর্যের ছন্দময় সৃষ্টি’। ছন্দে ভাব প্রকাশের অনন্য মাধ্যম। দার্শনিক অ্যারিস্টটলের ভাষায়, কবিতা দর্শনের চেয়ে বেশি, ইতিহাসের চেয়ে বড়। রোমান্টিক কবি জন কীটস মনে করেন, কবিতা মুগ্ধ করবে তার সূক্ষ্ম অপরিমেয়তায়, একটি মাত্র ঝংকারে নয়। পাঠকের মনে হবে এ যেন তারই সর্বোত্তম চিন্তা, যা ক্রমশ ভেসে উঠছে তার স্মৃতিতে।
অবশ্য কবিতার এত সংজ্ঞা নিয়ে মাথাব্যথা নেই পাঠকের। তারা কবিতা পড়েন মনের আনন্দে। কারণ, ‘কবিতা পরিতৃপ্তির বিষয়’। শব্দের বুননে কবি নিজের ভাবনার প্রতিফলন ঘটান কবিতায়। পাঠক তৃপ্ত হলে আনন্দ পান কবিও। তাই পাঠকের কাছে কবিতা পৌঁছে দিতে উন্মুখ থাকেন কবি। পাঠকও অপেক্ষায় থাকেন পছন্দের কবিতার। দুই পক্ষের সারা বছরের এই অপেক্ষার কিছুটা হলেও অবসান ঘটায় বইমেলা।
নগরের এম এ আজিজ স্টেডিয়াম সংলগ্ন জিমনেশিয়াম মাঠে চলছে অমর একুশে বইমেলা। বইমেলাকে ঘিরে প্রকাশিত পুরো দেশের প্রায় শতাধিক কবির কাব্যগ্রন্থ পাওয়া যাচ্ছে মেলায়। এর মধ্যে বাতিঘরের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘কবিতাভবন’ থেকে প্রকাশিত হয়েছে ময়ুখ চৌধুরীর ‘চরণেরা হেঁটে যাচ্ছে মুণ্ডহীন’। নাম শুনেই কল্পনায় ভাসে, মাথাহীন কেউ হেঁটে যাচ্ছে। কিন্তু কেন? কবি নিজেই দিয়েছেন এর উত্তর, ‘মাথা বিক্রি করে যারা মুকুট কিনেছে/এ চরণ তাদের নয়।’ মাথা বিক্রি করে নত হননি বলেই এগিয়ে চলেছে কবির পা দুটো। গতকাল বিকালে বাতিঘর স্টলে ‘চরণেরা হেঁটে যাচ্ছে মুণ্ডুহীন’-এ মগ্ন ছিলেন তরুণ সাংবাদিক সুজন ঘোষ। কী ভাবছেন অত? প্রশ্ন শুনে ময়ুখ চৌধুরীর ‘গলির মোড়েই ছিল নাকফুল-পরা হাস্নুহেনা-কামার্ত গন্ধের ভারে নুয়ে পড়ে পিচ্ছিল….’ লাইনগুলো শোনান তিনি। বললেন, প্রেমিক মাত্রই মাতাল। গলির মোড়ে কিংবা পথের ধারে দাঁড়িয়ে থাকে প্রেয়সী। যার ভেজা চুলের ঘ্রাণ কিংবা শরীরের সুগন্ধী মাতাল করে দিতে পারে যে কাউকে। প্রেম অথবা প্রেয়সীর জন্য তো দুনিয়ার সব অর্থহীন। পথের দিশা পাবেন না জেনেও পথ খুঁজে ফিরে প্রেমিক। ভালোবাসার আলোয় আলোকিত তার সব। তাই এখানে অন্ধ নয় কেউ। ‘চরণে লুটিয়ে পড়ে পলিমাখা ঢেউ’। আহা কী সুন্দর কথা। কাদামাখা কিংবা বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হয়েছে তার চিহ্ন রইল এই লাইনে।

প্রথমা প্রকাশন থেকে বেরিয়েছে কবি ওমর কায়সারের ‘আমিহীন আমার ছায়াগুলো’। ছন্দ প্রকরণ আর নির্মাণের দিক থেকে নিটোল কবিতাই লিখেছেন ওমর কায়সার।
বইমেলায় কথা হয় কবি নাজিম উদ্দিন চৌধুরী এ্যানেলের সঙ্গে। বললেন, দেহের শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য যেমন নিশ্বাসের প্রয়োজন, তেমনি সাহিত্যকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য কবিতার প্রয়োজন। বর্তমান সময়ে যে কবিতার বাজার সেখানে কবির সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু পাঠকের সংখ্যা প্রতিনিয়ত কমছে। কারণ কবিগণ কবিতার মর্ম সেভাবে তুলে ধরতে পারছেন না।
কবিতার বই বিক্রি হচ্ছে কেমন? এর উত্তরে নন্দন বইঘরের স্বত্বাধিকারী সুব্রত চৌধুরী বলেন, প্রতিষ্ঠিত কবির কাব্যগ্রন্থের চাহিদা বেশি। কিছু কিছু কবির নাম ধরেই পাঠক তাদের বই খোঁজেন। যেমন মহাদেব সাহা, নির্মলেন্দু গুণ, হেলাল হাফিজের কবিতার বই পাঠক এসে খুঁজছেন। এর বাইরে কিছু কবির বই খুঁজছেন যাদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে পাঠকের যোগাযোগ আছে। সামগ্রিকভাবে বললে, কবিতার পাঠক কম।
গতকাল মেলা ঘুরে দেখা গেছে, আবির প্রকাশন থেকে বেরিয়েছে ড. অনুপম সেনের ‘সুন্দরের বিচার সভাতে’, নাসরিন আক্তার খুশির ‘নির্জনের নিঃশব্দ কবিতা’, সারাফ নাওয়ারের ‘আঙুলের আস্বাদন’, ইয়াসমীনা শিরিন সিরাজউদ্দীনের ‘আলো আঁধারি গোলকধাঁধা’, তুষার কান্তি বড়ুয়ার ‘বসন্ত ছুঁয়েছে কবি’, তাপস চক্রবর্তীর ‘কৃষ্ণ বালিকা’, এম এন নাহারের ‘বৃষ্টি রঙের কষ্ট’, কাজী শিহাবুদ্দীনের ‘পাখির ডানায় সোনালী রোদ্দুর’। এছাড়া মেলায় পাওয়া যাচ্ছে আলাউদ্দিন আদরের ‘সময়ের শিলালিপি’, জয় জাহাজীর ‘নাভীর নিকটে সেমেট্রি’, শফিকুল ইসলাম অনিকের ‘সময়ের সহযাত্রী’, শাহিন শাঙনের ‘হসন্ত নেমেছে দেশে’, সজীব মেহেদীর ‘কিঞ্চিত দুঃখের ওম’, রওশান ঋমুর ‘মেঘফুল ও যৌথ যন্ত্রণা’, আকতার হোসাইনের ‘হাড়ের হরিণী’ ও ‘নির্বাচিত কবিতা’ এবং তৌফিকুল ইসলাম চৌধুরীর ‘পানপাত্রে দ্রাক্ষারস’।
লেখক সম্মিলন : আগামী ১৮ থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিন দিন ‘লেখক সম্মিলন’ হবে। ১৮ ফেব্রুয়ারি উপস্থিত থাকবেন হাসনাত আবদুল হাই, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, হরিশংকর জলদাস, আনিসুল হক, বিশ্বজিৎ চৌধুরী, রাশেদ রউফ, মোশতাক আহমেদ, বাদল সৈয়দ ও রাজিয়া সুলতানা। পরদিন উপস্থিত থাকবেন আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য তপোধীর ভট্টাচার্য, আবুল মোমেন, ভারতীয় লেখক স্বপ্না ভট্টাচার্য, ড. নিলুফার আকতার শিল্পী, অধ্যাপক মহীবুল আজিজ, ওমর কায়সার, জিল্লুর রহমান, মোস্তাক আহমেদ দীন ও আরিফ আর হোসাইন। ২০ ফেব্রুয়ারি উপস্থিত থাকবেন ফারুক মইনুদ্দিন, জি এইচ হাবিব, অঞ্জনা দত্ত, সৈয়দ মহিউদ্দিন ভান্ডারী, সাদেকা বেগম ও এজাজ ইউসুফী।