কন্যা সন্তানের অভিভাবকের জন্য

আরজুমান বানু

শনিবার , ১৩ এপ্রিল, ২০১৯ at ১১:১১ পূর্বাহ্ণ
521

আমার কাছে যে কয়জন মেয়ে পড়তে আসে, তার মধ্যে একটি মেয়েকে আমার কেন জানি খুব আলাদা মনে হয়। ক্লাস সিক্স এ পড়লেও, অনগ্রসর পরিবারের সন্তান হলেও তার চিন্তাভাবনাগুলো খুব পরিষ্কার।এই এতোটুকু মেয়ের কথাবার্তা আমাকে মাঝে মাঝে খুব ভাবনায় ফেলে দেয়। সেদিন পড়াতে গিয়ে দেখলাম, পড়ায় কোন মনোযোগ নেই। কি হয়েছে জানতে চাইলে দেখলাম টপটপ করে চোখ দিয়ে পানি ঝরছে, বলছে আন্টি আমি বলতে পারব না, আম্মুকে বলেছিলাম, আম্মু আরও উল্টো আমাকেই বকা দিলো। আমি বললাম, আচ্ছা, পড়া শেষ করো, তারপর ইচ্ছে হলে বলো। আমি মনে মনে একটু জরিপ করে নিয়েছিলাম, এই বয়সী একটা মেয়ের কি এমন কথা থাকতে পারে! কৌশলে বের করার চেষ্টা করলাম। যা বললো তা হলো, “আন্টি, আমি যে স্যারের কাছে কোচিং করি উনি সবাইকে পড়া শেষে ছুটি দিয়ে দিলেও আমাকে একটু দেরি করে ছুটি দেন। তারপর কাঁদতে কাঁদতে বললো আন্টি, সবাই চলে গেলে স্যার আমার জামার ভিতর হাত দেয়, প্যান্টে হাত দেয়। আমি বাঁধা দিতে গেলে মুখ চেপে ধরে। বলে, কাউকে বললে, অংকে ফেল করিয়ে দিব। ভিডিও করে নেটে ছেড়ে দিব। আম্মুকে অনেকবার বলেছি। আম্মু কিছু শুনতেও চাইছে না, আরও বলছে, আমি নাকি খারাপ মেয়ে। আন্টি আমি ঐ স্যার এর কাছে পড়ব না, আম্মুকে একটু বুঝিয়ে বলেন।”
ঘটনা তাহলে এই! গেলাম ওর বাবা -মায়ের কাছে। প্রথমে জানতে চাইলাম, কোচিং করার প্রয়োজন কি? আমি তো সব বিষয় রেডি করে দিচ্ছি এবং আপনার মেয়ে পড়াশুনায় যথেষ্ট ভালো। হুজুগে বাঙালি, বদ্ধমূল ধারণা জন্মেছে ঐ টিচারের কাছে কোচিং না করলে অংকে ফেল করবে। আমিও চ্যালেঞ্জ করলাম, “দেখি কে ফেল করায়। সেই শিক্ষক যদি কিছু বলে, আমাকে বলবেন। ওনার চাকরীর বারোটা বাজানোর পাওয়ার আমার কাছে আছে বলে বাবা-মাকে জানিয়ে দিলাম।”
আমার এক পরিচিতকে প্রায়ই আক্ষেপ করতে শুনি, তোমার তো দুটা ছেলে। বাসায় রেখে গেলেও চিন্তা নেই। আমার দুই মেয়েকে রেখে কোথাও যেতে ভয়ে থাকি। কারণ, ঘরে দাদা, চাচারা আছে শুধু। সবাই পুরুষ। কার কাছে রেখে যাব। একবার চাচার কাছে বড়টাকে রেখে একটা কাজে গিয়েছিলাম। এসে বড়মেয়ের কাছে যা শুনলাম, তাতে পায়ের নীচে মাটি সরে গেলো। বুঝলাম, ঘরেও শিশুরা নিরাপদ নয়।
আমি যে গলি দিয়ে আমার ছেলেদের স্কুলে আনা নেওয়া করি,সে গলিতে একটা মেয়ে প্রায়ই দাঁড়িয়ে থাকে। সেখানেই তার বাসা। একটু এবনরমাল, নিজের সাথে নিজে কথা বলে। বাড়ন্ত শরীর। পাড়ার উঠতি বয়সী ছেলেরা প্রায়ই দেখি তার চুল ধরে টানে, প্রকাশ্যে বুকে হাত দেয়, পাগলী মেয়ে খিলখিল করে হাসে, আর আমি শিউরে উঠি। একদিন হয়তো দেখব, সে গণধর্ষণের শিকার হয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় পড়ে আছে। সত্যি বলতে প্রায়ই রাতে তাকে নিয়ে দুঃস্বপ্ন দেখে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। মনে পড়ে আমাদের গ্রামের বাজারে একবার কোথা থেকে এক যুবতী পাগলী এসেছিলো। পরের দিন স্কুলে যেতে দেখলাম হাসপাতালের দেয়ালের পাশে রক্তাক্ত প্রায় উলঙ্গ অবস্থায় জীবন্মৃতের মতো পড়েছিলো, আর ছেলেরা কি মজা নিয়ে দৃশ্যটা দেখছিলো!!!এখন বুঝি রাতের বেলা তারাই হয়তো পাগলীটাকে ধর্ষণ করেছিলো। তখন বয়স কম ছিলো বলে এতোকিছু না বুঝলেও মানুষ নামের পশুদের চোখের ইশারা বুঝে কুঁকড়ে থাকতাম সেই এতোটুকু বয়স থেকে। অথচ ওরাই ছিলো আমার পরিচিত বড় ভাই, চাচা, জেঠা। আদরের ছলে এখানে সেখানে হাত দিতো। এখনও মাঝে মাঝে শিউরে শিউরে উঠি সেসব কথা মনে পড়লে।

ঘরে গিয়ে পাগলী মেয়েটার মা’কে একদিন বুঝিয়ে বললাম। মা কান্না করতে করতে বললো, কি করব মা, “পাগলীটাকে তো ঘরে রাখতে পারিনা।”
যারা শিশুদের প্রতি এই ধরনের আচরণ করে,তাদেরকে বলা হয় পেডোফাইল। এটা একটি রোগ। ছোটবেলা থেকে যারা কোন না কোন রকম যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে, তাদের মাঝে পেডোফিলিয়া দেখা দেয়। এ রোগ নারী-পুরুষ উভয়েরই হতে পারে।

নির্যাতনকারী শিশুকে যেসব কথা বলে তা হলো:

এটা তোমার আমার মাঝে সিক্রেট। কাউকে বলবে না।

ৎ এসো, আমরা বর বউ খেলি।

ৎ তুমি আমার কথা মতো কাজ না করলে তোমার ক্ষতি করবো।

অভিভাবকদের করণীয়:

ৎ কখনও যদি শুনেন, আপনার সন্তানকে কেউ আমার বর/ বউ বলে ডাকে, তার ব্যাপারে সতর্ক হবেন।

ৎ শিশু যদি প্রাপ্তবয়স্ক কোন লোকের প্রতি অতিরিক্ত আসক্ত হয়, সাথে সাথে তাদের গতিবিধি লক্ষ্য রাখবেন।

ৎ মাঠে খেলতে দিলে বড়দের আচরণ লক্ষ্য রাখবেন।

শিশু যদি কারও কোন আচরণের কথা আপনাকে বলে, গুরুত্বের সাথে নিবেন। কারণ তারা এসব বিষয়ে এখনও মিথ্যা বলতে শিখেনি।
নিজের সন্তানের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বয়স অনুযায়ী তাকে ধীরে ধীরে ংবীঁধষ বফঁপধঃরড়হ আপনাকেই দিতে হবে। তা না হলো বিকৃত ধারণা নিয়ে সে বড় হবে এবং যে কেউ তাকে নির্যাতন করার সুযোগ পাবে।
মাঝে মাঝে মনটা খুব খারাপ হয়ে যায়। কোন কোন ঘটনার কোন কূল কিনারা পাইনা। প্লিজ, আপনার বেড়ে উঠা সন্তানদের দিকে একটু বাড়তি খেয়াল রাখুন। এ ধরনের ঘটনাগুলো আপাতদৃষ্টিতে ছোট মনে হলেও এটা আপনার সন্তানের শিশু মনে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। আমাদের মাঝে জেগে ওঠা পশুত্ব থেকে আপনার সন্তানকে রক্ষা করতে আপনাকেই এগিয়ে আসতে হবে। এখনও কোন নির্জন রাস্তায়, লোকাল গাড়িতে, লিফটে, অপরিচিত পুরুষ আত্মীয়ের কাছে নিজেই গুটিয়ে থাকি! সেখানে সন্তানদের সতর্ক করা খুব কঠিন ব্যাপার। শুধু আপনার কন্যা শিশুটি নয়, ছেলে শিশুটিও কিন্তু যেকোন সময় যৌন নির্যাতনের শিকার হতে পারে এবং তা হয়তো আপনার কাছের লোক দ্বারাই!
সুতরাং বাবা-মা, শিক্ষক, সব অভিভাবক একটু মনযোগী হোন।একটু সতর্ক হোন,ওদের কথা শুনুন, গুরুত্ব দিন ওদের ছোট ছোট ব্যথাগুলোকে, কথাগুলোকে। তা না হলে এর পুরোপুরি দায়ভার কিন্তু আপনাকে শুধু নয়, আপনার সমাজকেও বহন করতে হবে। মনে রাখবেন, আমরা যতই সভ্য হচ্ছি, যতই ডিজিটাল হচ্ছি, এসব আদিম অপরাধ কিন্তু ততই বাড়ছে!

x