কদর বাড়ছে পাহাড়িদের তাঁত বস্ত্রের

আলাউদ্দিন শাহরিয়ার : বান্দরবান

সোমবার , ১৪ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৫:০৮ পূর্বাহ্ণ
155

কদর বাড়ছে পাহাড়ের ক্ষুদ্র-গোষ্ঠীদের তৈরি ঐতিহ্যবাহী তাঁত বস্ত্রের। রুচিশীল বৈচিত্রময় ডিজাইন, দেখতে সুন্দর, টেকসই এবং সুতি কাপড় পরতে আরামদায়ক হওয়ায় পোশাক তৈরির হিড়িক পড়েছে পার্বত্যাঞ্চলে। পাহাড়ে বেড়াতে আসা পর্যটকেরা পাহাড়ি নারীদের কোমর তাঁতে বোনা বিভিন্ন ধরণের কাপড় কিনে নিয়ে যাচ্ছেন নিজের এবং আত্মীয় স্বজনের জন্য। পাহাড়ি নারীদের তৈরি রং রেরঙের কাপড়ে বিভিন্ন ধরনের কারুকাজ ফুটিয়ে তোলে পোশাকে। তাঁতের কাপড় দিয়ে তৈরি করছেন সালোয়ার কামিজ, পাঞ্জাবি, শার্ট, গায়ের শাল, বেডশিট, শোপিস, মেয়েদের ভ্যানিটি ব্যাগ, কুশন’সহ হরেক রকমের পণ্য। এগুলো এখন পাহাড়িদের পাশাপাশি স্থানীয় বাঙালি এবং বেড়াতে আসা পর্যটকেরাও কিনছেন।
এমনকি পাহাড়ে ভ্রমণে আসা বিদেশি পর্যটকেরাও কিনে নিয়ে যাচ্ছেন তাঁতের পোশাক। পার্বত্যাঞ্চলের ক্ষুদ্র জণগোষ্ঠীদের তৈরি এসব পোশাক বাঙালি’সহ পর্যটকদের কাছে পরিচিত হচ্ছে উপজাতীয় পোশাক হিসেবে। পার্বত্য এ জনপদের পাহাড়ি বম, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, চাকমা, মুরুং, খেয়াং, খুমী, লুসাই’সহ ১১টি ক্ষুদ্র নৃ-জনগোষ্ঠীর নারীরা পোশাক তৈরিতে পারদর্শী। পাহাড়ে চাষ করা তুলা থেকে সুতা তৈরি করে কোমর তাঁতে কাপড় বোনে পাহাড়ের নারীরা। তাঁতে বোনা কাপড়ে তৈরি করা হয় বিভিন্ন ধরণের পোশাক। যা বর্তমানে প্রাধান্য পাচ্ছে দেশের তরুণ-তরুণীদের ফ্যাশনে। কোমর তাঁতে বোনা কাপড় বিক্রি করে অর্থনৈতিকভাবেও স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন পাহাড়ের নারীরা। ফারুক পাড়ার বাসিন্দার জিংসিয়াম বম, সিচিলা বম বলেন, ছোট্ট বেলা থেকে মায়ের কাছে কোমর তাঁতে কাপড় বুনা শিখেছি। শুধু আমরা নয়, পাহাড়ের প্রতিটি নারীই কাপড় বুনতে জানে। সকলেই পরিবারের কাছ থেকেই শিখেছে। কৃষি এবং ঘরের কাজের ফাঁকে অবসর সময়ে পাহাড়ের নারীরা কাপড় বোনে পোশাক তৈরি করে। একটা সময় ছিল পাহাড়ের নারীরা শুধুমাত্র নিজেদের জন্য কাপড় বোনতেন। কিন্তু এখন সংসারে আয় বাড়াতে উপার্জনের জন্যও কাপড় বোনছেন। কাপড় বিক্রি করে স্বচ্ছলতা এসেছে আমাদের পরিবারও। অনেকের সংসার চলছে এখন তাঁতে বোনা কাপড় বিক্রি করে। জেলা কুটির শিল্প সংস্থার মতে, বান্দরবান জেলায় প্রায় ২০ হাজার পাহাড়ি নারী কোমর তাঁতে কাপড় তৈরির (বোনার) সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। পাহাড়ি নারীরা কোমর তাঁতে তৈরি করছে: থামি (পরণের কাপড়), গামছা, কম্বল, রুমাল, গায়ের শাল, টুপি, উড়না, বিছানা চাদর’সহ বিভিন্ন রকমারী পোশাক। পাহাড়ি নারীদের তৈরি একটি কম্বল বুনতে সময় লাগে একদিন। খরচ হয় ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। কম্বল বিক্রি করতে পারেন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায়। কম্বল ছাড়াও অন্যান্য পোশাক তৈরিতে প্রায় একই খরচ পড়ে। বিক্রিও হয় অনেকটা একই দামে। প্রতিমাসে এভাবে তাদের আয় দাঁড়ায় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। জেলায় প্রতিটি ঘরে ঘরে পাহাড়ি নারীরা কোমর তাঁতে কাপড় বুনলেও বান্দরবান জেলায় এখনো পর্যন্ত গড়ে উঠেনি কোনো ধরনের বিসিক শিল্প কারখানা। শিল্প কারখানা গড়ে না উঠায় বান্দরবানের তাঁত শিল্প অর্থনৈতিক সম্মৃদ্ধি অর্জন করতে পারছে না বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। স্বল্প পুঁজিতে কোমর তাঁতে কাপড় বোনা সম্ভব বলে পাহাড়ি নারীরা কাজের ফাঁকে অবসর সময়ে কোমর তাঁতে কাপড় তৈরি করে সংসারে বাড়তি আয় বাড়াচ্ছে। তবে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় কোমর তাঁত শিল্প পাহাড়ি নারীদের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। পাহাড়ের তাঁতে বোনা এসব কাপড় রপ্তানি হচ্ছে মায়ানমার-ভারত’সহ বেশকিছু দেশেও। স্থায়ীভাবে বান্দরবানের অন্যতম দর্শনীয় স্থান শৈলপ্রপাত পর্যটন স্পটে পাহাড়ি বম নারীরা নিজ উদ্যোগে একটি অস্থায়ী বাজার গড়ে তুলেছে। সেখানে খ্রীষ্টিয় চার্চ সমিতির পক্ষ থেকে স্থায়ীভাবে কয়েকটি ছোট বাজারসেডও তৈরি করে দেয়া হয়েছে। রোববার ব্যতিত সপ্তাহের অন্যদিনগুলোতে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পাহাড়ি বম সম্প্রদায়ের নারীরা কোমর তাঁতে বোনা কাপড় বিক্রি করে এখানে। এছাড়াও স্থানীয় মার্কেটগুলোতেও বিক্রি হচেছ তাঁতের পোশাক। বেড়াতে আসা পর্যটকেরা হচ্ছে এসব কাপড়ের প্রধান ক্রেতা। জেলা মহিলা বিষয়ক কমকর্তা আতিয়া চৌধুরী বলেন, জেলায় বসবাসরত এগারোটি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সকলেই কোমর তাঁতে কাপড় বুনে থাকে। তাঁতে তৈরি কাপড়কে বম সম্প্রদায় বম ভাষায় পোয়ান, ত্রিপুরা ভাষায় রিসা, চাকমা ভাষায় পাছরা এবং মারমা ভাষায় তুব্বইং বলে থাকে। তবে এ ক্ষেত্রে বম জনগোষ্ঠীরা অনেকটা এগিয়ে। বম সমপ্রদায়ের প্রতিটি নারীই কোমর তাঁতে কাপড় বোনতে
পারদর্শী ও খুবই দক্ষ। অবসরে পাহাড়ি নারীরা কোমর তাঁতে কাপড় বুনে বাড়তি উপার্জনের পথ খোঁজে নিয়েছে। সেই সঙ্গে দেশের অর্থনীতিতেও ভুমিকা রাখছেন গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনীয় পুঁজি বিনিয়োগ, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, উন্নত প্রযুক্তির অভাব, বাজারজাত ও উদ্যোক্তার অভাব’সহ নানামুখী সমস্যার কারণে সম্ভাবনাময় এই শিল্প আলোর মুখ দেখছেনা।
বান্দরবান উইমেন চেম্বার অব কমার্সের সভানেত্রী লাল সানি লুসাই বলেন, শুধুমাত্র পর্যটকের উপর নির্ভর করে কোমর তাঁত শিল্প টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। শিল্পটি রক্ষায় দেশের বিভিন্নস্থানে বিপণন বাজার এবং বিদেশে রপ্তানির ব্যবস্থা করতে হবে।
চাহিদা থাকায় তাঁত শিল্পে স্থানীয় পাহাড়ি নারীদের সম্পৃক্ততা বাড়ছে। কিন্তু পুঁজির অভাবে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে তাঁত শিল্পে। এক্ষেত্রে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা খুবই প্রয়োজন। তবেই কোমর তাঁত শিল্প অর্থনৈতিক সম্মৃদ্ধি আনবে। এ বিষয়ে বান্দরবান বিসিকের উপ-ব্যবস্থাপক জামাল নাসের চৌধুরী বলেন, পাহাড়ে তাঁত ও হস্তশিল্পের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এ অঞ্চলে তৈরি তাতের কাপড়ের চাহিদা বাড়ছে প্রতিনিয়ত। পণ্যে মান বাড়াতে বিভিন্ন ধরণের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। টেকসই উন্নত পোশাক তৈরিতে প্রয়োজনীয় সরকারি সাহায্য সহযোগিতা দেয়া হচ্ছে।

x