কথোপকথন

মিলন বনিক

শুক্রবার , ১৭ আগস্ট, ২০১৮ at ৮:৪৬ পূর্বাহ্ণ
175

ঠাম্মি, হ্যালো ঠাম্মি, শুনতে পাচ্ছো?

হ্যালো, হ্যাঁ, শুনছি।

আমি রুদ্র বলছি।

ওরে সোনা ভাই, সোনা জাদু আমার, কেমন আছিস?

ভালো ঠাম্মি, তুমি কেমন আছো?

আমার আর কী? তিন কাল গিয়ে এক কালে ঠেকেছে। তুই কবে আসবি সেই চিন্তায় দিন গুণছি।

তাই না কি?

তবে আর বলছি কি?

আমারও তোমাকে ছাড়া থাকতে খুব কষ্ট হচ্ছে।

সে তো আমি জানিরে সোনাভাই। আমারও কি কম কষ্ট হচ্ছে। জানিস দাদু ভাই, আমাদের উঠোনে পেয়ারা গাছে অনেক পেয়ারা ধরেছে। কী সবুজ আর সুন্দর হয়েছে পেয়ারাগুলো।

ওহ! ঠাম্মি, আমার আর তর সইছে না।

আমি জানি তো, পেয়ারা তোর খুব পছন্দ, তাই যত্ন করে ক’টা পেয়ারা গাছে রেখে দিয়েছি। এবার আম কাঠাঁলও হয়েছে খুব। তুই কি শুনতে পাচ্ছিস?

হ্যাঁ, হ্যাঁ শুনতে পাচ্ছি। আর কি খবর বলো।

আরো কত খবর যে আছে। কোনটা রেখে কোনটা বলি। বাড়ির সামনে জলি বরাবর কখন কবে ক’টা পুঁই বিচি আর লাউ বিচি পরেছিলো কে জানে। ভাগ্যিস ক’টা তেতুল গাছের ডাল দিয়ে বাউনি দিয়ে চালের দিকে তুলে দিয়েছিলাম। এখন সারা ঘরের চাল দল পুঁই আর লাউ ডগায় ভর্তি। কী সুন্দর কচি কচি লাউ ধরেছে। কচি লাউ পাতা দিয়ে নুনিয়া মাছ ভাজা তোর খুব পছন্দ। ইস্‌, তুই না দেখলে বিশ্বাস করতে পারবি না।

আমি আর থাকতে পারছি না ঠাম্মি। ইচ্ছে করছে এখনিই ছুটে যাই।

তবে আর বলছি কী? বাড়ির পেছনে তোর হাতে লাগানো লিচু গাছটাতে এবার লিচু ধরেছে। অনেক লিচু। আমি প্রতিদিন জল দিচ্ছি। আর কি জানিস তো?

না বললে কি করে জানবো?

ঐ কানুু দফাদারের গরু এসে পেছন বাড়ির কলাবাগানটা একেবারে শেষ করে দিয়েছে। একটা কলাগাছও রাখেনি। কচি কচি কলার মোচা, তাও সাবাড় করে দিয়েছে। গরুগুলো যেন জন্মে কিছু খায়নি। একদিনে পুরো বাগান খেয়ে শেষ!

তাই না কি?

তবে আর বলছি কী? পেছনের পুকুর পাড় থেকে পাটিবেতগুলো কেটে নিতে চেয়েছিলো। কাটতে দেয়নি। তাই ইচ্ছে করে কলাগাছগুলোর সর্বনাশ করেছে।

তোমরা কিছু বলোনি তো?

কে কি বলবে। তোর বাবাকে বলেছি। কিছু তো বললোই না, উল্টো আমাকে বলে কী না, গরু, ছাগল তো আর মানুষ না, যে বুঝে শুনে কাজ করবে। খেয়েছে তো গরু ছাগলে। এ নিয়ে আর ঝগড়া করে কি হবে?

তাই না কি? তুমি কি বললে। বাবাকে বকা দাওনি?

দিয়েছি তো। কে শোনে কার কথা? তোর বাবা শুধু হাসে।

শোনো, তুমি আবার ওদের কিছু বলতে যেওনা। যা বলার আমি এসে বলবো। তোমার বয়স হয়েছে। এখন অনেক সাবধানে থাকতে হবে।

তুই তো বলেই শেষ। আমি কি আর সাবধানে থাকতে পারছি? সেই বারো বছর বয়সে এই বাড়িতে এসেছি। সেই থেকে এসব কিছুর সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পরে আছিরে।

দাদুর কথা মনে পড়ছে বুঝি?

মনে রেখে আর কী হবে? নিঠুর মানুষটা আমাকে রেখে চলে গেলো। থাকলে কি আর আমাকে এতো ভাবতে হতো?

তাইতো তুমি এসব নিয়ে ব্যস্ত থাকতে পছন্দ করো।

ঠিকই তো বলছিস। পুকুর পাড়ে কত শুকনো পাতা পড়ে আছে। আমি দুপুরে ঘুমালে পুবের বাড়ির বৌঝিরা এসে সব কুড়িয়ে নিয়ে যায়।

কিন্তু তোমার তো বিশ্রাম দরকার। ঘুম দরকার।

তাই তো বলি, বয়েস হয়েছে। আগের মতো গায়ে জোর থাকলে কি আর নিতে দিতাম। নিজে কুড়াতে পারি না। পুটির মাকে সাথে নিয়ে কয়েক খাড়াং কুড়িয়ে আনি। তাও তো বেশিরভাগ থেকে যায়।

আচ্ছা, ঠাম্মি। আমাদের কি এখন পাতা জ্বালানোর সময় আছে? কুড়িয়ে নিলে নিক। তাতে তো পুকুর পাড়টা পরিষ্কার থাকে। ঘরে লাকড়ি আছে। তাছাড়া এখন সিলিণ্ডার গ্যাস দিয়ে রান্না হচ্ছে।

হুমমমমকি আমার গ্যাস রে। দু’দিনের বৈরাগী, ভাতেরে বলিস অন্ন। শুকনো পাতার রান্না, লাকড়ির রান্না আর গ্যাসের রান্না কি এক হলো? তোদের ঐ গ্যাসের রান্নার স্বাদ আর পাতালাকড়ির রান্নার স্বাদ, আকাশ পাতাল ফারাক। তুই এলে তোকে পাতার চুলায় বন কাঁকড়োল আর যজ্ঞডুমুর দিয়ে চিংড়ি রেঁধে খাওয়াবো। দেখিস কী মজা?

আর বলো না ঠাম্মি। সেই ছোটবেলায় একবার খাইয়েছিলে, এখনও জিবে লেগে আছে।

তখন তোর নিরু পিসি ছিলো। পুকুর পাড় থেকে সেই যজ্ঞডুমুর তুলে এনেছিলো। তোর মনে আছে এসব?

আমার ঠিক মনে আছে।

সেবার যে চৈত্র সংক্রান্তির দিন নাড়ু, মুড়ি নিয়ে কত হৈ চৈ। বিউফুল তুলতে গেলো মেয়েটা। চৈতঘাটা বাঁধার জন্য গরুর গোবর, খইয়ের তুস, ছাতু আর বিউফুল ছিটালো ঘাটা থেকে বাড়ির উঠোন পর্যন্ত। পরদিন নতুন বছর। কত রকমের শাকসব্জি ঔষধি দিয়ে পাঁচন রান্না হলো। পরদিনের জন্য মেয়েটার কত কি ভাবনা ছিলো। বটতলির মেলায় যাবে। আলতা, চুড়ি, ফিতা কিনবে। নাগরদোলা চড়বে। সেই সকালটা এলো কাল হয়ে। নিরুর আর ফেরা হলো না।

তুমি আবার সেই নিরু পিসির কথা মনে করে কান্না শুরু করলে।

কান্না কি আর এমনি এমনি করি রে? পেটে ধরেছি তো, তাই মনকে বোঝাতে পারি না। কতলোকই তো মেলায় গেলো। সবাই ফিরে এলো। শুধু আমার নিরুটা আর ফিরে এলো না।

সেদিনের কথা ভুলে যাও ঠাম্মি। তখন যুদ্ধের সময়। নিরু পিসির মতো আরো কত লোক, কতো মা বোন প্রাণ দিয়েছে, তার কোনো হিসাব আছে?

তাই বলে এই ছোটো মেয়েটাকে এভাবে তুলে নিলো? এভাবে কেউ মানুষ মারতে পারে? ওরা কি মানুষ না জানোয়ার?

ওরা জানোয়ার বলেই এভাবে মারতে পেরেছে। নিরু পিসিরা এভাবে প্রাণ দিয়েছে বলেই আমাদের দেশটা স্বাধীন হয়েছে। শুধু এটা মনে রেখো। এর পেছনে তোমার মেয়ের অবদানও কম নয় ঠাম্মি।

সে যতই আমাকে ভুলাতে চাস না কেন দাদু ভাই, আমি তো মা। আমার পেটেই তো নিরুর জন্ম। দশ মাস দশদিন পেটে ধরেছি। চৌদ্দটা বছর নিরুর মুখে মা ডাক শুনেছি। এখনও শুনি। কত সুন্দর করে মা ডাকতো নিরু।

সে কথা মনে ভেবে ভেবে আর কষ্ট পেয়ো না ঠাম্মি। এবার তোমার কথা বলো।

বলছি তো, সারাদিন বললেও কি শেষ হবে রে। এবার দক্ষিণের পাহাড়ি ঢালু জমির ধানটাও গেলো।

কেন ঠাম্মি, কী হয়েছে? কেউ চাষ করেনি বুঝি?

তোর নগেন কাকা বর্গা নিয়েছিল। চাষও করেছিল। সবুজের পর সবুজ। পুরো জমিটা কি সুন্দর লাগছিল দেখতে। সবুজ ধান গাছগুলোর ডগায় সবেমাত্র কচি ধানের শীষগুলো উঁকি দিচ্ছিল।

বাঃ বাঃ তুমি তো দেখছি বেশ রসিয়ে রসিয়ে রীতিমত কাব্য শুরু করে দিয়েছো।

ওরে যাদু সোনা, আমি কি তোর মত অত লেখাপড়া জানি? আমার কষ্ট হচ্ছিল। তাই তোকে বলছি। আমার ইচ্ছা ছিল ফসল তো ভালোই হয়েছে। ধান কাটা হয়ে গেলে এবার অঘ্রাণে তোর বিয়েটা দেবো। আমি আর কতদিন। তোর বিয়েটা দেখে যেতে পারলে আমি মরেও শান্তি পাবো রে দাদু ভাই।

কিন্তু ধানের কি হলো বললে না তো।

কি আর বলব, একদিন বন্য হাতির পাল নেমে আশে পাশের জমিসহ পুরো ধানক্ষেত বিরান করে দিল। কিছুই রাখেনি। তোর নগেন কাকা তো জমির আইলে বসে বুক চাপড়ে সে কি কান্না।

তারপর?

তারপর আর কি রে, আমি তো খালি বক বক করে যাচ্ছি। ওরে যাদু, তোর কথা বল। তোর মনে আছে তোকে নিয়ে যখন জমির আইল ধরে হাঁটতাম তুই কত খুশিই না হতিস। কিছুুতেই তোকে ঘরে আনতে পারতাম না।

ঠাম্মি তুমিইতো খালি বলে যাচ্ছো। আমি একটা ভালো খবর দেওয়ার জন্য তোমাকে ফোন করেছি।

কি খবর বল না দাদু ভাই।

আমি বিয়ে করতে যাচ্ছি।

সে কি রে, তবে আমার কি হবে? কোন মুখপুরিকে আবার আমার সতীন করে আনছিস?

সে তোমার সতীন হবে কেন ঠাম্মি? তোমার একজন ভালো বন্ধু হবে।

বন্ধু না ছাই? সে কি শাড়ি পরে আমার হাত ধরে জমির সরু আইল দিয়ে হাঁটতে পারবে?

ওপাশ থেকে আর কোন কথা আসছে না। ঠাম্মি শুধু হ্যালো রুদ্র, হ্যালো করে যাচ্ছে। যাহ! লাইনটা কেটে গেলো।

x